উন্নয়নের পথে নারীর অবদান

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:২১
নারীর উন্নতি বিষয়ে কেবল বাক্য দ্বারা কোনো মীমাংসায় আসা সম্ভব নয়। নারীর নিজেকে যেমন নিজের প্রতিষ্ঠার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকতে হবে, তেমনি সমাজের বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষের মধ্যে থাকতে হবে সচেতনতা। বিশেষ করে শিক্ষার উন্নয়ন ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির জন্য এগিয়ে আসা উচিত নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব মানুষের, কারণ, সর্বস্তরের উত্কর্ষ ছাড়া সমাজের সার্বিক উন্নতি সম্ভব নয়। সদ্য অতিক্রান্ত হলো বেগম রোকেয়া দিবস। বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও নারী-অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবার লক্ষ্যে প্রদান করা হয়েছে-২০১২। নারীর শিক্ষা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখার জন্য এ বছর রোকেয়া পদক পেয়েছেন মাহফুজা খানম ও সৈয়দ জেবুন্নেসা হক। মাহফুজা খানম, যিনি অধ্যাপক মাহফুজা খানম হিসেবেই অধিক পরিচিত, শিক্ষাজীবনের বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন পদার্থবিদ্যাকে। যে সময়টাতে কার্জন ভবনের নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল হাতে গোনা, সে সময় বিদ্যানুরাগী পরিবারের প্রবল উত্সাহ ও সহযোগিতায় তিনি অতিক্রম করেন তার শিক্ষাজীবন। কিন্তু একজন সচেতন মানুষ হিসেবে কেবল কাগজ-কলমে তার শিক্ষা সীমাবদ্ধ থাকেনি। ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি এবং ছয়দফা দাবি নিয়ে কাজ করেছেন তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত। ১৯৬৯ সালে, পুরনো পল্টন গার্লস কলেজে অধ্যাপনা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন মাহফুজা খানম। বাবা- মায়ের কাছ থেকেই একটা বিশেষ শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন যে, কারো লেখাপড়ার জন্য অর্থের প্রয়োজনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত। শিক্ষার প্রতি এই অনুরাগ থেকেই তিনি বিভিন্নভাবে মানুষকে সহযোগিতা করা শুরু করেন। এর প্রথম ধাপটি শুরু হয় বেয়ারাদের ছেলে-মেয়েদের মাধ্যমে। বিশেষ করে, যারা অর্থাভাবে সন্তানকে লেখাপড়া করাতে পারতেন না, কিংবা ছেলেকে লেখাপড়া শেখালেও মেয়েকে রাখতেন অবহেলিত, তাদের প্রতি আর্থিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন মাহফুজা খানম। এছাড়া পত্রিকায় বিভিন্ন সংবাদ দেখে দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং যথাসাধ্য সহযোগিতা করেন। শিক্ষাবিস্তারের পথকে আরও সুগম করে তুলতে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে প্রায় সতেরোটি ট্রাস্ট গঠন করেছেন তিনি। এর মধ্যে আর কে কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ, ন্যাশনাল হোম ইকোনমিক্স কলেজ প্রভৃতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি বিভাগে ট্রাস্ট গঠন করেন তিনি। মানিকগঞ্জের মেধাবী মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিশেষ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার আয়োজন করেছেন। ওয়ারীতে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘শিশু বিকাশ ছায়া’। এই সমস্ত কাজকর্মের পেছনে তার যে লক্ষ্যটি সবসময় অটুট ছিল, তা হলো ছেলে-মেয়েদের শিক্ষাবিস্তার। পিতার কাছ থেকে তিনি শিক্ষা পেয়েছিলেন যে, তার অর্থে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর হক রয়েছে এবং সেই হক তাদের দেয়া উচিত। তাই আজো এই আদর্শকে নিষ্ঠার সাথে লালন করে চলেছেন তিনি। বিজয়ের এই মাসে তিনি বিশেষভাবে বলেন যে, সম্পদকে কেবল নিজ স্বার্থে কুক্ষিগত করে রাখা উচিত নয়। মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লক্ষ মানুষের প্রতি আমাদের যে দায়বদ্ধতা, আজ ১৬ কোটি মানুষের ভেতর দিয়ে সেই ঋণ শোধ করতে হবে। সৈয়দ জেবুন্নেসা হক রাজনীতির ভেতর দিয়ে মানুষের কাছাকাছি এসেছেন সৈয়দ জেবুন্নেসা হক। সক্রিয়তা শুরু করেছেন ছাত্ররাজনীতির ভেতর দিয়ে। ১৯৬৫ সালে প্রত্যক্ষভাবে যোগদান করেন আওয়ামী লীগে। সিলেটের নারীরা তখনও পর্দার অন্তরালে থাকাটাই শ্রেয় বলে জানতেন। কিন্তু সৈয়দ জেবুন্নেসা রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠলেন; পুরুষের সমান্তরাল পদক্ষেপে এগিয়ে চললেন। কর্মজীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে নারীদের অগ্রগতির প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগী হলেন। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হওয়ায় আরও সুগম হলো তার কাজের পথ। নারী নির্যাতন প্রতিরোধের জন্য তিনি কমিটি গঠন করেছেন। এই কমিটি তার অঞ্চলের নারীরের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধানে সচেষ্ট থাকে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমেও তিনি নারী ও শিশুদের জন্য কাজ করে থাকেন। ঝরে পড়া শিশুদের নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তা করেন জেবুন্নেসা হক। বিশেষ করে চা বাগানে যেসব মেয়েরা কাজ করে, তাদের উন্নতির জন্য চেষ্টা করেন। ১৯৮৪ সালে সিলেটে মহিলা আওয়ামী লীগ গঠনের পর ১৯৯৭ সালে আইভি রহমানের হাত ধরে তিনি কেন্দ ীয় রাজনীতিতে আসেন এবং মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভানেত্রীর পদ পান। এখন তিনি কেন্দ ীয় মহিলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োজিত আছেন। তিনি বলেন, কর্মীদের পেছনে থেকেই তিনি তার কাজ করার চেষ্টা করেন, নির্বাচত প্রতিনিধি হিসেবে তার দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকেন। সৈয়দ জেবুন্নেসা হক বলেন, এই পুরস্কার তার একার অর্জন নয়। তিনি মনে করেন, সমস্ত নারীর পক্ষ থেকেই এই প্রাপ্তিকে তিনি গ্রহণ করেছেন। সবার সম্মিলিত প্রয়াসই বৃহত্ কল্যাণের পথ তৈরি করতে পারে।