ব্রা হ্ম ণ বা ড়ি য়া

গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:১৬
মুক্তির সেই দিনটি: ৬ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনীর একটি দল দক্ষিণ দিক থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের দিকে অগ্রসর হয়। ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে পাকবাহিনী ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর ছেড়ে পালায়। ৮ ডিসেম্বর সকালে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী শহরে প্রবেশ করে। সেদিন সকালেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন মুক্তিযুদ্ধের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল কাউন্সিলরের চেয়ারম্যান জহুর আহমেদ চৌধুরী। রণকৌশল: স্বাধীনতা যুদ্ধের পুরো নয় মাসই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকায় পাক বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখযুদ্ধ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য সমগ্র বাংলাদেশকে মোট ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল। প্রতিটি সেক্টরকে আবার কিছু সাব-সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব কসবা, গঙ্গা-সাগর ও আখাউড়া থেকে পশ্চিমে ভৈরব বাজার রেল লাইন পর্যন্ত ছিল ২নং সেক্টর এবং সিঙ্গারবিল থেকে উত্তরে হবিগঞ্জ পর্যন্ত ছিল ৩নং সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। ২নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ (পরে মেজর জেনারেল বীর উত্তম, ১৯৭৫ এর সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত)। তিনি তাঁর সেক্টরকে ছয়টি সাব-সেক্টরে বিভক্ত করেন। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়াস্থ কসবা-আখাউড়া গঙ্গাসাগর সাব-সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আইন উদ্দিন (পরে মেজর জেনারেল অবঃ বীর প্রতিক, পিএসসি)। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ক্যাপ্টেন মাহবুব, লেফটেন্যান্ট ফারুক ও লেফটেন্যান্ট হুমায়ুন কবির। এই এলাকায় চতুর্থ বেঙ্গলের একটি কোম্পানি এবং ইপআির-এর দুটি কোম্পানি ছিলো। এই সাবসেক্টর কসবা, আখাউড়া, সাইদাবাদ, নবীনগর, বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং কুমিল্লার মুরাদনগর পর্যন্ত অপারেশন চালাতো। ক্যাপ্টেন আইন উদ্দিন নবম বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নিয়মিত-অনিয়মিত এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গেরিলা সৈনিকদের নিয়ে অক্টোবর মাসে নবম বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠিত হয়েছিল। মন্দভাগ সাব-সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন এইচ এম এ গাফফার (পরে লেঃ কর্ণেল অবঃ বীর উত্তম) তাঁর অধীনে চতুর্থ বেঙ্গলের সি বা চার্লি কোম্পানি এবং মর্টারের একটি দল ছিল। এই সাবসেক্টর বাহিনী কসবা থানার মন্দভাগ রেল স্টেশন থেকে কুটি পর্যন্ত অপারেশন চালাতো। এছাড়া সালদা-নদী কোনাবন সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছিলেন ব্যাটালিয়ান কমান্ডার এবং সাব- সেক্টর কমান্ডার। তাঁর কমান্ডে সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় চৌদ্দশ। এর মধ্যে আটশ’র মতো ব্যাটালিয়ান সৈন্য আর প্রায় ছয়’শ সৈনিক ছিল সাব সেক্টর ট্রুপসে। বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ এং যুদ্ধকালীন সময় প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা সৈনিকরা ছিল ব্যাটালিয়ানের অন্তর্ভুক্ত। আর সেক্টর টু্রপসে ছিল ছাত্র-যুবক ও কৃষকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধা। ক্যাপ্টেন গাফফারের এই ব্যাটালিয়ানে চারটা কোম্পানি ছিল। এর মধ্যে এ’ বা আলফা কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন সুবেদার গোলাম আম্বিয়া। বি’ বা ব্রাভো কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন সুবেদার ফরিদ, ‘সি’ বা চার্লি কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন সুবেদার আব্দুল ওহাব (বীরবিক্রম) এবং ‘ডি’ বা ডেল্টা কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন সুবেদার তাহের। ব্যাটালিয়ানের সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন লেফটেন্যান্ট কবির (পরে ক্যাপ্টেন কবির)। এই ব্যাটালিয়ানে দুটো মর্টার প্লাটুন ছিল। এর একটির কমান্ডার ছিলেন সুবেদার জব্বার এবং অন্যটির কমান্ডার ছিলেন সুবেদার মঈন (বীরউত্তম)। যুদ্ধ পরিচালনা করতে গিয়ে বাস্তব ক্ষেত্রে অনেক সময় এক সেক্টরের বাহিনী অন্য সেক্টরেও যুদ্ধ করেছে। ২নং সেক্টরের অধীনে প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার গেরিলা এবং ছয় হাজার নিয়মিত বাহিনীর সদস্য ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকায় গেরিলা অপারেশন চালিয়ে তারা হানাদার বাহিনীকে সব সময়ই সন্ত্রস্ত রেখেছে। বিপর্যস্ত পাক বাহিনী: সালদানদী, বায়েক, কসবা, আখাউড়া, গঙ্গাসাগর, মন্দভাগ, নয়নপুরসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় পাকবাহিনীর সাথে মুক্তিবাহিনীর প্রায়শই সম্মুখযুদ্ধ হতো। মে-জুন মাস থেকে সেখানে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা তত্পরতা শুরু হয়। জুলাই মাসে এই তত্পরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এ সময় কসবা পূর্বাঞ্চল এবং মন্দভাগ এলাকা মুক্তিবাহিনীর দখলে ছিল। পাকিস্তানি সেনারা এসব এলাকা দখলের জন্য কসবা থানার কুটিতে ৩১তম বেলুচ রেজিমেন্ট এবং গোলন্দাজ বাহিনীর সমাবেশ ঘটায়। মন্দভাগ সাব সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন গাফফার তার বাহিনী নিয়ে শত্রুসেনা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকেন। এ সময় বার বার চেষ্টা করেও পাক বাহিনী কসবার পূর্বাঞ্চল দখল করতে পারেনি। ২২ মে ক্যাপ্টেন আবদুল হকের নেতৃত্বে একটি গেরিলা দল কসবা থানার সালদা নদী এলাকায় অবস্থানরত পাকবাহিনীর প্রতিরক্ষা ঘাঁটির উপর অকস্মাত্ আক্রমণ চালায়। এতে পাকবাহিনীর প্রায় ১৫জন হতাহত হয়। শহীদ হন ৩ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা। ২৫ মে মুক্তিবাহিনীর অতর্কিত হামলায় পাক সেনাদের একজন জেসিও এবং পাঁচজন সৈনিক নিহত হয়। পাকবাহিনীর সালদা নদীর অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য কুটি থেকে আরো সৈন্য পাঠানো হয়। কিন্তু ২৭ মে সকালে সেখানে যাবার পথে তারা মুক্তিবাহিনীর অ্যামবুশে পড়ে যায়। এতে পাকবাহিনীর ৯জন সৈন্য নিহত হয়। ৫ জুন ভোরে চতুর্থ বেঙ্গলের দুটি প্লাটুন মর্টার ও মেশিন গান নিয়ে পাকবাহিনীর মোগড়া বাজার ঘাঁটিতে আক্রমণ চালায়। এতে পাকবাহিনীর ২২ জন সৈন্য নিহত ও পাঁচজন আহত হয়। কেমন আছেন মুক্তিযোদ্ধারা: তিন বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান মিয়া, মোখলেছুর রহমান ও সিরাজুল ইসলাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বড়াইল ইউনিয়নের বড়াইল ও খারঘর গ্রামের বাসিন্দা। তিনজনই খেটে খাওয়া মানুষ। বয়স ৬০ পেরোলেও শ্রম বিকিয়ে সংসারের ঘানি টানতে হয় এখনো তাদের। ভারতের হাপানিয়া ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ শেষে নেমে পড়েন যুদ্ধে। বড় বড় কয়েকটি অপারেশনে জীবন বাজি রেখে অংশ নেন তারা। খারঘর গ্রামে সংঘটিত যুদ্ধের সময় শাহ জাহান মিয়ার পরিবারের পাঁচ সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করে হানাদার বাহিনী। শাহজাহান মিয়াকে এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় পাকবাহিনীর গণহত্যার সেই দু:সহ স্মৃতি। শাহজাহান মিয়া জানান, কাজ করার শক্তি নেই, তারপরও কাজ করি,উপায় নেই। অনেক কষ্ট করে চলছি। একই অবস্থা মোখলেছুর রহমানের । তার দুই ছেলে বেকার। আছে আরও দুটি মেয়ে। সরকারি যত্সামান্য ভাতায় এত বড় সংসার চলার প্রশ্নই ওঠে না। তাই ৬১ বছর বয়সেও প্রতিদিন বাধ্য হয়ে কামলার কাজ করতে হয় তাকে। মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম জানালেন, অন্যের জমি বর্গা চাষ করে আর কামলাগিরি করেই চলে তার সংসার।