কিশোর অপরাধ এক নয়া সামাজিক সংকট

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০১৯, ২২:০২

আমাদের শিশু-কিশোররা অপরাধমনস্ক হইয়া উঠিয়াছে। ইহা এক নয়া সামাজিক সংকট হিসাবে আবির্ভূত হইয়াছে। কেবল অপরাধের সংখ্যাই বৃদ্ধি পাইতেছে তাহা নহে, অপরাধের ধরনও পাল্টাইয়া যাইতেছে। চুরি-ছিনতাই-মাদক সেবনের মতো অপরাধ ছাপাইয়া খুন-ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধের সহিত কিশোরদের নাম যুক্ত হইতেছে। গাজীপুরের টঙ্গী ও যশোরের পুলেরহাটের কিশোর (বালক) উন্নয়ন কেন্দ্রের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, সেইখানে অবস্থানরত কিশোরদের ২০ শতাংশ খুনের মামলা আর ২৪ শতাংশ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার আসামি। নারী ও শিশু নির্যাতন মামলাগুলির বেশিরভাগই ধর্ষণ-সংক্রান্ত। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়াছে যে, ১৪ হইতে ১৬ বছর বয়সীরা অপরাধে বেশি জড়াইতেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বস্তিবাসী ও নিম্নআয়ের পরিবারের কিশোরেরা দারিদ্র্যের কারণে, মফস্বল হইতে বড় শহরে আসা কিশোরেরা সমাজে টিকিয়া থাকিবার জন্য এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করিতে গিয়া অপরাধে জড়াইতেছে।

বত্সরদুই পূর্বে রাজধানীর উত্তরায় কিশোর গ্যাংয়ের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়াছিল যাহারা ছিনতাই হইতে খুন, ইত্যাদি নানান অপরাধে যুক্ত থাকিত। সম্প্রতি কুমিল্লার অপরাধী কিশোরেরা সংবাদপত্রের শিরোনামে চলিয়া আসিয়াছে। কুমিল্লা মহানগরীতে এক গ্রুপের সহিত অন্য গ্রুপের সদস্যদের কথা কাটাকাটি হইলেই ছুরিকাঘাত হইতে শুরু করিয়া খুনের ঘটনা ঘটিতেছে। কিশোরেরা যদি খুন-ধর্ষণের ন্যায় ভয়ঙ্কর ও অনাকাঙ্ক্ষিত অপরাধে যুক্ত হইয়া পড়ে তবে তাহাদের সংশোধনের জন্য সামাজিক পরিস্থিতিতে কোনো গলদ রহিয়াছে কিনা সেই দিকে নজর দিতে হইবে। এইক্ষেত্রে পরিবারের দায়িত্ব অধিক। পিতা-মাতা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সহিত যদি কিশোর সন্তানের সৌহার্দ্যপূর্ণ স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকে, তবে এমনিতেই অপরাধপ্রবণতা কমিয়া আসিবার কথা। অধিক অনুশাসনের পরিবর্তে সন্তানের সহিত পিতা-মাতার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকিলে সন্তানরা দৈনন্দিন জীবনে কী কী করিতেছে তাহার হদিস অভিভাবকদের নিকট থাকে। অন্যদিকে আমাদের সমাজে কিছু পরিবর্তন ঘটিয়া গিয়াছে— বয়স্ক অথবা কমবয়সী সকলেই অতিমাত্রায় প্রযুক্তিনির্ভর হইয়া পড়িয়াছে। উঠতি বয়সের অতি আগ্রহ এইসকল প্রযুক্তিকে ঘিরিয়া নানান অপরাধমনস্কতার জন্ম দিতেছে।

যেই হাতে এখন মুঠোফোন, সেই হাতেই একসময় থাকিত বই। মহল্লায় মহল্লায় গ্রন্থাগার ছিল, এখন সেইসব উঠিয়া গিয়াছে; অবশিষ্ট গণগ্রন্থাগারেও পাঠক কমিয়া গিয়াছে। গ্রন্থপাঠ মানুষকে সুকুমারবৃত্তির সহিত পরিচয় ঘটাইয়া দেয়। ইন্টারনেটেও রহিয়াছে বহুবিধ সুকুমারবৃত্তির উপাদান, কিন্তু সঙ্গে রহিয়াছে সুকুমারবোধ ধ্বংস করিবারও নানান অনুষঙ্গ। সেইসকল অনুষঙ্গের ইশারা কমবয়সীদের বিভ্রান্ত করিতেছে। ওইদিকে শহর হইতে খেলার মাঠগুলি বিলুপ্ত হইতেছে। টগবগে কৈশোরের সঞ্চিত শক্তি তাই ব্যয়িত হইতেছে নানান বাদানুবাদে, অপরের প্রতি দাপট প্রদর্শনের কাজে। অন্যদিকে, সমাজে আইনের শাসন ঠিকঠাকমতো কার্যকর নাই। বড়রা নানান অপরাধ করিয়া পার পাইয়া যাইতেছে, তাই ছোটরাও ওই পথেই হাঁটিতেছে। এই পরিস্থিতি হইতে পরিবার-সমাজকে যদি মুক্ত করা না যায়, তবে কিশোর অপরাধ অচিরেই দূর হইবার সম্ভাবনা কম। পারিবারিক পরিবেশ হইতে হইবে বন্ধুত্বপূর্ণ, কলহমুক্ত ও আনন্দমুখর। বিদ্যালয়-মহল্লা-পাড়া ইত্যাদি সামাজিক পরিবেশ হইতে হইবে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে আইনের শাসন নিশ্চিত করিতে হইবে। তবেই আমাদের কিশোররা সঠিক পথে হাঁটিবে।