আমাদের দেশে ফেইসবুক তথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপকতা বয়সকে হার মানিয়েছে। স্কুল পড়ুয়া থেকে শুরু করে ষাটোর্ধ্ব বয়সী ব্যক্তির সরব উপস্থিতি রয়েছে ফেইসবুক তথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
পুঁথিগতভাবে আমরা জানি সোশ্যাল মিডিয়ার সাইটগুলো সার্বজনীন যা কম খরচে পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে যোগাযোগের মৌলিক উদ্দেশ্যকে একক ধরলে এই মাধ্যমগুলোর প্রয়োগ আশানুরূপ নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা একটা ভার্চুয়াল জগতে বাস করছি এর ফলে ব্যক্তি খুব সহজে একই সময় একাধিক সামাজিক সম্পর্কে বা নতুন নতুন বন্ধুদের সঙ্গে পরিচিত বা সম্পর্কে জড়াতে পারছে কিন্তু বাড়ছে না সে সম্পর্কের গভীরতা।
আমরা সবাই কিন্তু নিজের কথাটা অন্যের কাছে বলতে চাই। এই বলার প্রবণতা আগেও ছিল। আগে হয়ত এটা বন্ধু-বান্ধবের কাছে বলতাম এখন সেটা আমরা সামাজিক যোগাযোগে স্টাটাসের মাধ্যমে জানাচ্ছি। ফলে আমাদের অনুভূতি যুগে যুগে যেটা ছিল, তেমনটা আর নেই, অনুভূতিগুলো হয়ে যাচ্ছে দুর্বল। ইন্টারনেট এ একটি শব্দবন্ধনী বেশ জনপ্রিয় তা হলো অনুভূতিগুলো অফলাইনে অর্থাত্ অনুভূতিকেও বিবেচনা করা হচ্ছে অফলাইন অনলাইনের কাঠামোতে। বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর বদলে সারাক্ষণ ফেসবুক, টুইটার নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বাস্তব জীবনে সম্পর্কের ক্ষতি হচ্ছে বলে আশঙ্কা করেছেন চিকিত্সকেরা। বন্ধুদের আড্ডার সৌন্দর্য নষ্ট করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। দেখা যায়, বন্ধুদের আড্ডার ভেতরেই কয়েক বন্ধু বুদ হয়ে আছে এ মাধ্যমগুলোতে।
ফেইসবুকে স্টাটাস দিয়ে আত্মহত্যা করার প্রবণতাও কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমরা অন্যের ফেইসবুক স্টাটাসকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছি না ফলশ্রুতিতে লঘু হয়ে যাচ্ছে সামাজিক সম্পর্ক। ইদানীং লক্ষ্য করা যায়, ট্রল বা মিমের মাধ্যমে একবন্ধু আরেক বন্ধুকে আক্রমণ করে বসে। অথচ দেখা যাবে- বাস্তব জীবনে তাদের সম্পর্ক মোটেও আক্রমণাত্মক নয়। সামাজিক মাধ্যমে নিছক মজা করতে গিয়ে শুরু হচ্ছে বাস্তব জীবনের সামাজিক দ্বন্দ্ব। আর এই দ্বন্দ্বে বলি হচ্ছে সম্পর্কের বেড়াজাল।
এভাবে সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে ক্রমান্বয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে সামাজিক মূল্যবোধ, সামাজিক শ্রদ্ধাবোধ,বৃদ্ধি পাবে বৃদ্ধাশ্রমের চাহিদা। সুতরাং এই বিরূপ অবস্থা হতে উত্তরণে যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা -২০১৬ সম্পর্কে জানা এবং সেই সঙ্গে মানা, পারিবারিক সচেতনতা, সামাজিক মূল্যবোধের সর্বোচ্চ চর্চা আমাদের সামাজিক সম্পর্ককে রাখবে নিরাপদ। আল্লামা ইকবালের ভাষায়, ‘সামাজিক জীবন ব্যক্তির কাছে এক আশীর্বাদ। এর পূর্ণতা লাভ করে সমাজ বন্ধনে।’ সুতরাং এই বন্ধনকে আঁকড়ে ধরে আমরা যেন সমাজের জীব হয়েই থাকি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর বাণিজ্যের ক্রীড়নকে পরিণত না হই।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
