বিনম্র শ্রদ্ধায় মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মরণ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন ও গণতন্ত্র সমুন্নত রাখার প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে জাতি গতকাল রবিবার পালন করল ৪২তম বিজয় দিবস। সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে জঙ্গিবাদ-মৌলবাদ, ক্ষুধা-দারিদ্র্য ও দুর্নীতিমুক্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঋদ্ধ এক জন্মভূমির স্বপ্নের কথা ধ্বনিত হয় সর্বত্র। শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধানবত জাতি ফুলে ফুলে ভরে দেয় সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণ। রাজধানীর বাইরে সবকটি বিভাগ ও জেলা শহরের চিত্রও ছিল প্রায় অভিন্ন।
গতকাল রবিবার সূর্যোদয়ের সাথে সাথে তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দর এলাকায় ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে সূচনা হয় বিজয় দিবসের কর্মসূচির। ভোরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে ধানমন্ডির ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তিনি।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রুত নিষ্পন্ন করার দাবিতে একাত্তরের মতোই জেগে উঠেছিল গোটা জাতি। জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণের পাশাপাশি সারাদেশে বিভিন্ন শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জড়ো হওয়া লাখো-কোটি আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার চোখেমুখে গতকাল যেমন ছিল বিজয়ের আনন্দ, ঠিক তেমনি ছিল একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে ঘৃণা, ধিক্কারের বহি:প্রকাশ। ‘রুখে দাঁড়াও পরাজিত শক্তির হুংকার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই এবার’ এমন স্লোগান নিয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধে নতুন প্রজন্মের ছিল বাঁধভাঙ্গা স্রোত।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্নের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধের বিচার ইনশাআল্লাহ আগামী বিজয় দিবসের আগেই হবে এবং রায়ও কার্যকর করা হবে।’
গত বছরের তুলনায় এবার দ্বিগুণেরও বেশি কর্মসূচির মাধ্যমে বিজয় দিবস পালন করে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন অফিস-আদালত, দোকানপাট, যানবাহন এবং বাসাবাড়িতে উড়ানো হয় বিজয়ের লাল-সবুজ পতাকা। আলোকসজ্জা করা হয় বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ভবন। কাগজ বা কাপড়ের তৈরি ছোট পতাকা হাতে নিয়ে বা বুকেপিঠে লাগিয়ে শিশু-কিশোররা বেরিয়েছিল ঘরের বাইরে। কেউ কেউ মুখে এঁকেছিল লাল-সবুজ পতাকা। রাজধানী জুড়ে বিজয় দিবস ঘিরে ছিল বিভিন্ন অনুষ্ঠান। পথে পথে সঙ্গীত, নাটকসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিকথা ইত্যাদি। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে গতকাল দিনভর বেজেছে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের সেই ভাষণের রেকর্ড ও স্বাধীনতার স্মৃতিবিজড়িত গান।
বিজয় দিবস উপলক্ষে গতকাল ছিল সরকারি ছুটি। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বেতার, টেলিভিশনের পাশাপাশি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিজয় দিবস উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে। সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে।
দিবসটি উপলক্ষে হাসপাতাল, শিশুসদন, কারাগার ও এতিমখানায় উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হয়। জাতির সুখ, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনা করে মসজিদে মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ মোনাজাত। মন্দির, গির্জা, প্যাগোডায় বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। বেলা ২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সেনাবাহিনীর বাদক দল কর্তৃক বাদ্য পরিবেশন, একই সময়ে সদরঘাট এলাকায় নৌবাহিনীর বাদ্য পরিবেশন, মিরপুর ২ নম্বর জাতীয় স্টেডিয়াম এলাকায় বিমান বাহিনীর বাদ্য পরিবেশন এবং একই সময়ে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী ও অন্যান্য সংস্থার সম্মিলিত বাদক দলের বাদ্য পরিবেশন করে।
স্মৃতিসৌধে জাতীয় নেতৃবৃন্দ, লাখো মানুষের ঢল
গতকাল ভোর ৬টা ৩৬ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল গার্ড অব অনারের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ সময় বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। কিছুটা সময় নিরবে দাঁড়িয়ে থাকেন প্রধানমন্ত্রী। পরে স্মৃতিসৌধের বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান জাতীয় সংসদের স্পিকার আব্দুল হামিদ। এরপর আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে শেখ হাসিনা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, বেগম মতিয়া চৌধুরী, মৃণাল কান্তি দাস প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এরপর প্রধান বিচারপতি ফুল দিয়ে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানান। বিদেশি কূটনীতিক, মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা বিদেশি বন্ধুসহ বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্য, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা এবং সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারাও শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। প্রধানমন্ত্রী ও কূটনীতিকরা চলে যাবার পর স্মৃতিসৌধে জনতার ঢল নামে।
সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটে বিরোধী দলীয় নেতা এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, তরিকুল ইসলাম, ড. মঈন খান, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাসসহ আরো অনেকে।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, স্বাধীনতার ৪২ বছরেও আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক সহনশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
অন্য নেতৃবৃন্দের শ্রদ্ধা নিবেদন ও যুদ্ধাপরাধের
বিচার সম্পন্ন করার দাবি
গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দলগত নয়, এটা জাতীয় দাবি। এজন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় সেজন্য জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মকে এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে।
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ হলো সকল ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করা। তিনি বলেন, ‘আমরা বারবার হোঁচট খেয়েছি। সেনাসমর্থিত শাসকরা দেশকে পিছিয়ে দিয়েছে। তবে বর্তমান সরকার দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’
সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করতে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সমগ্র জাতির দাবি। এ দাবি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সিপিবির উদ্যোগে আগামী ১৮ ডিসেম্বর হরতাল কর্মসূচি পালন করা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি আজ দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সারাবিশ্বের শান্তিকামী মানুষের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
সকাল ১০টায় সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এ সময় পরিকল্পনা মন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) একে খন্দকার, মেজর জেনারেল (অব.) কেএম শফিউল্লাহ, সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল হারুনুর রশিদ উপস্থিত ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের উদ্যোগে শত শত মুক্তিযোদ্ধা রণাঙ্গনের স্লোগান দিয়ে শহীদবেদিতে শ্রদ্ধা জানান।
শহীদবেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, জামায়াত-শিবির চক্র সব সময় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। তবে এ সংকট থেকে কীভাবে উত্তরণ করতে হবে তা বাংলার মানুষ জানে। তিনি বলেন, যে বিচার কাজ শুরু হয়েছে, কিছুদিনের মধ্যে তার রায় হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এছাড়াও জাতীয় পার্টি (এ), জাসদ, মুক্তিযুদ্ধ-৭১, বাংলাদেশ জাতীয় যাদুঘর, বিপিএটিসি, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সাভার ও আশুলিয়া ইউনিট, বাংলা একাডেমী, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, ন্যাপ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ সংসদ, বিএলআরআই, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, নজরুল ইনস্টিটিউট, কর্মজীবী নারী, গণআজাদী লীগ, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাধীন বাংলা গার্মেন্টস কর্মচারী ফেডারেশন, সাভার প্রেসক্লাব, বাংলাদেশ সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশন, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, জনতা ব্যাংক, বঙ্গবন্ধু পরমাণু বিজ্ঞানী পরিষদ প্রমুখ।
এদিকে মহান বিজয় দিবসে সাভার স্মৃতিসৌধে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলের নেত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে উভয় দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী উপস্থিত হন। এ সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কিছু নেতাকর্মী বাঁশের লাঠি হাতে স্মৃতিসৌধের আশপাশে অবস্থান নেন। তবে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
স্মৃতিসৌধ চত্বরে বিভিন্ন শিল্পীগোষ্ঠীর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সঙ্গীত সকলকে আকৃষ্ট করে। জাতীয় স্মৃতিসৌধে তরুণদের ভিড়ই ছিল সবচেয়ে বেশি। তাদের হাতে পতাকা, কপালে বাঁধা পতাকা, মটর সাইকেলের স্ট্যান্ডে পতাকা। সবার মুখেই বিজয়ের গান।
মহান বিজয় দিবসে জেপির শ্রদ্ধাঞ্জলি
মহান বিজয় দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের লক্ষ্যে জাতীয় পার্টি-জেপির পক্ষ থেকে ২ দিনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। গতকাল প্রথমদিন সকাল ৭টায় জেপির সকল কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সকাল সাড়ে ৮টায় সাভারস্থ জাতীয় স্মৃতিসৌধে দলের পক্ষ হতে পূষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। শ্রদ্ধা নিবেদনকালে জেপির অন্য নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য মফিজুল হক বেবু, এজাজ আহমেদ মুক্তা, অতিরিক্ত মহাসচিব সাদেক সিদ্দিকী, যুগ্ম-মহাসচিব জামিলুল হক বকুল, খলিলুর রহমান খলিল, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল খায়ের সিদ্দিকী আবু, দপ্তর সম্পাদক এম. সালাহউদ্দিন আহমেদ, প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম তপন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, শিক্ষা সম্পাদক অ্যাডভোকেট এনামুল ইসলাম রুবেল, জাতীয় যুব সংহতির সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম, সহ-সভাপতি জেড সেলিম, মঞ্জুর হাবিব, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী চৌধুরী মিলন, ছাত্রনেতা জীবন কৃষ্ণ বৈরাগী প্রমুখ।
আগামী ১৮ ডিসেম্বর বিকাল ৪টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি কনফারেন্স হলে বিজয় দিবস উপলক্ষে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হবে।
