প্যারেড গ্রাউন্ডে বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:২৩
বিজয়ের ৪১ বছর পূর্তিতে গতকাল জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে সশস্ত্র বাহিনীর কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও সালাম গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবারের প্যারেডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি ছিল দুইশ’ ফুট দীর্ঘ এবং একশ’ বিশ ফুট চওড়া জাতীয় পতাকা। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা এই পতাকা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিবাদন জানান। সর্ববৃহত্ এই জাতীয় পতাকাকে স্যালুট করেন প্রধানমন্ত্রী। রীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রতিবছর বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে সালাম গ্রহণ করলেও অসুস্থতার কারণে এবার রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুুর রহমান দেশের বাইরে রয়েছেন। রাষ্ট্রপতির পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী এবার কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করবেন—তা আগেই জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে এবং ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রী প্যারেড গ্রাউন্ডের অনুষ্ঠানে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে এবং সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী, বিএনসিসি, বিজিবি, পুলিশ, র্যাব, আনসার ও ভিডিপি, কোস্টগার্ড এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বাহিনীর সদস্যরা ছাড়াও তিন বাহিনীর যান্ত্রিক বহর এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের বহর সুসজ্জিতভাবে এই কুচকাওয়াজে অংশ নেয়। বিমান বাহিনীর ফ্লাইপাস্ট এবং বাদক দলের অভিবাদন জানানোর মধ্যে দিয়ে শেষ হয় বিজয়ের ৪১ বছর উপদযাপনের প্যারেড। এবার প্যারেড ময়দান সাজানো হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্থিরচিত্র দিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর অভিবাদন মঞ্চের ঠিক উল্টো দিকে সম্মিলিত বাদক দলের স্ট্যান্ডের পিছনে ছিল বঙ্গবন্ধুর বিশাল ছবি এবং জাতীয় স্মৃতিসৌধের প্রতিকৃতি। আর দুই দিকে ছিল রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে পৌঁছানোর পর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলাম এবং তিন বাহিনীর প্রধান তাকে স্বাগত জানান। প্রধানমন্ত্রী প্রথমে কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন। এরপর অভিবাদন মঞ্চে দাঁড়িয়ে সালাম গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী, তিন বাহিনী প্রধান এবং নবম ডিভিশনের জিওসি এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন। সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী, বিএনসিসি, বিজিবি, পুলিশ, র্যাব, আনসার ও ভিডিপি, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং অশ্বারোহী বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও পুলিশের কুকুরের স্কোয়াড, মহিলা পুলিশের সদস্য, জেল পুলিশ এই প্যারেডে অংশ নেয়। মার্চপাস্টের পর জাতীয় পতাকা, সরকার প্রধানের পতাকাসহ বিভিন্ন বাহিনীর পতাকা নিয়ে প্যারাট্রুপাররা প্যারেড স্কোয়ারে অবতরণ করেন। তারা প্রধানমন্ত্রীকে অভিবাদন জানান। এরপর হর্ষধ্বনির মধ্য দিয়ে বিশাল পতাকা নিয়ে প্যারেড গ্রাউন্ড অতিক্রম করেন বিভিন্ন বাহিনীর ২৮২ জন সদস্য। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে বিভিন্ন বাহিনীর যান্ত্রিক বহর প্রধানমন্ত্রীকে অভিবাদন জানায়। সায়োজা বাহিনীর নতুন পাওয়া এমবিটি-২০০০ ট্যাংক, গোলন্দাজ বাহিনীর বিভিন্ন পাল্লার কামান, নতুন উইপন লোকেটিং রাডার, পদাতিক বাহিনীর আর্মাড পার্সোনাল ক্যারিয়ার, ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের বিভিন্ন সরঞ্জাম, নৌবাহিনীর মিসাইল ও টর্পেডো এবং বিমান বাহিনীর ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য মিসাইল এই যান্ত্রিক বহরে ছিল। সশস্ত্র বাহিনীর যান্ত্রিক বহরের পর এবারের বিজয় দিবসের থিম ‘বিজয় থেকে বিজয়ে’ এবং সহযোগীদের লোগো সম্বলিত একটি সুসজ্জিত খোলা ট্রাকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠ শিল্পীরা ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটি গাইতে গাইতে প্যারেড গ্রাউন্ড অতিক্রম করেন। ট্রাকটি সরকার প্রধানের অভিবাদন মঞ্চ অতিক্রম করার সময় শেখ হাসিনা তাদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়েন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের নিজ নিজ কর্মকাণ্ড নিয়ে সাজানো বাহন ছিল যান্ত্রিক বহরের শেষ ভাগে। শেষ ভাগে বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান, পরিবহন বিমান, হেলিকপ্টার এবং মিগ-২৯ ফ্লাইপাস্টে অংশ নেয়। রাশিয়ার তৈরি যুদ্ধ বিমান ‘মিগ-২৯’ আকাশে শত্রু বিমানকে ধাওয়া করাসহ বিভিন্ন কলাকৌশল প্রদর্শন করে। এরপর অত্যন্ত নিচ দিয়ে উড়ে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ‘ফ্লায়িং স্যালুট’ ও ‘ভিক্টরি রোল’ এবং সম্মিলিত বাদক দলের সালাম প্রদানের মধ্য দিয়ে কুচকাওয়াজ শেষ হয়। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে জনতার ঢল বিজয় দিবস উপলক্ষে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবনে গতকাল জনতার ঢল নামে। জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে সকাল থেকে ছুটে আসে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিভিন্ন স্তরের মানুষ। তাদের সবার মুখে উচ্চারিত হচ্ছিল ‘জামায়াত শিবির রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’, ‘মুজিবের বাংলায় রাজাকারের ঠাঁই নাই, গোলাম আযম, নিজামী, মুজাহিদের ফাঁসি চাই’ স্লোগান। সকাল ৮টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমে সরকার প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় সেখানে তিনি কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবে দলীয় নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু এমপি, তোফায়েল আহমেদ এমপি, দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এমপি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এবিএম তাজুল ইসলাম, আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া অজস্র সংগঠন বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন। শিবিরের আকস্মিক মিছিল পূর্বঘোষিত কোন কর্মসূচি না থাকলেও গতকাল সকালে হঠাত্ রাজধানীর মৌচাকে শিবির বিজয় মিছিল বের করে। লাল-সবুজের পতাকা হাতে শিবিরের মিছিলটি রামপুরা পর্যন্ত যায়। একাধিক মামলার আসামি শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে কয়েক হাজার শিবির কর্মী মিছিলে অংশ নিলেও কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। তবে জামায়াত কোন কর্মসূচি পালন করেনি।