কেয়ার বাবা ছিলেন হবিগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী। একবার ১৬ ডিসেম্বরে ১১ বছরের কেয়া বাবার হাত ধরে যায় জেলা প্রশাসকের বিজয় উত্সবে। সেখানকার আলোচনা, কেয়ার মনকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে, বিশেষ করে বাবার বক্তব্যের প্রতিটি ধ্বনি যেন মর্মে অনুভব করেন তিনি
কেয়া চৌধুরী
কেয়ার বাবা ছিলেন হবিগঞ্জের রাজনীতিবিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী। একবার ১৬ ডিসেম্বরে ১১ বছরের কেয়া বাবার হাত ধরে যায় জেলা প্রশাসকের বিজয় উত্সবে। সেখানকার আলোচনা, কেয়ার মনকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে, বিশেষ করে বাবার বক্তব্যের প্রতিটি ধ্বনি যেন মর্মে অনুভব করেন তিনি। বাবা মারা যাওয়ার পর কেয়ার জীবনে মুক্তিযুদ্ধর সেই গৌরবের আলেখ্য জীবনযুদ্ধের কারণেই কিছুটা আবছা হয়ে আসে। তবে বাবার মুক্তিযুদ্ধ, দেশাত্মবোধের চেতনা থেকে বিচ্যুত হননি কখন। কোথাও মুক্তিযুদ্ধের বিষয় হলে তা শুনেছেন। যখন কেয়ার বিয়ে হয়, তখন স্বামী তাকে বলেন, তোমার বীর বাবার সন্তান হওয়া তখনই স্বার্থক হবে যখন তুমি মুক্তিযুদ্ধ ও যোদ্ধাদের জন্য কিছু করতে পারবে। স্বামীর অনুপ্রেরণায় দারুণভাবে উত্সাহিত হন কেয়া। বন্ধুদের নিয়ে আলোচনায় বসেন। সবাই মিলে ঠিক করেন হবিগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার। তারা আবিষ্কার করেন হবিগঞ্জের গৌরবময় ইতিহাস। খোঁজাখুঁজির এক সময় কেয়া পেয়ে যান ছেলেবেলায় তার সামনে দেয়া বাবার ভাষণের রেকর্ডার। যেখানে বাবা বলেছেন ‘একদিন কম্পন হবে, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যায়ন হবে, মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন হবে।’ কেয়া তার বাবার এই বাণীকে অমোঘ সত্য বলে মানেন। আরো জানতে পারেন হবিগঞ্জে ৩৫ জন বীর নারী আছেন। যারা মুক্তিযুদ্ধের পথপরিক্রমায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। বন্ধুরা মিলে ‘চেতনা ৭১’ এর ব্যানারে কাজ শুরু করেন। যুদ্ধাপরাধিদের বিচার, বীর নারীদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান চিকিত্সার জন্য কাজ করছেন তারা। কেয়া এ পর্যন্ত ৭ জন বীর নারীকে খুঁজে বের করেছেন। কারো চিকিত্সা, কারো কার্ড, কারো জন্য আবার অন্য রকমের সহযোগিতা করে চলেছেন। কেয়া বলেন, যখন প্রথম তাদের দেখা পাই তখন ভয়ে লজ্জায় নিজেদের খোলস থেকে বের করতে চাননি তারা। আজ আমার সাথে তাদের আস্থার জায়গাটি এমন যে ঢাকায় চলে আসেন সাক্ষী হওয়ার প্রয়োজনে। কেয়া মনে করেন বঙ্গবন্ধু বেচে থাকলে তাদের এমন করুন অবস্থা হতো না তেমন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতো। কেয়া মনে করেন এখনও তাদের জন্য কিছুই করা হয়নি তবে একদিন ঠিক কম্পন হবে।’ সন্তান হয়ে পূর্বপুরুষদের দেয়া আদেশ রাখতে না পারলে চেতনার সাথেই দ্বিমত পোষণ করা হবে। এ দায়িত্ব কতটা পালন করতে পারবেন তা কেয়ার জানা নেই, তবে আন্তরিকতার ত্রুটি করবেন না এতটুকু।
মারজান কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়াশুনা শেষ করে একটি কাজও শুরু করেন। একটি ফার্ম দেন বন্ধুর সাথে, পেশাগত দায়িত্ব নিয়েই যেতে হতো মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে, সফটওয়্যার সাপ্লাই দিতেন সেখানে। নিজের চোখে মারজান দেখেছেন কত মুক্তিযোদ্ধা ভাতার কয়টা টাকার জন্য দিনের পর দিন ধরনা ধরেছেন
লুলু-আল-মারজান
লুলু-আল-মারজান বেড়ে ওঠা কক্সবাজারে। ছেলেবেলায় মারজান যখন স্কুলে পড়তেন তখন এক শিক্ষক তাদের ছুটির দিনগুলোতে মুক্তিযুদ্ধ আর যোদ্ধাদের নিয়ে নাটক করতেন। সে সময় মারজানের চেতনার জগতে জায়গা করে নেয় মুক্তিযুদ্ধ। তারপর গড়িয়ে যায় অনেক সময়। মারজান কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়াশুনা শেষ করে একটি কাজও শুরু করেন। একটি ফার্ম দেন বন্ধুর সাথে, পেশাগত দায়িত্ব নিয়েই যেতে হতো মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে, সফটওয়্যার সাপ্লাই দিতেন সেখানে। নিজের চোখে মারজান দেখেছেন কত মুক্তিযোদ্ধা ভাতার কয়টা টাকার জন্য দিনের পর দিন ধরনা ধরেছেন। লিফটের কাছে পড়ে যাচ্ছেন, তাকে একটু ধরার অনুরোধ করছেন। কথা বলে জানতে পারছেন সকাল থেকে খাননি কিংবা সারাদিন খাওয়া হয়নি। অস্তিত্ব কোথায় যেন আলোড়ন অনুভব করেন তিনি। নিজের যেটুকু আছে তা দিয়েই তাদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন মারজান। বলেন, আমাদের তাদের জন্য যেভাবে যেমন করে কাজ করার কথা ছিলো আমরা তেমন করে আজ অবধি করতে পারিনি। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতেও ইচ্ছে করে না। কারণ যাদের অবদান এই দেশের স্বাধীনতায় বেশি তারাই বেশি অবহেলিত। আর সুযোগ সুবিধা যাচ্ছে অন্যত্র। মারজান মনে করেন নানা কারণে এই প্রজন্মের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাদের নিজের শেকড়ের কথা জানাতে হবে। নিজের জায়গা থেকে আমরা যদি একটু একটু কাজ করি তবে যেমন অনেকটা কাজ করা হবে, তেমন এর সুফলও পৌঁছাবে যথাস্থানে। এক্ষেত্রে আমরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে পারি। মারজানের কাজের জায়গাটা বীর নারীদের নিয়ে। এযাবত্ তিনি বিভিন্ন জায়গা হতে ১১ জন বীর নারীকে খুঁজে বের করেছেন। তাদের জীবনধারণের একটা অবলম্বন করে দেয়ার জন্য যোগাযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে। মারজান মনে করেন একজন বীর নারীর নাতী-নাতনী যদি ভিক্ষা করে জীবনযাপন করে আর আমরা কোটি টাকার আলোক সজ্জা করে বিজয় উত্সব করি তবে এর স্বার্থকতা কোথায়? আমরা বিজয় উত্সব করবো তাদের নিয়ে যারা আজও নিজেদের ত্যাগের কথা বলতে কুণ্ঠিত হন লজ্জায়। লজ্জা তাদের নয় আমাদের, আমরা তাদের সম্মান করতে পারিনি।
