হতভম্ব শ্রীলঙ্কা

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০১৯, ২২:১০

শিফারুল শেখ

 

গত ২১ এপ্রিল ছিল খ্রিস্টানদের পবিত্র দিবস ইস্টার সানডে। তারা শ্রীলঙ্কায় অন্যতম সংখ্যালঘু। ২০০৯ সালের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তির পর খ্রিস্টান এবং মুসলিমদের ধর্মীয় উপাসনালয়ে কিছু সাম্প্রদায়িক হামলা চালানোর অভিযোগ বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে ছিল। কিন্তু ইস্টার সানডেতে এত বড় হামলা একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হতে পারে তা অন্তত সাধারণ মানুষের ধারণার বাইরে ছিল। হামলার কারণে হতভম্ব হয়ে পড়েছে শান্তিপ্রিয় এই দেশটি। 

 

রাজনৈতিক বিরোধের প্রভাব!

শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা এবং প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহের সম্পর্ক বিপরীত মেরুতে। প্রেসিডেন্ট চীনপন্থি এবং প্রধানমন্ত্রী ভারতপন্থি বলে পরিচিত। এই রাজনৈতিক বিরোধ ও পরিচয়টা প্রকাশ্যে আসে গত বছর যখন প্রেসিডেন্ট ‘অবৈধভাবে’ প্রধানমন্ত্রী রনিলকে বরখাস্ত করেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট শেষ পর্যন্ত পারেননি। সংখ্যাগরিষ্ঠ এমপি যেমন তার বিপক্ষে ছিলেন, তেমনি ছিল সুপ্রিম কোর্ট। সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ নিজের নিয়োগকৃত প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসেকে সরিয়ে রনিলকেই পুনর্বহাল করেন। কিন্তু সমস্যা যায়নি। বিরোধটা জিইয়ে ছিল যা আবার প্রকাশ্যে আসলো জঙ্গিদের ৮ দফা আত্মঘাতী হামলায় ২৫৩ জন অকালে প্রাণ যাওয়ার পর। এরই মধ্যে প্রতিরক্ষা সচিব পদত্যাগ করেছেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কিন্তু প্রেসিডেন্টের হাতে। দায়িত্বে আছেন প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী। প্রেসিডেন্ট জানিয়েছিলেন, পুলিশ প্রধানও পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু পুলিশ প্রধান বলেছেন, প্রেসিডেন্টের কথায় তিনি পদত্যাগ করবেন না। হামলার পরই স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা মন্ত্রিপরিষদের মুখপাত্র সেনারত্নে জানিয়েছেন, ন্যাশনাল তৌহিদ জামাত হামলা চালিয়েছে। তবে একার পক্ষে এত বড় হামলা চালানো সম্ভব নয়। একদিন পর প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী জানান, নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে হামলার প্রতিশোধ নিতেই নারকীয় হামলা চালানো হয়েছে। কিন্তু তার এই বক্তব্য যেমন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নাকচ করে দেন, তেমনি মুসলিম নেতারাও তার এই বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আবার প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা গত শুক্রবার বলেছেন, মাদক পাচারের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে বেশিরভাগ জঙ্গি গোষ্ঠী। সেই লাভজনক ব্যবসায় আঘাত লাগার কারণেই জঙ্গিরা পাল্টা জবাব দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট জানান, এলটিটিইও এক সময় এই কাজ করতো। আইএস এখন সেই ভূমিকা নিয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে সিরিসেনার সরকার মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে পুলিশি অভিযান শুরু করেছিল। বিপুল পরিমাণ মাদক বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং প্রচুর স্থানীয় ও বিদেশি মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। গির্জায় বিস্ফোরণেরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। তার মতে, সম্প্রতি আর্চবিশপ কার্ডিনাল ম্যালকম রঞ্জিত মাদকবিরোধী প্রচারে চার হাজার ক্যাথলিককে নিয়ে মিছিল করেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী পর্যন্ত জানান, ইসলামিক গোষ্ঠীর সঙ্গে বিদেশি শক্তির যোগাযোগ আছে। হামলার দায়িত্ব স্বীকার করলেও মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস স্বপক্ষে অকাট্য দলিল উপস্থাপন করতে পারেনি। মার্কিন মিডিয়া সিএনএন জানিয়েছে, আইএস হামলার পর দায়িত্ব স্বীকার করেছে এমন অনেকগুলোই ‘ভুয়া’ প্রমাণিত হয়েছে। তবে হামলায় যে ইসলামিক জঙ্গি গোষ্ঠীর হাত আছে সেটা অনেকেই মনে করছেন। কিন্তু বিদেশি শক্তির খোঁজ শেষ পর্যন্ত পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়েই সংশয়। প্রেসিডেন্ট জানান, জঙ্গি হামলার মূল হোতা জাহরান হাশিম সাং রিলা হোটেলে বোমা হামলার সময় নিহত হয়েছে। তবে এর আগে সাং রিলা হোটেলে ইলহাম ইব্রাহিম ও ইনসাফ ইব্রাহিম এই দুই ভাই হামলা চালিয়ে নিহত হয়েছে বলে শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন। আবার গোয়েন্দাদের ধারণা মূল পরিকল্পনাকারী দেশের ভেতর লুকিয়ে আছেন কিংবা বিদেশে পালিয়ে গেছেন। জাহরান হাশিম আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীদের একজন ছিল কি না তাও এখনও স্পষ্ট নয়।

ঘুম থেকে উঠে যদি কেউ শোনেন যে তার নাম এবং ছবি জঙ্গি হামলার তালিকায় উঠেছে তাহলে মনটা কেমন লাগবে? সেই ধরনের কষ্টকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন শ্রীলঙ্কার বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক আমারা মজিদ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাইন ইউনিভার্সিটির ছাত্রী। গত বৃহস্পতিবার ঘুম থেকে উঠে দেখতে পান শ্রীলঙ্কার পুলিশ বোমা হামলায় সন্দেহভাজন নারীর তালিকায় তার নাম ও ছবি সংযু্ক্ত করে দিয়েছে। একজন সহকারী পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে তদন্ত দল এই কাজটি করেছে। কিন্তু এতে অনুমোদন দিয়েছে দেশটির শীর্ষ তদন্ত কমিটি সিআইডি (অপরাধ তদন্ত বিভাগ)। পরে ভুল স্বীকার করে আমারা মজিদের স্থলে ফাতিমা কায়েদার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কলম্বো ভিত্তিক বন্দরনায়েক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের পরিচালক ড. হারিন্দা ভিডেঞ্জ বলেন, সরকারের অক্ষমতা যে কতটা গুরুতর তা এই কাজেই প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তার মতে, সরকার বরফের মতো গলছে।

 

সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়বে

১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে শ্রীলঙ্কায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা রয়েছে। বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ এবং সংখ্যালঘু তালিমদের মধ্যে। ২০০৯ সালে সেই বিরোধের অবসান ঘটে। এবারও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়বে। তবে এবার হবে মুসলিম এবং বৌদ্ধদের মধ্যে। যদিও প্রেসিডেন্ট বলেছেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা খুব জরুরি। তাই বিস্ফোরণের দায়িত্ব মুসলিমদের ওপর চাপানো যাবে না। বিস্ফোরণে মুষ্টিমেয় লোকের হাত ছিল। তাদের রক্ষার দায়িত্ব শ্রীলঙ্কার। তবে ব্যবসায়ী এম. বি. এম আশরাফ বলেছেন, আমাদের নিরাপত্তা নিজেদেরই দিতে হবে। সরকারের ওপর ভরসা রাখলে জীবনটাই চলে যেতে পারে।