আমার দাদুর কথা

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:২১
শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক নিত্যানন্দ পাল হচ্ছেন আমার দাদু (আমরা নানাকে দাদু বলি)। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৩৮ সালের ২৮ জানুয়ারি টাঙ্গাইল শহরের নিকটবর্তী গ্রাম কাগমারীতে। তাঁর পিতা স্বর্গীয় ক্ষিতীশ চন্দ্র পাল তখন জীবিত ছিলেন। তার মাতা সুশীলা সুন্দরী পাল ছিলেন স্বর্গবাসী। আমার দাদু ছিলেন তার পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্র। সুতরাং এদেশের আরও দশটি পরিবারের মতো আমার দাদুর উপর সংসারের অনেক দায়িত্ব এসে পড়েছিল অনেক ছোট বয়সেই। তিনি ১৯৫৩ সালে বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ সন্তোষ জাহুরী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। স্কুলজীবনে ভালো ছাত্রদের মধ্যে তিনিও ছিলেন একজন। তিনি করটিয়া সা’দত কলেজ থেকে ১৯৫৭ সালে আই.এ এবং ১৯৬২ সালে বি.এ পাস করেন। শিক্ষা এবং সাহিত্যের প্রতি দাদুর অনুরাগ ছিল শিক্ষাজীবন থেকেই। ১৯৬৭ সালে তিনি প্রাইভেট প্রার্থী হিসেবে এম.এ পরীক্ষা দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৯৬৯ সালের ১ জানুয়ারিতে অধ্যাপক পদে মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজে যোগদান করেন। সাহিত্যের প্রতি আমার দাদুর অনুরাগ ছিল ছাত্রজীবন থেকেই। তিনি নিয়মিত কবিতা লিখতেন, লিখতেন কিছু প্রবন্ধও। হঠাত্ ১৯৭১ সালের ২০ জুলাই মঙ্গলবার রাত্রি ১১টার সময় সেই সুখের সংসারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। সেদিন রাত্রে কাগমারী গ্রামটা যখন নিস্তব্ধ, তখনই এই গ্রামে হানা দেয় কুচক্রী পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর দোসর এ দেশের রাজাকাররা। এই বাড়ির সামনে ছিল একটা টিনের ঘর। ছায়াঢাকা পরিবেশ ছিল দাদুর প্রিয়। তাই তিনি এই ঘরে ছিলেন। বাড়ির সবাই নিদ্রাহীন অবস্থায় ভয়ে অন্য ঘরে ছিল, তখন দাদুর ঘরের সামনে কর্কশ কণ্ঠের হুঙ্কার -‘দরজা খোল’। সকলের ভয় বেড়ে গেল সেই সময়ে। সেই সময়েই আমার দিদা (আমরা নানীকে দিদা বলি) ছুটে গেলেন বাড়ির অন্য ঘরের বারান্দায়। বাড়ির সবাই বাইরে আসার চেষ্টা করছে। এ সময় কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা কয়েকজন রাজাকার এগিয়ে এসে বন্দুক ধরে সবাইকে নিষেধ করল ঘরের বাইরে যেতে। এরপর আমার দাদুকে ধরে নিয়ে গেল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকাররা। এরপর অনেক চেষ্টা করেও দাদুর আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরে জানা গেল টাঙ্গাইল জেলা সদরের পানির ট্যাঙ্কের নিকট যে বধ্যভূমি ছিল সেখানেই আমার দাদুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু কেন এই হত্যা? দাদু ছিলেন নিতান্তই একজন বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর লোক। সবার সাথে তার সৌহার্দ্যের সম্পর্ক ছিল। তিনি সংবেদনশীল মনের একটি পরিচ্ছন্ন মানুষ। তাঁর গায়ের রং ছিল কালো অথচ দ্যুতিময়। স্বাস্থ্য স্বাভাবিক, পরিধান করতেন ধবধবে সাদা ধুতি এবং শার্ট। চোখে চশমা থাকত সারাক্ষণ। মুখে একটা হাসি লেগেই থাকত। এই ছবি ছিল একজন শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোকের ছবি। আমি আমার ছোট্ট দাদু পরিতোষ পালের কাছে শুনেছি মুক্তিযুদ্ধের প্রতি দাদুর অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল, তিনি মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই একটি কথা বলতেন, “দেশ একদিন স্বাধীন হবেই, তবে আমরা হয়তো সেদিন থাকব না”। দাদুর কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়। দেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু অন্যদের মতো আমার দাদু আর ফিরে আসেনি। বাংলাদেশ সরকার আমার দাদুকে শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ১৯৯৭ সালে ডাকবিভাগ কর্তৃক দুই টাকা মূল্যের ছবিসহ স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশ করে। এছাড়া বাংলা একাডেমী কর্তৃক রশীদ হায়দারের সম্পাদনায় “স্মৃতি/১৯৯১” (২য় খণ্ডে) আমার দাদুর জীবনী ছাপা হয়েছে। আমি আমার দাদুসহ সকল শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্মৃতির প্রতি বিনীত শ্রদ্ধা নিবেদন করে শেষ করছি। ৭ম শ্রেণী,বিন্দুবাসিনী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, টাঙ্গাইল।