হামিদ মাস্টার পোশাকে-আশাকে বেশ পরিচ্ছন্ন ও রুচিবোধসম্পন্ন মানুষ। চুল-দাড়ি পেকে কাশফুলের মত সাদা হয়ে গেছে। তিনি বয়সকে হার মানিয়েছেন। তাঁর নাতি হিজল ক্লাস ওয়ানে পড়ে। সে এখন হামিদ মাস্টারের সব সময়ের সঙ্গী। যতটা না তাঁর কাছে পড়াশোনা করে, তারচেয়ে বেশি ধরে গল্প শোনার বায়না। পড়াশোনাকে পাশ কাটিয়ে চলার এটাও একটা ফন্দি। আজ যখন তার দাদুভাই তাকে বর্ণ পরিচয় পড়াতে গেল—ম তে মুক্তি য তে যুদ্ধ; হিজল একটা সুযোগ পেয়ে গেল।
দাদুভাই, যুদ্ধ মানে কী?
অধিকার অর্জনের জন্য লড়াই করা।
মা আমাকে নানুবাড়ি না নিয়ে গেলে আমি যে ঝগড়া করি এটা যুদ্ধ?
হামিদ মাস্টার মুচকি হেসে বললেন, হ্যাঁ, দাদুভাই এটাও যুদ্ধ।
আচ্ছা দাদুভাই, তুমি কি কখনো যুদ্ধ করেছ?
প্রশ্নটা শুনে হামিদ মাস্টারের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। মুঠি বদ্ধ হতে লাগল। চোখ দু’টি জ্বলজ্বল করে উঠল।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেরে বলল, হ্যাঁ রে দাদুভাই, যুদ্ধ করেছি। অবিশ্বাস্য বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছি। একথা মনে হলেই গর্বে বুকটা উঁচু হয়ে যায়। মনে হয় দেশের জন্য কিছু করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। দেশ স্বাধীন করায় ভূমিকা রেখেছি। এরচেয়ে গর্বের আর কী হতে পারে!
তুমি কোথায় কীভাবে যুদ্ধ করেছ?
হামিদ মাস্টার আনমনা হয়ে গেলেন। মনে হয় দূরে কোথাও তাকিয়ে আছেন। হিজলের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। তারুণ্যের আবেগতাড়িত যুবক। পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ, বঞ্চনা আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) মানুষ ফুঁসে উঠেছে। মানুষের মধ্যে চাপা ক্ষোভ। কান পাতলেই চারদিকে একটা চাপা গর্জন শোনা যায়। বিস্ফোরণোন্মুখ অবস্থা। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলার পতাকা প্রথম উত্তোলন করা হল। স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখতে থাকলাম। সময়টা ছিল ১৯৭১ সালের ২ মার্চ। তারপর ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তেজস্বী ভাষণ দিলেন। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তিনি যখন আঙুল উঁচিয়ে বললেন—“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম”। আমাদের রক্তের ভেতর একটা ঢেউ খেলে গেল। দেশ যখন আক্রান্ত,তখন লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকব, এমনটা ভাবতে পারলাম না। ভেতর থেকে একটা তাগিদ অনুভব করলাম। আমার নিজ জেলা জামালপুরে চলে গেলাম। বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সে যোগ দিলাম। বাংলায় আমাদের বলা হতো মুজিব বাহিনী। আমি ছিলাম কমান্ডার। আমার দলে আরো চৌদ্দজন ছিল। আমরা মূলত গেরিলা যুদ্ধ করতাম। দিনেরবেলা ইন্ডিয়াতে পালিয়ে যেতাম। রাতে এসে অভিযান করতাম। আমাদের না ছিল অস্ত্র, না ছিল প্রশিক্ষণ। এমনকি আমাদের পায়ে জুতো কিংবা গায়ে কাপড় পর্যন্ত ছিল না। তারপরও অসম সাহসী অভিযান করে পাকবাহিনীকে তাক লাগিয়ে দিতাম। আমাদের গুপ্তচর ছিল। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে আক্রমণ করতাম।
আচ্ছা দাদুভাই, যুদ্ধের কোন ঘটনা তুমি কোনদিন ভুলতে পারবে না?
মানুষের মাঝে মাঝে এমন সব ঘটনার মুখোমুখি হতে হয় যা কোনদিন ভোলা যায় না। ১৯৭১-এর কথা মনে হলেই একটা ঘটনা মনের জানালায় উঁকি দিয়ে যায়। আমি আবেগপ্রবণ হই। মুক্তিবাহিনী যেমন তৈরি হয়েছিল,পাশাপাশি রাজাকার বাহিনী, আল-বদর বাহিনী ও আল-শামস বাহিনীও গঠিত হয়েছিল। সুন্দরের সাথে অসুন্দরের পথচলা। আমাদের এক সহযোদ্ধার বাবা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পদলেহী রাজাকার ছিল। সে ছিল খুব অত্যাচারী। তার অত্যাচারে এলাকার মানুষ ছিলো অতিষ্ঠ; তেমনি সাধারণ মানুষও। সে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুপ্তচর। তার কারণে একবার প্রায় পাকসেনাদের কাছে ধরা পড়েছিলাম। এলাকায় ঢুকলেই তার বিরুদ্ধে হাজারো অভিযোগ শুনতাম। আমি খুব বিপদে পড়ে গেলাম। কী করব ভেবে পাচ্ছি না। নয়ন একজন নিবেদিতপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধা। তার বাবা রাজাকার। একদিন নয়ন আমার কানে কানে বলল, হামিদ ভাই, আজ রাতে এক রাজাকার ধরে আনব। আমি নাম জানতে চাইলে বলল, পরে জানাব। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। আমরা নয়জন হিরণপয়েন্টে অপেক্ষা করছিলাম। বাঁশবাগানের ভিতর একটি নিরিবিলি জায়গা ছিল। সেখানে আমরা প্রায়ই জড়ো হতাম। এই জায়গার নাম দিয়েছিলাম হিরণপয়েন্ট। পাঁচ-ছয়জনের একটি দল নিয়ে নয়ন চলে গেল। ঘন্টাখানেক পর একজনকে চোখ বেঁধে নিয়ে হাজির হল হিরণপয়েন্টে। অন্ধকারের মধ্যেও চিনতে বাকি রইল না, তারা কাকে ধরে এনেছে। নয়ন চিত্কার করে বলতে লাগল shoot him, আমি নয়নকে একটু আড়ালে নিয়ে বললাম, “চাচাকে একবার সুযোগ দেয়া যায় না?” নয়ন একটা গালি দিয়ে বলল, “হাজারবার সুযোগ পেলেও সে ভাল হবে না। সে দেশের শত্রু।”
