হলুদ খামের চিঠি। দেখতে খুব সুন্দর। এইমাত্র দিয়ে গেল পিয়ন মায়ের কাছে। উঠোনে দাঁড়িয়ে মা ভাবছে! কে পাঠালো চিঠি। আবুলের কাছে? প্রেরকের নাম নেই। শুধু লেখা রয়েছে জঙ্গলবাড়ি হতে। প্রাপক আবুল হোসেন, গ্রাম-উত্তর মেরুন্ডী, পোস্ট-পালা, থানা-হরিরামপুর, জেলা-মানিকগঞ্জ, বাংলাদেশ।
মুক্তিযুদ্ধে গেছে আবুল। যাবার সময় বলে গেছে বাড়ি ফিরতে দেরি হবে। ভাগ্নী মামার সাথে যেতে বায়নাও ধরেছিল সেদিন। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। চিঠি হাতে পেয়ে ভাইয়ের জন্য বোনের চিন্তার আঁকিবুঁকি বেড়ে যায়। কোথায় আছে কিছুই জানা নেই। কেমন আছে? কী খাচ্ছে? তারপর এক দীর্ঘশ্বাস...। যেখানেই থাকো, ভালো থাকো আবুল।
পুষি বেড়াল সবকিছু দেখে মিউ মিউ ডাকে আবেগমাখা সুরে। ভাগ্নীর নাম লতা। লতা পুষিকে দেখে ঘরে বসে। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে মাকে, উঠোনে দাঁড়িয়ে। মায়ের মুখ মলিন, হাতে হলুদ খাম।
লতা বলল— মা, ওমা তোমার হাতে কী কারো চিঠি?
মা বলল- তোর মামার চিঠি। দাও মা, আমার হাতে দাও, আমি পড়ি। না, তোর হাতে দেয়া যাবে না।
কেন মা?
এটা তো মামা পাঠিয়েছে আমার কাছে তাই না?
না, তোর মামা পাঠায়নি, তোর মামার কাছে পাঠিয়েছে।
কে পাঠিয়েছে মা?
তা তো জানি না।
দাও না মা আমার কাছে।
জানি না, একজনের চিঠি অন্যজন পড়া নিষেধ।
না, জানি না।
তোমার চিঠি তুমি না পড়ে অন্য কেউ পড়লে তোমার কেমন লাগবে?
খারাপ লাগবে।
তবে, তুই কেন পড়বি তোর মামার চিঠি?
ঠিক আছে মা, মামা আসলে মামাকে দিয়ে দিও।
বিজয়ের আনন্দে ভাসছে দেশ। মায়ের মুখে কোন হাসি নাই। কি করে হাসবে? আবুলের দেখা মেলেনি এতোদিন হল। হলুদ খামের চিঠি এলো কোথা থেকে মা ভাবতে থাকে।
ঘোরাঘুরি করছে পুষি। মিউ মিউ করে ডাকছে। কি যেন বলতে চায়। পুষির কথা কেউ বুঝে না। কিন্তু লতা খানিকটা বোঝে! তাই আদর করে কোলে নিয়ে বলে, চল ঘরে যাই। তারপর টেবিলে বসিয়ে দেয় পুষিকে। লতা বসে চেয়ারে। পুষি মিউ মিউ করতে থাকে। লতা বলে! কিরে পুষি, মামার চিঠি পড়তে চাস? পুষি মাথা নাড়ে। মানে, হ্যাঁ। আমরা শুধু শুনতে থাকি, মিউ মিউ, লতা বগবগ করছে একা।
-কি করে পড়বি, ওটা তো মামার চিঠি। মামার চিঠি মামা পড়বে বুঝলি। পুষি চুপ। মামা বাড়ি থাকলে খুব মজা হত, তাই নারে পুষি? মামা মজার মজার গল্প বলত। আমার জন্য কত কত খেলনা বানাতো। বলতে বলতে চোখ পড়ে মামার তৈরি তিন চাকা গাড়ির দিকে। ফিক করে হাসি হাসে লতা, মিউ মিউ করে ডাকে পুষি। গাড়ি নিয়ে ছুটে যায় উঠোনে, খেলায় মেতে থাকে দু’জন। ওদের হাসি দেখে মাও খুশি।
তিনদিন হল সূর্যের দেখা নেই। ঝুম ঝুম বৃষ্টি। গতকাল বৃষ্টির সাথে ঝড়ও হয়েছে বেশ। আজ ঝড় নেই ছিটেফোঁটা বৃষ্টি হচ্ছে। বাবা বাড়িতে এসে ডাকছে- লতা, লতা মামনি কই? দৌড়ে যায় লতা, বাবার কাছে। বাবাকে পেয়ে মহাখুশি। আনন্দে নাচতে থাকে পুষি বেড়ালও। বাবা ঘরে গিয়ে কাপড় পাল্টায় আর লতা মামার গাড়ি চালায় আর মনের খুশিতে বলতে থাকে—
বাবা আয়ছে বাড়িতে/ চড়ছি মামার গাড়িতে/ আনন্দ ধুম ধাম,/ বৃষ্টি পানি হাঁড়িতে/ রোদের ছোঁয়া শাড়িতে/হলদে চিঠির খাম।
বলেই ডাকে মা, ওমা হলদে চিঠির খামটি বাবাকে দেবে না? মামা তো আর বাড়ি ফিরে এলো না। চিঠিও পড়া হল না। কবে আসবে ফিরে তাও জানি না।
মা বলে এদিকে আয়, নিয়ে যা। দৌড়ে গিয়ে নিয়ে আসে লতা, তারপর বাবার চোখে চোখ রেখে বলে- এই নাও বাবা, মামার চিঠি।
বাবা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে বুঝতে পারে না, কে পাঠিয়েছে। তবে হাতের লেখা খুব পরিচিত মনে হয় ক্যাপটেন ....।
লতা বলে, কী ভাবছ বাবা এ চিঠিতো মামাকে পাঠিয়েছে।
বাবা চিঠি না খুলে মন ভার করে বলে, একজনের চিঠি অন্যজন পড়া নিষেধ।
লতা ভাবতে থাকে মামার কথা, পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে পুষি।
চিঠির হলুদ খামটি পড়ে আছে ড্রয়ারে। অনেকদিন হলো ওটা কেউ খুললো না। মামা আর ফিরে আসেনি।
