বিজয় দিবস উপলক্ষে জেপির আলোচনা সভা

সমাজ ও রাজনীতিতে বৈপরীত্য ঢুকে পড়েছে

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:০৪
জাতীয় পার্টি-জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, সমাজ ও রাজনীতিতে বৈপরীত্য ঢুকে পড়েছে। এ কারণে রাষ্ট্র বা সমাজ পরিচালনা এখন কঠিন হয়ে উঠেছে। রাজনীতির মধ্যে অনুপ্রবেশ ঘটেছে মতলবের। মহান বিজয়ের ৪১ বছর উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয় পার্টি-জেপি আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ এতে অতিথি হিসাবে বক্তব্য রাখেন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, স্বাধীনতার পর ৪১ বছর ধরে আইন-শৃঙ্খলা ঠিক করার কথা বলা হচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলার অবনতিও ঘটছে। নেতা যদি জনপ্রিয় ও নিঃস্বার্থ হন এবং তার প্রতি জনগণের আস্থা থাকলে অল্প সংখ্যক লোকজন দিয়েই আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মুক্তিযুদ্ধের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের মাঠ থেকে ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে সারাদেশ নিয়ন্ত্রিত হত, তখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটতো না। কারণ, সেখানে কে কি পেলেন, দেশ স্বাধীন হলে কি পাওয়া যাবে-এসব নিয়ে কখনও আলোচনা ছিল না। লক্ষ্য ছিল দেশকে পাকিস্তানের অত্যাচার-নির্যাতন থেকে মুক্ত করা। এখন আমরা কি পেলাম, ক্ষমতায় গেলে কি পাব, এই আলোচনা প্রাধান্য পাওয়ার কারণেই আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর মত বাঙালি আর হবে না। কর্মীর বিরুদ্ধে নেতা ষড়যন্ত্র করতে পারেন, বঙ্গবন্ধুর আমলে তা কল্পনাও করা যেত না। নেতা তার কর্মীদের স্নেহ করবেন, কর্মী নেতাকে ভালোবাসবেন, নেতার জন্য প্রয়োজনে কর্মীরা জীবনও দেবেন- বঙ্গবন্ধুর সময় এটিই ছিল নেতার সঙ্গে কর্মীদের সম্পর্ক। বর্তমানে সে ধরনের নেতৃত্বেরও অভাব দেখা দিয়েছে। গত ৯ ডিসেম্বর বিরোধী জোটের অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে নিরীহ কর্মজীবী বিশ্বজিত্ দাসকে হত্যার প্রসঙ্গ টেনে জেপি চেয়ারম্যান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আজ হানাহানি চলছে। অপরাধী তো অপরাধীই। কিন্তু খুনিরা কোন্ দলের লোক তা নিয়ে মিডিয়ায় যেমন বিতর্ক চলছে, তেমনি বিতর্কে জড়াচ্ছেন রাজনীতিবিদরাও। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। ময়না তদন্তের রিপোর্টে যারা বললেন, নিহতের গায়ে কোপের চিহ্ন নেই, রিপোর্টে এটা লেখার আগে তাদের মনে রাখা উচিত ছিল যে, তারা একটি মহত্ পেশায় নিয়োজিত। তিনি বলেন, এভাবে প্রশাসনের ভেতরেও আজ বৈপরীত্য চলে এসেছে, চলছে তোষামোদি। যারা এই তোষামোদি করছেন তারা কতটুকু নিজের জন্য, কতটুকু নেতার জন্য করছেন তা প্রশ্নসাপেক্ষ। সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে সিরাজুল আলম খানের ভূমিকাও আজ উচ্চারিত হওয়া উচিত। তিনি কখনও সামনে আসতেন না, সবসময় পেছনে থেকে অবদান রেখেছেন। জেপির রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, কি পেলাম-কি পাব, এই চিন্তা মাথায় রেখে জেপি রাজনীতি করে না। জেপির রাজনীতি পরিচালিত হয় নীতি-আদর্শের উপর ভিত্তি করে। এখানে গণতান্ত্রিক পন্থায় সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য এটা আত্মমর্যাদার বিষয়। জেপি মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, বঙ্গবন্ধুকে উচ্ছেদের আন্দোলন যে ভুল ছিল তা স্বীকার করে জাসদের এখন ক্ষমা চাওয়া উচিত। তা না হলে তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক রাখা উচিত নয়। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৪১ বছরে জিডিপি, শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি ও লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাসসহ বহুক্ষেত্রে আমাদের অর্জন বিষ্ময়কর। কিন্তু গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান, দুর্নীতি নির্মূল ও কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতাও রয়েছে। ১৯৯১ সাল থেকে কথিত গণতান্ত্রিক শাসনামলে প্রতিবারই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন কমে গেছে। জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুর রহিম বলেন, নির্বাচন হয়, সরকার বদল হচ্ছে। কিন্তু সত্যিকারের সুস্থ রাজনীতি আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারছি না। দলের অতিরিক্ত মহাসচিব সাদেক সিদ্দিকী বলেন, রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির কারণেই স্বাধীনতার ৪১ বছর পরেও জাতীয় মৌলিক ইস্যুগুলোতেও বিতর্ক চলছে। একথাও সত্য যে, আমাদের অর্জনও কম নয়। দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ দ্রুত সম্পন্নের জন্য সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। জেপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল খায়ের সিদ্দিকী আবুর পরিচালনায় আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য মিসেস আমেনা বারী, আবু সাঈদ খান, এজাজ আহমেদ মুক্তা, ভাইস চেয়ারম্যান নাজমুন নাহার বেবী, যুগ্ম-মহাসচিব আলহাজ্ব জামিলুল হক বকুল, খলিলুর রহমান খলিল, জাতীয় যুব সংহতির সভাপতি এম এ কাইয়ুম, মহিলা পার্টির সাধারণ সম্পাদক জাহানারা আরজু, জাতীয় স্বেচ্ছাসবেক পার্টির সদস্য সচিব আমিনুল ইসলাম তপন প্রমুখ। সভায় উপস্থিত ছিলেন- দলের ভাইস চেয়ারম্যান শেখ মো. জয়নাল আবেদীন, সম্পাদকমণ্ডলীর মধ্যে এম. সালাহ উদ্দিন আহমেদ, আব্দুস সালাম বাহাদুর, আব্দুল হালিম, গাজী আমিনুর রহমান রতন, মাহবুবর রহমান লিপটন, আব্দুল মান্নান বাবু, জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, মনির হোসেন কমল, এডভোকেট এনামুল ইসলাম রুবেল, হুমায়ুন কবির তালুকদার রাজু, শহীদুল ইসলাম শানু, ওয়াকিল আহমেদ ওকাল, নূরুল ইসলাম মিয়া খান, জাতীয় যুব সংহতির সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম প্রমুখ।