রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়েছে। আগামীকাল ভোট। গতকাল মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে প্রার্থীদের প্রচারণা শেষে এখন চলছে জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ। কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়া উত্তরের এই নগরীতে হাড় কাঁপানো শীতের মধ্যেও নির্বাচনী উত্তাপ তুঙ্গে উঠেছে। সবার মনে একটাই প্রশ্ন কে হচ্ছেন রংপুরের নগর পিতা ? তবে এই প্রশ্নের উত্তর পেতে ভোটারদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। নির্বাচন উপলক্ষে পুরো নগরীতে চার স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিটি মোড়ে বসানো হয়েছে চেক পোস্ট।
এদিকে, প্রচারণার শেষ মুহূর্তে গতকাল দুপুরে জাতীয় পার্টির (এ) সাংবাদিক সম্মেলন নাটকীয়তার জন্ম দিয়েছে। জাতীয় পার্টি (এ) থেকে বহিষ্কৃত মেয়র প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফাকে ভোট না দেয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন রংপুর মহানগর ও জেলা জাতীয় পার্টির নেতারা। এরপরেও বেশিরভাগ ভোটার মনে করেন, এ নির্বাচনে ১২ মেয়র প্রার্থী থাকলেও লড়াই হবে ত্রিমুখী। ৩ প্রার্থীর মধ্যে হবে হাড্ডাহাড্ডি ভোটযুদ্ধ। তাদেরকে ঘিরেই থাকবে ভোটে জয়-পরাজয়ের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তারা হলেন জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা সাবেক এমপি শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু (প্রতীক মোটরসাইকেল), জাতীয় পার্টি (এ) থেকে বহিষ্কৃত নেতা সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা (প্রতীক হাঁস) ও জাতীয় পার্টি (এ) থেকে বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক পৌর মেয়র একেএম আব্দুর রউফ মানিক (প্রতীক চশমা)। নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের সঙ্গে কথা বললে তারা ইত্তেফাককে জানান, শহরের রাস্তাঘাট, দোকানপাট, অফিস-আদালত সবখানে চলছে তিন প্রার্থী নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এমনকি এই তিন প্রার্থীর পোস্টারে ছেয়ে গেছে পুরো শহর। শহরতলী ও আশ-পাশের গ্রামগুলোতেও দেখা গেছে একই চিত্র। নির্বাচনে মেয়র পদে ১২ জন, ৩৩টি সাধারণ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ৩২৯ জন এবং সংরক্ষিত ১১টি ওয়ার্ডে ৯১ জন প্রার্থীদের পাশাপাশি তাদের কর্মী-সমর্থকরাও ব্যস্ত সময় পার করছেন।
প্রতিদ্বন্দ্বী তিন প্রার্থীর ভাবনা: নির্বাচনের বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক এমপি শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, রংপুরের জনগণ তার পক্ষে রয়েছে। তিনি মেয়র পদে নির্বাচিত হবেন বলে আশাবাদী।
জাতীয় পার্টির (এ) বহিষ্কৃত নেতা ও মেয়র প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, জনতার হাতে রায়, জনতার হাতে জয়। আমার বিজয় সময়ের ব্যাপার মাত্র। এবার ভোট বিপ্লব হবে। জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।
জাতীয় পার্টির (এ) বহিষ্কৃত নেতা ও মেয়র প্রার্থী একেএম আব্দুর রউফ মানিক বলেন, আমি রংপুর পৌরসভার মেয়র থাকাকালীন সময়ে পৌর এলাকার প্রতিটি ওয়ার্ডের রাস্তা-ঘাট, কালভার্ট, ড্রেন, যাত্রী ছাউনিসহ ব্যাপক উন্নয়ন করেছি।
নগরীতে চার স্তরের নিরাপত্তা বলয়: রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে পুরো নগরীতে চার স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। গতকাল দুপুর থেকে নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে চলছে তল্লাসী। নির্বাচনের দিন ৬ জন জুডিশিয়াল ও ৪৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ মোট ৫১ জন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে থাকবে। প্রতিটি বিভাগে ১০টি করে স্ট্রাইকিং ফোর্স টহল দিচ্ছে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রতিটি জোনে ৪টি বিশেষ টহল ও দুপুরের পর থেকে তাদের সঙ্গে আরো ৬টি করে বিশেষ স্ট্রাইকিং ফোর্স টহল দিচ্ছে। পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি মোঃ ইকবাল বাহার পিপিএম জানান, ১’শ ৭৮টি ভোট কেন্দ্রে নিরাপত্তার জন্য ৫ হাজার ৭’শ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত থাকবে। এর মধ্যে পুলিশ ২ হাজার ২’শ, র্যাব ৩’শ, বিজিবি ১’শ, ব্যাটালিয়ন আনসার ৫’শ ৫০ জন। এছাড়া নির্বাচনী কেন্দ্রে ২ হাজার ৫’শ আনসার দায়িত্ব পালন করবে। র্যাব ও পুলিশের ৫৬টি মোবাইল টিম মাঠে থাকবে। এছাড়াও অতিরিক্ত নিরাপত্তার জন্য পুলিশের স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রস্তুত থাকবে। সাদা পোশাকধারী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন।
ঝুঁকিপূর্ণ ১০৪টি কেন্দ্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা
পুরো নির্বাচনী এলাকায় ১৭৮টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ১০৪টিকে ঝূঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও প্রশাসন। এসব কেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ঝূঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে। এবিষয়ে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং অফিসার মনিরুল ইসলাম ইত্তেফাককে জানান, ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে আমরা সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। সেই লক্ষ্যে প্রিজাইডিং ও সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
৪টি কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট: চলমান নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও পরীক্ষামূলকভাবে ৪টি কেন্দ্রে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে সিটি করপোরেশনের ১১নং ওয়ার্ডের পূর্ব রাজেন্দ্রপুর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ২৩টি ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ৫ নভেম্বর রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। নবগঠিত রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় বর্তমান ভোটার সংখ্যা মোট ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৭৪২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার রয়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ১২৮ জন এবং মহিলা ভোটার ১ লাখ ৭৮ হাজার ৬১৪ জন।
