মানবতাবিরোধী অপরাধে আটক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এমপি বলেছেন, বিচারক, রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি এবং সাক্ষী একত্রে কথা বলে বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগের বিশ্বস্ততা ও সততাকে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। এ বিষয়টিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু দুঃখ হয় আমাদের ট্রাইব্যুনালে এমন একটি কাজ হয়েছে। তিনি বলেন, এখন দেখছি যারা চুরি করেছে তার বিচার না হয়ে যারা দেখেছে তাদের বিচার হচ্ছে। গতকাল বুধবার যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এ কথা বলেন। বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ১৭তম সাক্ষীর ক্যামেরা ট্রায়ালে সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য ছিলো। সালাহউদ্দিন কাদেরের এক আবেদনের প্রেক্ষিতে সাক্ষ্য গ্রহণ রবিবার পর্যন্ত মুলতবি রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জেয়াদ আল মালুমকে মামলা পরিচালনা থেকে অব্যাহতি দেয়ার আবেদন করেন সালাহউদ্দিন কাদের। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, স্কাইপে’র কথোপকথন থেকে দেখা গেছে, জেয়াদ আল মালুম ট্রাইব্যুনালের পদত্যাগী চেয়ারম্যানের সঙ্গে বিচার কার্যক্রম কীভাবে সাজানো হবে তা নিয়ে শলা-পরামর্শ করেছেন। সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, জেয়াদ আল মালুমের বিরুদ্ধে আমি যে আবেদন করেছি সেটি নিষ্পত্তি হওয়ার পর মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করা হোক। তিনি ডেইলি স্টারের জনমত জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, বর্তমানে দেশের ৭৩ শতাংশ মানুষ ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলোর পুনর্বিচার চান। এটা এখন শুধু আমাদের বিষয় নয়। এটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, আমি ৩৩ বছর ধরে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। কোনো নির্বাচনে আমি হারিনি। গত দুই বছর আমি এই ট্রাইব্যুনালে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আদালত আমান্য হয় এমন কোনো আচরণ বা কথা কখনো বলিনি। কিন্তু যখন বিচার ব্যবস্থার মান-সন্মান যাচ্ছে তখনই আমি কথা বলছি।
তিনি বলেন, এদেশ সবার। বিচার ব্যবস্থা সবার। এটার মান গেলে বাংলাদেশের মান সমুন্নত রাখা যায় না। ‘বাংলাদেশে অবিচার’ শিরোনামে যখন দ্য ইকোনমিস্টের মতো পত্রিকায় কাভার স্টোরি হয় তখন এটা আমার আপনার সকলের সম্মানে কী লাগে না।
আইনমন্ত্রী মন্ত্রী বলেছেন ডিসেম্বর মাসের মধ্যে রায় দিতে। এ অবস্থায় ট্রাইব্যুনালকে তার অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। তিনি বলেন, যিনি চুরি করে ধরা পড়েছেন তার বিচার হবে না, যে দেখেছেন তার বিচার হবে এটা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। আমি মনে করেছিলাম এ ঘটনায় ট্রাইব্যুনাল বিব্রত হবে। কিন্তু এখন আমিই বিব্রত হচ্ছি।
এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের অপর একী কৌঁসুলি সুলতান মাহমুদ সীমন বলেন, আদালতের আদেশ অনুযায়ী ১৭তম সাক্ষীর ক্যামেরা ট্রায়ালে সাক্ষ্যগ্রহণ করা হোক। তখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, এটা কী ধর্ষণের মামলা যে সাক্ষীর সাক্ষ্য ক্যামেরা ট্রায়ালে নিতে হবে। এডভোকেট সুলতানা কামালও ্এসে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তখনতো ক্যামেরা ট্রায়াল হয়নি। এই সাক্ষী কী সুলতানা কামালের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।
সবার স্বার্থে বিচার ব্যবস্থার মান সম্মান রক্ষা করতে হবে। আমরা সবাই মারা যাবো। আমাদের সন্তানেরা যাতে এদেশে ভালো থাকে সে জন্য বিচার ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে হবে। তিনি বিচারকদের উদ্দেশে বলেন, আপনাদের সম্মানের স্বার্থে আমি এটা বলছি। এ সময় ট্রাইব্যুনাল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে বসতে বললে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল মাইন্ড করলে কিছু বলবো না। এ সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এটিএম ফজলে কবীর বলেন, আপনি বসার মতো লোক নন। পরে সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, সংসদে স্পিকারের মতো আপনার কাছ থেকেও স্বীকৃতি পেলাম।
পরে তার আইনজীবী আহসানুল হক হেনা ট্রাইব্যুনালে বলেন, আমরা সন্দেহ করছি ন্যায় বিচার হবে না। এজন্য রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জেয়াদ আল মালুমের অপসারণ দাবি করে আবেদন করেছি। মক্কেলের নির্দেশনার বাইরে গিয়ে আমি মামলা পরিচালনা করতে পারি না। আবেদনের শুনানির পর মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার আবেদন করছি। তিনি বলেন, এতোদিন জানতাম বিদেশ থেকে জিনিসপত্র আমদানি করা হয়। এখন দেখছি, আদালতের আদেশ, রায়ও আমদানি করা হচ্ছে।
আবেদনের বিষয়ে ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, যেহেতু জেয়াদ আল মালুমকে ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান সাপোর্ট দিতেন এবং তিনি (নিজামুল হক) পদত্যাগ করেছেন, সেহেতু ন্যায়বিচারের স্বার্থে মালুমকেও অপসারণ করা উচিত।
তিনি বলেন, বিচারের নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে জেয়াদ আল মালুমকে অপসারণ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইন অনুযায়ী শাস্তি দেয়া হোক। অথবা বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের বিধান অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। তিনি বলেন, এর আগে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলামকে অসদাচরণের অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল-১ এ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তেমনি মালুমের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
বেলজিয়ামের ব্রাসেলস প্রবাসী বাংলাদেশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ আহমেদ জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের স্কাইপে সংলাপের ওপর সংবাদ প্রকাশিত হয় দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায়। এরপর গত ১১ ডিসেম্বর পদত্যাগপত্র জমা দেন বিচারপতি নিজামুল হক। এ নিয়ে ব্রিটেনের প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট চলতি সংখ্যায় ‘বাংলাদেশে অবিচার’ শিরোনামে একটি কাভার স্টোরি প্রকাশ করে।
