হযরত ফাতেমা (রা.)-এর চারিত্রিক গুণাবলী

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:৫১
হযরত ফাতেমা জোহরা হযরত মুহাম্মদ (স.) এর কলিজার টুকরা ও নয়নের মনি। তাঁর নাম শোনেননি এমন মানুষ পৃথিবীতে খুব কমই আছে। তিনি মুসলমান নারী সমাজের অহংকার। তিনি শুধু নবীর আদরের দুলালী এই পরিচয় দিলে কম হবে বরং তিনি ছিলেন খোলাফায়ে রাশেদীনের চতুর্থ খলিফা ইসলামের বীর সৈনিক হযরত আলী (রা.) এর প্রিয়তমা স্ত্রী এবং ইসলামের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম শহীদ হযরত ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইনের জননী। হাদীসের বর্ণনা হতে জানা যায়, নবী কন্যা খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা জান্নাতী নারীদের সর্দার হবেন। বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফে উল্লেখ আছে প্রিয়নবী (স.) বলেন কলিজার টুকরা নয়নের মনি হযরত ফাতেমা। তাকে যে জন রাগান্বিত করল মনে রাখবে সে যেন আমাকে ক্রোধান্বিত করল এবং সম্পর্কের অবনতি ঘটাল। অন্য হাদীসে নবী (স.) বলেন, ‘জান্নাতের নারীদের মধ্যে চরজন নারী সর্বশ্রেষ্ঠ। এর মধ্যে হযরত জিব্রাইল (আ.) এর মাধ্যমে জানতে পেরেছেন যে, এবারও তার একটি কন্যা সন্তান হবে, যে কন্যা হবে জগত্ বরেণ্য, হযরত ফাতেমাকে আল্লাহ বিশ্ব বরেণ্য আদর্শ নারী রূপেই দুনিয়ায় পাঠানোর উদ্দেশ্য ছিল। যার কারণেই তাকে সর্বগুণে গুণান্বিত করে দুনিয়াতে পাঠালেন। হযরত ফাতেমা (রা.) এর চারিত্রিক গুণাবলী সম্পর্কে জানতে গেলে দেখা যায় যে, প্রিয় নবী (স.) এর চরিত্রের প্রতিটি গুণই তার জীবনে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি ছিলেন সত্যের পূজারী, আমানতদারী, লাজুক, নম্র ও সরলমনা। হযরত ফাতেমা শিশুকাল থেকেই শান্ত সরলমনা ছিলেন, তিনি কখনও কারো সাথে ঝগড়া-বিবাদ করতেন না বরং অন্য ছেলে মেয়েরা ঝগড়া করলে তার মিমাংসা করে দিতেন। সবার সাথে সুন্দর ব্যবহার করতেন তার সুন্দর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে নবী (স.) এর প্রধান শত্রুরাও তার প্রশংসা করতে ভুলতেন না। শৈশব থেকেই হযরত ফাতেমা ছিলেন নির্ভীক, তেজস্বিনী ও বক্তা। তিনি উচিত কথা বলতে কাউকে ছাড়তেন না, সকল বাধা বিপত্তি পেরিয়ে সর্বদা সত্য ও উচিত কথা বলতেন। তিনি সর্বদা তার পিতা হযরত মুহাম্মদ (স.) এর আদর্শ অনুসরণ করতেন এবং মা বিবি খাজিদা (রা.) এর আদেশ ও উপদেশাবলী মনযোগ দিয়ে শুনতেন এবং বাস্তব জীবনে তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। প্রকৃতপক্ষে পিতা মাতার শিক্ষাই হল জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা। হযরত ফাতেমা (রা.) এর আদর্শ শিক্ষা এর জীবন চলার পথ নির্দেশীকা একমাত্র আদর্শ পিতা মাতার নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে পিতা মাতার আদেশ নিষেধ উপদেশ তিনি তার জীবনে শ্রেষ্ঠ আদর্শ রূপে গ্রহণ করেছিলেন। প্রিয় নবী (স.) এর প্রতিটি গুণের সমাহার ঘটেছিল ফাতেমা (রা.) এর মানসপটে। হযরত ফাতেমা (রা.) তাঁর পিতা মাতাকে ভীষণ ভালোবাতেন। অল্প বয়সেই তিনি তাঁর মাতা খাদিজা (রা.) কে হারান। একদিন হযরত খাদিজা (রা.) অসুস্থ অবস্থায় খুব আফসোসের সাথে বললেন, ‘জীবনের শেষ মুহূর্তে পেয়ারা নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর চরণ সেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলাম আমার মত হতভাগ্য নারী আর কেউই নেই।’ তখন মায়ের দুঃখের কথা ভেবে ফাতেমা (রা.) মাকে জড়িয়ে কান্না ভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘আম্মাজান আপনার স্থানে আমি ফাতেমা সর্বদা আব্বাজানের খেদমত ও পরিচর্যা করব। আমার জীবন থাকতে আমি আব্বাজানের কোন অসুবিধা হতে দেব না।’ মেয়ের কথা শুনে খাদিজা (রা.) ভীষণ খুশি হলেন এবং মেয়েকে কাছে টেনে আদর করে বললেন মনে রেখো আমি মরে যাবার পর দুঃখ করোনা সর্বদা আমার মাগফেরাতের জন্য দোয়া করবে এবং সর্বদা তোমার আব্বাজানের সেবা যত্ন করে তাকে খুশি রাখবে আল্লাহর কাছে দোয়া করি তিনি যেন তোমাকে তোমার পিতার খেদমত করার তওফীক দেন। তাঁর খেদমতের বিনিময়ে আল্লাহ যেন তোমাকে সমস্ত মানব জাতির জননীর আসন দান করেন এবং তোমার সুনাম সুখ্যাতি পৃথিবীর বুকে চির অক্ষয় করে রাখেন। সেদিন হযরত ফাতেমার জন্য তার মায়ের দোয়া আল্লাহ কবুল করে নেন। ফাতেমা (রা.) এর মর্যাদা আজ বিশ্বের সকল নারীর ঊর্ধ্বে রোজ কেয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি মুসলমান নর-নারীর হূদয়ে ও ইতিহাসে চির ভাস্বর হয়ে থাকবে। ফাতেমা (রা.) বাবা হযরত মুহাম্মদ (স.)কে খুব ভালোবাসতেন। হযরত মুহাম্মদ (স.) মেয়েকে খুব ভালোবাসতেন। হযরত ফাতেমা (রা.) কখনও পিতার কোন প্রকার কষ্টের কথা শুনলে অস্থির হয়ে যেতেন এবং কি কারণে দু:খ বোধ করেন সে সম্পর্কে জেনে তা সমাধানের জন্য চেষ্টা করতেন এবং বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি ও মঙ্গলের জন্য সব সময় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন। হযরত মুহাম্মদ (স.) এর খোদাভীতি ও পরহেযগারীর যে আদর্শ মহিলা হিসাবে গড়ে তুলেছেন হযরত ফাতেমা (রা.) নিজ থেকেই পিতার কাছ থেকে সশস্ত্র তাওহীদের বাণী শুনতেন এবং নিজের মেধা ও তীক্ষ্ম বুদ্ধি দিয়ে তা কণ্ঠস্থ করে নিতেন। তিনি সব সময় ধর্মের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো পিতার কাছ থেকে জেনে নিতেন। তিনি কিশোর বয়স থেকেই অতি অল্প সময়ের মধ্যে দ্বীনের সকল তাযীম তারবিয়াত শিক্ষা অর্জন করেছেন। শিক্ষা, দীক্ষা, আদব, আখলাক, ধৈর্য্য, সবর, দানশীলতা, আতিথেয়তা, আমানতদারী, পিতা-মাতার আনুগত্য, আল্লাহভীরুতা তাকওয়া সুতীক্ষ্ম প্রজ্ঞা চাল-চলন, কর্মস্পৃহা, শোয়া-বসা, খাওয়া-দাওয়া, ধ্যান-তপস্যা তাওয়াক্কুল ইত্যাদি সবগুণের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হযরত ফাতেমা (রা.)র ছিল। তিনি শুধু পিতা-মাতার কাছেই আদরের দুলালী ছিলেন না। বিবাহের পর তার স্বামী হযরত আলী (রা.) তাকে ভীষণ ভালোবাসতেন। তার শরীরের গঠন আবৃত্তি সৌন্দর্য রূপগুণ, ভদ্রতা, নম্রতা, আচার ব্যবহার দেখে নবী কন্যা হযরত ফাতেমাকে হযরত আলী (রা.) বিবাহের প্রস্তাব দেন। নবীও তার প্রস্তাব মেনে নিয়ে তার কাছে আদরের কন্যাকে সমর্পণ করেন। স্বামী গৃহে সব সময় তাকে কষ্ট করতে হতো। হযরত আলী (রা.) ছিলেন হত দরিদ্র। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তাদের না খেয়ে থাকতে হতো। তারপরও তিনি নিজেকে সব সময় খুশি রেখে ধৈর্য্যের সাথে সংসারের সকল কাজ করতেন। (চলবে)