হাদীস শাস্ত্রে

ইমাম বুখারীর অবদান

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:৫৩
স্বপ্নের এ তা’বীর শুনে আমার অন্তরে এক প্রেরণার সৃষ্টি হল। আমি দৃঢ় সংকল্প করলাম যে, আমি একটা সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ ও নির্ভুল হাদীস গ্রন্থ সংকলন করবো। কিন্তু যে হাদীসে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ থাকবে তা আমার গ্রন্থে স্থান পাবে না। ইমাম বুখারী বলেন, অতঃপর আমি মক্কা মুয়ায্যামার মসজিদে হারাম শরীফে বসে এরূপ একটা হাদীসগ্রন্থ লিখতে আরম্ভ করি। এরমধ্যে প্রত্যেকটি হাদীস আমি এত সতর্কতার সাথে গ্রহণ করেছি যে, আল্লাহ প্রদত্ত শিক্ষা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রতিটি হাদীস সূক্ষ্মাতি সূক্ষ্মরূপে যাচাই বাছাই করে নেওয়ার পরেও অভ্যন্তরীণভাবে এর সন্দেহ মুক্তির উদ্দেশ্যে প্রত্যেকটি হাদীস লিখবার পূর্বে আমি গোসল করে দু’রাকাত নফল নামাজ পড়ে ইস্তেখারা করে যখনই আমার ঐ হাদীসটি সন্দেহমুক্ত ও বিশুদ্ধ বলে দৃঢ় ধারণা হতো তখনই কেবল আমি হাদীসটি আমার গ্রন্থে সংকলন করেছি। এছাড়া আমি আমার গ্রন্থের পরিচ্ছেদে (অনুচ্ছেদ) বিভক্তির সময়ে পবিত্র মদিনায় হুজুর (স.) এর রওজা মোবারকের পাশে বসে তা করেছি। প্রতিটি পরিচ্ছেদ লিখবার সময়েও একইভাবে দু’রাকাত নফল নামাজ পড়ে নিয়েছি। এভাবে আমি আমার মুখস্ত প্রায় ছয়লাখ হাদীস হতে বিশেষভাবে যাচাই বাচাই করে ষোল বছরের কঠোর সাধনায় আমার গ্রন্থের সংকলন শেষ করেছি। ঈমাম বুখারী (রহ.) এর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হচ্ছে- “জামে আস্ সহিহ আল-বুখারী শরীফ”। এককথায় দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ বিশুদ্ধ হাদীসগ্রন্থ- ‘বুখারী শরীফ’। এই গ্রন্থের জন্যে যাচাই-বাচাই করে ৭২৭৫টি ‘সহীহ হাদীস’ হতে তাকরার বা পুনরাবৃত্তি হাদীসগুলো বাদ দিয়ে মোট চার হাজার হাদীস নিয়ে ‘বুখারী শরীফ’ সংকলিত হয়েছে। ইসলামি শরিয়তে এই গ্রন্থটিই পবিত্র কুরআন মাজীদের পর মানব লিখিত যাবতীয় গ্রন্থের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধতম কিতাব রূপে স্বীকৃত। ঈমাম সাহেব বলেন- ‘আমার মনে একান্ত আশা ছিল আমি যেন এটা সাথে নিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে হাজির হতে পারি’। ইমাম বুখারী (রহ.) এর বয়স যখন আঠার বছর তখন তিনি তাঁর আরও একটা বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আত্তারীখুল কবীর” রচনার কাজ আরম্ভ করেন। তিনি বলেন যে, এই গ্রন্থখানা আমি মদিনায় হুজুরে পাক (স.) এর পবিত্র রওজার পাশে বসে রাতে চন্দ্রালোকে লিখতাম। তিনি ছয় বছর হেজাজে অবস্থানকালে এই গ্রন্থ ছাড়া আরো কয়টা কিতাব লিখেছেন। ইমাম বুখারী (রহ.) বাল্যাবস্থায়ই সত্তর হাজার হাদীস সম্পূর্ণ মুখস্ত করে ফেলেছিলেন। তার সম্পর্কে বর্ণিত আছে- তিনি একবার মাত্র কিতাব দেখে তা সবই মুখস্ত করে নিতেন। হাদীস সংগ্রহের জন্য তিনি বিভিন্ন দেশের যেসব শায়খ, ফকীহ ও মুহাদ্দিসের নিকট গিয়েছেন তাঁরা সকলেই তাঁর ধীশক্তি, উদ্দ্যম ও যোগ্যতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ইমাম বুখারী (রহ.) ছিলেন অত্যন্ত মহত্ চরিত্রের অধিকারী। তিনি পৈত্রিকসূত্রে প্রাপ্ত প্রচুর অর্থ সম্পদের অধিকারী হয়েও তাঁর সমস্ত সম্পদ শিক্ষার্থী ও দরিদ্রদের মধ্যে দান করে দিয়েছেন। তিনি নিজে সামান্য আহার করতেন। জীবনে বহু বিপদ আপদ ও কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েও তিনি অত্যন্ত ধৈর্য্যের সাথে সব কিছুর মোকাবেলা করে নিজ দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি ভদ্র, বিনয়ী ও পবিত্র স্বভাবের ছিলেন এবং আত্মসম্মানবোধে ছিলেন অত্যন্ত সজাগ। বিশ্বের বহু বিখ্যাত হাদীস বেত্তাগণ তাঁর নিকট হাদীস শিক্ষা করেন। তাদের মধ্যে ইমাম আবু ইউছুফ, ইমাম মুসলিম, ইমাম তিরমিযী প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অবশেষে এই মহান সাধক ২৫৬ হিজরী সালের ১লা শাওয়াল শনিবার ঈদুল ফিতরের দিনে ৬২ বছর বয়সে প্রিয় মা’বুদের ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁর সান্নিধ্যে গমন করেন (ইন্না লিল্লাহে...রাজেউন)।