শে র পু র

গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৫০
শেরপুর জেলা পাক হানাদার মুক্ত হয় ১৯৭১-এর ৭ ডিসেম্বর। দীর্ঘ ৯ মাসের হত্যা, নির্যাতনের হয় অবসান। রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ১৯৮ কি.মি. উত্তরে সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এবং জামালপুর ও ময়মনসিংহ জেলা বেষ্টিত শেরপুর কৌশলগত কারণেই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পাক বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। পাক বাহিনী এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিতে সেখানে ঘন ঘন অভিযান চালায়, হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধাসহ বহু নিরীহ মানুষকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয় তারা। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শেরপুরবাসীর সেই যুদ্ধজয়ের কাহিনী বর্ণনা করেছেন ইত্তেফাকের শেরপুর প্রতিনিধি— সুশীল মালাকার ৮ মার্চ শেরপুরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এ পরিষদের সদস্য ছিলেন আনিসুর রহমান এমএনএ, নিজামউদ্দিন আহম্মেদ এমপি, এডভোকেট আব্দুস সামাদ, কমরেড রবি নিয়োগী, খন্দকার মুজিবর রহমান, আব্দুর রশীদ ও মুহম্মদ মুহসীন আলী। প্রায় একই সময়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এ কমিটিতে ছিলেন আমজাদ হোসেন, লুত্ফর রহমান মোহন, মোজাম্মেল হক, আখতারুজ্জামান, গোলাম রহমান রতন, দুলাল দে বিপুব প্রমুখ। ২৬ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত শেরপুর সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। শুরুতেই সংগ্রাম পরিষদ শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যুহ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ছাত্র-জনতার সামরিক প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সংগ্রহে মনোনিবেশ করে। প্রথম পর্যায়ে ১২ জন ছাত্রের ১টি দলকে ভারতীয় সীমান্তবর্তী নকশী পাতার ক্যাম্পে অস্ত্র প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। এরা হচ্ছেন মমিনুল হক, আব্দুল ওয়াদুদ অদু, ফরিদুর রহমান ফরিদ, মোকছেদুর রহমান হিমু, কর্নেল আরিফ, মো. মাছুদ, এমদাদুল হক নিলু, হাবিবুর রহমান ফনু, আশরাফ আলী, তালাপতুফ হোসেন মঞ্জু, মো. আলম ও আব্দুস সোবহান। এরপর নকশী ইপিআর ক্যাম্প ইনচার্জ হাবিলদার আব্দুল হাকিমের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। আব্দুল হাকিম স্থানীয় আনসার মুজাহিদ ও ইপিআর সদস্যদের নিয়ে একটি প্রতিরোধ বাহিনীও গড়ে তোলেন। এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে এই দলটিকে পাক বাহিনীকে প্রতিরোধে মধুপুরে পাঠান তিনি। কিন্তু ভারি অস্ত্রে সজ্জিত পাক বাহিনীর সাথে পেরে উঠতে না পেরে তারা জামালপুরের দিকপাইতে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু সেখানেও টিকতে না পেরে তারা ব্রহ্মপুত্র নদ পেরিয়ে শেরপুরের চরাঞ্চলে অবস্থান নেয়। এ সময় টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও জামালপুর থেকে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী ভারত সীমান্ত অতিক্রম করার জন্য শেরপুরে আশ্রয় নেয়। কিন্তু এদেশের স্বাধীনতা বিরোধী চক্র সীমান্ত সড়কের বাজিতখিলা অঞ্চলে ব্যারিকেড দেয়। ঘটনাটি সুবেদার আব্দুল হাকিমের নজরে এলে তিনি বাধা সৃষ্টিকারীদের হটিয়ে শরণার্থীদের সীমান্ত অতিক্রম করার সুযোগ করে দেন। ২৬ এপ্রিল পাক বাহিনী এদেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় শেরপুর শহরে এসে বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে, হত্যা করে অনেককে। এরপর আশপাশের গ্রামগুলোতে হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে পাক বাহিনী ও তাদের দোসররা। ঝাউগড়া কিলিং: শহর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরবর্তী ঝাউগড়া গ্রামে জীবন বাঁচাতে গিয়েছিল শহরের কয়েকটি হিন্দু ব্যবসায়ী পরিবার। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। পাক হানাদারদের দালাল সৈয়দ আলী চেয়ারম্যান, মামুন ও ফজু মুন্সী ১০ এপ্রিল হানাদারদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় ঐ গ্রামে। হায়নার দল আশ্রয়দাতাসহ ৮ জনকে গুলি করে মারে। শহীদ হন চৌথমল কারুয়া, নিবারণ চন্দ্র সাহা (নিপু সাহা), মহেন্দ্র চন্দ্র দে, গোপেশ্বর সাহা, নেপাল বিশ্বাস, ভক্তরাম বিশ্বাস, নিহার বসাক ও চিত্ত বিশ্বাস। জগত্পুর গণহত্যা: ঝিনাইগাতী উপজেলার হিন্দু অধ্যুষিত জগত্পুর গ্রামে ১ মে ভোরে হামলা চালায় পাক বাহিনী ও তাদের দোসররা। তারা বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়, ব্রাশফায়ারে নির্মমভাবে হত্যা করে ৫৬ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে। নাকুগাঁও ডালু গণহত্যা: ২৫ মে নালিতাবাড়ির নাকুগাঁও সীমান্ত পেরিয়ে পাক বাহিনী অতর্কিতে হামলা চালিয়ে ভারতীয় সীমান্তে অবস্থানকারী অর্ধশতাধিক শরণার্থী, গ্রামবাসী এবং ৮ জন বিএসএফ সদস্যকে হত্যা করে। অপারেশন কাটাখালী ব্রিজ: ৬ জুলাই শেরপুর সদরের কাটাখালী ব্রিজ ও তিনআনী ফেরী সফলভাবে ধংস করে ফেরার পথে নালিতাবাড়ি উপজেলার কৃতী সন্তান নাজমুল আহসান, মোফাজ্জল হোসেন ও আলী হোসেন পাক বাহিনী ও তাদের দোসরদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন। সোহাগপুর গণহত্যা: নালিতাবাড়ি উপজেলার সোহাগপুর গ্রামে ২৫ জুলাই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায় পাক বাহিনী ও তাদের দোসরা। নারী ও শিশুসহ ১৮৭ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে তারা। এ হত্যাযজ্ঞে গ্রামের অনেক নারী বিধবা হন। সোহাগপুর গ্রামটি বর্তমানে বিধবা পল্লী নামেই বেশি পরিচিত। নকশী ট্র্যাজেডি: পাক বাহিনী অধিকৃত সীমান্ত সংলগ্ন নকশী ক্যাম্প দখলে নেয়ার উদ্দেশ্যে ৩ আগস্ট যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধে সিও ছিলেন মেজর আমিন। নির্দেশনা ছিল নকশী বিওপি’র কাছে পাহাড়ি ঝর্ণার কাছে মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নেবেন। কিন্তু বিজয় হাতের মুঠোয় এসে গেছে ভেবে নির্দেশ অমান্য করে মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুশিবিরের ৫শ’ গজের মধ্যে চলে যায়। এসময় পেছন থেকে কভারিং দেয়া নিজেদের মর্টার শেলে নিজেরাই মারা যান তারা। এই দু:খজনক ঘটনায় মারা যান মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রামবাসীসহ ২৫ জন। তন্মর যুদ্ধ: ৪ আগস্ট শেরপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধে আরেকটি রক্তস্নাত অধ্যায়। এদিন নালিতাবাড়ি উপজেলার তন্মর গ্রামে পাক বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন ৭ বীর মুক্তিযোদ্ধা। এরা হলেন নূর মোহাম্মদ, আনার আলী, কলিমউদ্দিন, জামাল, লালমিয়া মাঝি, জমিরুদ্দিন ও জবান আলী ফকির। নারায়ণখোলা যুদ্ধ: ৩১ আগস্ট নকলা উপজেলার নারায়ণখোলা যুদ্ধে ১৬ জন মুক্তিযোদ্ধাসহ অর্ধশতাধিক মানুষ শহীদ হন। যুদ্ধে পাক বাহিনী ও তাদের দোসরদের ৫০/৬০ জন সদস্য নিহত হয়। সূর্যদী গণহত্যা: ২৪ নভেম্বর সদর উপজেলার সূর্যদী গ্রামে পাক হানাদার বাহিনীর আক্রমণে আফছরউদ্দিন নামে এক মুক্তিযোদ্ধাসহ ৫৩ জন শহীদ হন। পুড়িয়ে দেয়া হয় শতাধিক ঘরবাড়ি। অবশেষে মুক্তি: জুলাই-আগস্ট থেকেই ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ি এবং বকশীগঞ্জ অঞ্চলে শুরু হয় হানাদারদের সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা যুদ্ধ। নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে পাক বাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি কামালপুর ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনী সাঁড়াশি আক্রমণ চালায়। ৪ ডিসেম্বর এ ঘাঁটির পতন ঘটে। পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাক বাহিনী দ্রুত শেরপুর থেকে পাততাড়ি গোটাতে শুরু করে। ৫ ডিসেম্বর পাক বাহিনী শেরপুর ত্যাগ করে ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ি দিয়ে জামালপুরে আশ্রয় নেয়। ৭ ডিসেম্বর বিজয়ী মুক্তিবাহিনী ক্যাপ্টেন আজিজ, জাফর ইকবাল ও রহুল আমিন তোতার নেতৃত্বে শেরপুর শহরে প্রবেশ করে। এদিন ভারতীয় মিত্র বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় সর্বাধিনায়ক জগজিত্ সিং অরোরা হেলিকপ্টারযোগে স্থানীয় শহীদ দারগ আলী পৌর মাঠে অবতরণ করেন। মুক্ত শেরপুরবাসী তাকে স্বাগত জানায়। মিত্র বাহিনীর উপস্থিতিতে সেদিন পৌর মাঠে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। জনতার জয়বাংলা স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে চারদিক।