এনজিও’র উপর নিয়ন্ত্রণ জোরদারে দুইটি আইন প্রণয়নের কাজ করছে সরকার। আইন দুইটি হলো বৈদেশিক অনুদান স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম রেগুলেশন আইন ২০১২ ও স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংস্থা (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) আইন। বৈদেশিক অনুদান স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম রেগুলেশন আইনটির উদ্যোক্তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতাধীন এনজিও ব্যুরো। এই আইনটি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে এনজিও প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হলেও তাতে এনজিও প্রতিনিধিদের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। সরকার বলছে, এনজিওগুলোর উদ্বেগের ব্যাপারে মনোযোগ দেয়া হবে। কিন্তু জাতীয় সংসদে এ সম্পর্কিত বিলটি আনা হবে তখন তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো বিবেচনায় থাকবে কিনা এ নিয়ে এনজিওগুলোর উত্কণ্ঠা রয়েই গেছে।
এনজিওগুলো মূলত পাঁচটি কারণে উদ্বিগ্ন। এগুলো হলো বিদেশি অনুদানপুষ্ট প্রকল্পের ক্ষেত্রে দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া। দ্বিতীয়ত, এক্ষেত্রে কোন সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয়া নেই। তৃতীয়ত, কোন সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রের কথা বলা নেই যে কারণে বিদেশি সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প প্রত্যাখ্যান করা হতে পারে। চতুর্থত, প্রতি পাঁচ বছরে একবার পুনঃনিবন্ধিত হওয়া এবং প্রত্যেকটি প্রকল্পের জন্য পৃথকভাবে অনুমোদন নেয়ার প্রক্রিয়া। এছাড়া পরিদর্শন, তত্ত্বাবধানের জন্য অপরিমেয় ক্ষমতা, ক্ষেত্র বিশেষে প্রকল্পের সম্পদ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়ার বিধান ইত্যাদি।
এই আইনটির প্রণয়ন প্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে রয়েছে সে বিষয়ে জানার জন্য গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আইনের খসড়াটি এখনো মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের হাতে আসেনি। মন্ত্রিপরিষদের নীতিগত অনুমোদন নেয়ার জন্য এটি এখানে আসবে। তারপর আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং হয়ে এটি বিল আকারে পাসের জন্য জাতীয় সংসদে চলে যাবে। তবে এমন হতে পারে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে আসার আগে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য আগেই আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ে পাঠানো হতে পারে।
একই বিষয়ে এনজিও ফেডারেশনের পরিচালক এম তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, এ আইনটি নিয়ে এনজিও প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। আমরা আমাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো সরকারকে জানিয়েছি। কিছু বিষয়ে দ্বিমত রয়ে গেছে। সরকার আশ্বাস দিয়েছে এসব বিষয় বিবেচনা করা হবে।
এদিকে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এনজিও নিয়ন্ত্রণ আইনের খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। খসড়ায় বিভিন্ন আইনে নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের যাবতীয় কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করার কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তদারকি কার্যক্রম চালুর প্রস্তাবনাও রয়েছে। তবে এনজিও প্রতিনিধিদের তরফে বলা হয়েছে, নতুন কোন আইন করার প্রয়োজন নেই। ১৯৬১ সালের আইনটিকেই হালনাগাদ করা যেতে পারে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে আরও জানা গেছে, প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থাসমূহ (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) আইন দিয়ে বর্তমানে কাজ চালানো হচ্ছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এতে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সে কারণেই আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়। পুরোনো আইন বাতিল করে স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংস্থা (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ)-এর খসড়া তৈরির কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। এই আইনটি প্রথম সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয় ২০০৯ সালে। মন্ত্রণালয় সূত্রে আরও জানা গেছে, বর্তমানে ১৯৬১ সালের স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থাসমূহ (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) আইন, দ্য কো-অপারেটিভ সোসাইটিজ অ্যাক্ট ২০০১, দ্য সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট ১৮৬০, দ্য ফরেন ডোনেশন (ভলেন্টারি অ্যাক্টিভিটিজ) অর্ডিন্যান্স ১৯৭৮, দ্য ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স ১৯৮২ এবং মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি আইন ২০০৬-এর আওতায় বিভিন্ন সংগঠন নিবন্ধন নিয়ে থাকে।
সমাজকল্যাণে নিবন্ধিত অনেক সংগঠনই অন্যান্য কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তাদের আবার মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। আবার কোন সংস্থা যদি বিদেশি অর্থ নিয়ে কাজ করতে চায় তাদের এনজিও ব্যুরো থেকে অনুমতি নিতে হয়। সব মিলিয়ে একটি এনজিওকে তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চালাতে অনেকগুলো সরকারি দফতরের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে হয়। যেটি অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করে। মাঝে সমাজসেবা অধিদফতর তাদের নিবন্ধিত সংস্থাগুলো ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। তারা তাদের এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোকে নির্দেশনা দিলে এক অচলাবস্থা তৈরি হয়। পরে তাদের এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে সরকারের ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা এমআরএ। এক্ষেত্রে এমআরএ’র বক্তব্য ছিল, এ ধরনের নির্দেশনা জারি করা ঠিক হয়নি। পরবর্তীতে অবশ্য সমাজসেবা অধিদফতর তাদের অবস্থান থেকে সরে আসে।
