পুলিশ সদর দফতরে একজন শীর্ষ স্থানীয় কর্মকর্তা দুপুরের পর আসন্ন পুলিশ সপ্তাহের প্রস্তুতি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন। বিভিন্ন ইউনিটের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত। কক্ষের দরজায় দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবলকে নির্দেশ দেয়া ছিল, কোনো দর্শনার্থী যেন প্রবেশ করতে না পারে; কিন্তু বলা নেই কওয়া নেই হঠাত্ই দরজা খুলে ঢুকে পড়লেন এক ব্যক্তি। সঙ্গে এক নারী। ওই ব্যক্তির হাতে একটি কাগজ। ঢুকেই সরাসরি ঐ পুলিশ কর্মকর্তার সামনে কাগজটি মেলে ধরলেন তিনি। আর বললেন, ‘কাজটি করে দিতেই হবে।’ ওই নারীও তার সুরে সুর মিলিয়ে বললেন, ‘এমপির সুপারিশ রয়েছে। অনেক দিন ধরে কাজটি হচ্ছে না।’ জানা গেল, সুপারিশটি ছিল একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে বদলি করার জন্য। এ দৃশ্য গত সোমবারের।
এ ধরনের নানা তদবির নিয়ে পুলিশ সদর দফতরে নানা জনের আনাগোনা নিত্য দিনের দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে। চিহ্নিত এ রকম তদবিরবাজ দেড় ডজন। অনেকটা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই তারা ঢুকে পড়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের কক্ষে। এদের সিংহভাগই নারী। তদবিরবাজদের ব্যাপারে পুলিশের কোনো কর্মকর্তা প্রকাশ্যে কথা বলতে নারাজ। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কোনো কোনো কর্মকর্তা বলেছেন, ‘আমরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। পানিতে থেকে কুমিরের সঙ্গে তো লড়াই করা যায় না’।
পুলিশ সদর দফতরের একজন কর্মকর্তা (ডিআইজি পদমর্যাদার) ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘তদবিরের জন্য সুষ্ঠুভাবে কাজ করার উপায় নেই। তাদের (তদবিরবাজ) কথাবার্তা শুনলে মনে হবে তাদেরই মামু, খালু আর চাচাতো ভাইরা পুলিশে চাকরি করে। তাদের পছন্দের স্থানে বদলি করতে হবে।’ তিনি বলেন, যে কর্মকর্তা তাদের কথা শুনতে নারাজ তাদের পরিণতি ‘রীতিমত ভয়ানক’।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, তদবিরবাজরা তাকে চারদলীয় জোট সরকারের সমর্থক বলে প্রচারণা শুরু করে। ইতিমধ্যে তাদের তদবির না শোনায় অনেক পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তাকে পুলিশ সদর দফতর থেকে অন্যত্র বদলিও হতে হয়েছে। তিনি বলেন, তদবিরের জোরে বদলি হওয়ার কারণে অনেক এলাকায় ওসিরা পুলিশ সুপারদের নির্দেশ মানতে চান না। অনেক ক্ষেত্রে সাব-ইন্সপেক্টরও।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, গত চার বছর ধরে তদবিরে এগিয়ে আছেন একজন মন্ত্রীর চাচাতো বোন পরিচয়দানকারী নারী। তিনি নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের ঢাকা অঞ্চলের একজন নেত্রী হিসেবে দাবি করেন। শুধু পুলিশের কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের বদলির জন্যই নয়, মামলা থেকে আসামি বাদ দেয়ার ব্যাপারেও তদবির নিয়ে নিয়মিত পুলিশ সদর দফতরে হাজির হন ওই নারী। এক শ্রেণীর পুলিশ কর্মকর্তাও তাকে সমীহ করেন।
সূত্র জানায়, শুধু বদলির তদবিরই নয়, জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনে পাঠানোর তদবিরও চলে। জাতিসংঘের সুদান শান্তিরক্ষা মিশনে পুলিশ সদস্যদের যে তালিকা রয়েছে, সেখান থেকে মেধাক্রমের ব্যত্যয় ঘটিয়ে তালিকার পেছনের দিকে থাকা পুলিশ সদস্যদের সম্প্রতি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মিশনে পাঠানো হয়েছে কেবল তদবিরের কারণে।
পুলিশ সদর দফতরের একটি সূত্র জানায়, পুলিশের পোশাক, জুতা, মোজা, জ্যাকেট তৈরি ও সরবরাহের কাজেও রয়েছে রাজনৈতিক চাপ। এমনকি পুলিশের বিভিন্ন ভবন নির্মাণ ও অবকাঠামো সংস্কারের কাজের দরপত্রও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে। পছন্দের রাজনৈতিক নেতার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই এসব সরবরাহ ও নির্মাণ কাজ করছে।
পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা সম্প্রতি রাজনৈতিক তদবির রাখেননি বলে তাকে বদলি করে দেয়া হয়। এ রকমই একজন এআইজি (সহকারী মহাপরিদর্শক) পদমর্যাদার কর্মকর্তা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, পুলিশ বাহিনীর কল্যাণমূলক অনেক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করার জন্য একজন এআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা নিরন্তর কাজ করেছেন। তিনি এক নেতার একটি অবৈধ দাবির পক্ষে কাজ করেননি বলে তাকে বিএনপি সমর্থিত পুলিশ বলে চিহ্নিত করে বদলি করা হয় জেলা শহরে। এ নিয়ে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারাও বিস্মিত হয়েছেন। ওই কর্মকর্তার বদলির পর পুলিশের কল্যাণমূলক অনেক কর্মকাণ্ডই থমকে আছে বলে সূত্র জানায়।
তদবির শুধু পুলিশ সদর দফতরেই সীমাবদ্ধ নেই। এর বিস্তৃতি মেট্রোপলিটন পুলিশ দফতরেও। এখানেও চলে কনস্টেবল, এসআই, সার্জেন্টসহ অন্যান্য পদে বদলির তদবির। পাশাপাশি রয়েছে মামলার তদবির।
পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, সরকারদলীয় লোকজনের তদবিরের পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসনে কয়েকজন তোষামদকারী পুলিশ কর্মকর্তার দাপটও সীমাহীন। এরা চারদলীয় জোট সরকারের সময়ও ছিলেন ভাল অবস্থানে। এদের তদবিরে নির্ধারিত হচ্ছে পুলিশ সুপার থেকে ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের পোস্টিং। এ কারণে পুলিশ বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ে চলছে চরম হতাশা।
