ভ্রমণ শিল্প বিষয়ক গবেষণা কোম্পানি ফোকাসরাইট মন্তব্য করেছে, চীন থেকে এখন আর আনাড়ি পর্যটক আসে না। মূল্যের স্বচ্ছতা, বৈচিত্র্য ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে পুরোপুরি খোজঁ-খবর নিয়ে তবেই তারা বিদেশে আসে। বেশিরভাগই ইংরেজিতে কাজ চালিয়ে নিতে পারে; বোবার মত থাকতে হয় না। হাতে ম্যাপ নিয়ে ঘুরে বেড়ায় নিজেরাই
এশিয়ার পর্যটন শিল্প একসময় নির্ভরশীল ছিল দূরের যাত্রীদের উপর, বিশেষত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার। আজ এ অঞ্চলেই ভ্রমণকারীদের সংখ্যা বেড়ে গেছে। নিজেদের দেশে তো বটেই, তারা ঘুরছে সারাবিশ্ব। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানই এর প্রধান কারণ। মেরিল লিঞ্চ গ্লোবাল ওয়েল্থ ম্যানেজমেন্ট ও ওয়ার্ল্ড ওয়েল্থ রিপোর্ট-এর তথ্যানুযায়ী, ২০১২ সালে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে হাই নেটওয়ার্ক ইনডিভিজুয়্যাল (ভ্রমণ ও খরচে পারঙ্গম ব্যক্তি)-এর সংখ্যাটা ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৩৭ মিলিয়নে পৌঁছেছে। ২০১১ সালেই উত্তর আমেরিকাকে অতিক্রম করে প্রথমবারের মত সর্ববৃহত্ এইচ এন ডব্লিউ আই অঞ্চল বনে যায় এ অঞ্চল। উত্তর আমেরিকার এইচ এন ডব্লিউ আই জনসংখ্যা ৩ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন।
জাতিসংঘের বিশ্বপর্যটন সংস্থা ‘২০৩০ অভিমুখি পর্যটন’ বিষয়ক গবেষণা শেষে জানিয়েছে, বিকাশমান পর্যটন শিল্পে আগামী বিশ বছর নেতৃত্ব দেবে এশিয়া। এশিয়ার পর্যটন এ শিল্পকে নতুনভাবে কাঠামো প্রদান করতে সাহায্য করবে। অঞ্চলের ভেতরে এবং বাইরে এশিয়ার পর্যটকদের ঠাঁই করে দেয়ার জন্য বিশেষভাবে চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। ইউএনডব্লিউটিও’র এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিচালক জু জিং এ প্রসঙ্গে বলছিলেন, ‘এশিয়া থেকে এশিয়া এবং বাকি বিশ্বে এ অঞ্চলের লোকদের ভ্রমণের কারণেই বিশ্বের পর্যটন শিল্পে বিশাল প্রভাব পড়ছে। তার মতে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার পর্যটন শিল্প বেশ ভালভাবেই দাঁড়িয়ে গেছে। এশিয়ার বহির্মুখি পর্যটকদের কারণে বিশ্বের পর্যটন সংশ্লিষ্ট লোকেরা নতুনভাবে চিন্তা-ভাবনা শুরু করতে বাধ্য হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে,বহির্মুখি চীনা পর্যটকদের সংখ্যা ২০২০ সাল নাগাদ ১০০ মিলিয়নে পৌঁছুবে আর চীনা বহির্মুখিদের বর্তমান স্তর আমেরিকার প্রায় কাছাকাছি, যা চ্যালেঞ্জে ফেলে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। জিং জানান, ‘মাইনর এশিয়ান সোর্স মার্কেটস বিয়ন্ড এশিয়া’ নামক এক গবেষণা শেষে ইউএন ডব্লিউটিএ জানিয়েছে, অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়া এবং আয় বাড়তে থাকার কারণেই ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের মত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় বহির্মুখি পর্যটকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এসব কারণেই শুধুমাত্র পশ্চিমা পর্যটকদের আবাসন ও চিত্তবিনোদন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার দিন শেষ হয়ে গেছে। উদীয়মান এশীয় পর্যটকদের ভ্রমণ আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৮০’র জাপানীজ, তাইওয়ানিজও হংকংগারদের মতই এশিয়ার নতুন দীর্ঘমেয়াদি ভ্রমণকারীরা ভ্রমণের নতুন ধরন সৃষ্টি করছে।
ইউএনডব্লিউটিএ তাদের অফিসিয়াল সাইটে এশীয়দের ভ্রমণের ধরন সম্পর্কে লিখেছে, ‘তারা বার ও পাব-এ খুব বেশি খরচ করতে চায় না। রৌদ্রস্নানের জন্য সমুদ্রসৈকতে শুয়ে থাকতে উত্সাহী থাকে না। ওয়াইনের অর্ডার দিয়ে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হলে তারা বিরক্ত হয়। তারা সময় ব্যয় করে কেনাকাটা ও বিভিন্ন জায়গা দেখার পেছনে। তাদের আচরণের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে হোটেলগুলোর। নইলে খদ্দের হারানোর সম্ভাবনা থাকে যথেষ্টই। আইটিবি ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল ট্রেন্ডস রিপোর্ট ২০১১/ ২০১২-তে লেখা রয়েছে, এশিয়ার অভিজাত পর্যটকরা মূলত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তালাশ করে; পছন্দ করে থিম পার্ক, হালকা রোমাঞ্চ ও ক্রীড়া পর্যটন। হোটেল, রিসোর্ট, এয়ারলাইন ও রেস্টুরেন্ট সংশ্লিষ্টদের আচরণ পাল্টানোর প্রয়োজন রয়েছে এশিয়ার নতুন পর্যটকদের আচরণের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে।
উল্লেখযোগ্য হোটেল ব্র্যান্ডগুলো আবস্থা বুঝে এরই মধ্যে কৌশল পাল্টে ফেলেছে, বুঝে গেছে চীনা পর্যটকদের গুরুত্ব। ফ্রন্ট ডেস্কে নিযুক্ত করছে এমন লোককে, যে কিনা ম্যান্ডারিন ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারে। ব্রেকফাস্টে পরিবেশন করা হচ্ছে চীনা খাবার, বিশেষত ইনস্ট্যান্ট নুডলস ও চীনা চা। কক্ষে দেখানো হচ্ছে চীনের টেলিভিশন প্রোগ্রাম।
নতুন চীনা পর্যটকদের আচরণ আগেই পর্যটকদের সঙ্গে মোটেই মিলে না। তারা দলগতভাবে ঘুরতে চায় না এবং ট্যুর গাইডের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। আজকের চীনা পর্যটকরা মূলত তরুণ, ধনবান ও উচ্চ প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন। অধিকাংশই বিদেশে আসে ব্যক্তিগতভাবে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য। এদের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল— এরা কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যাবহারে পারদর্শী; মোবাইল প্রযুক্তি ও সোশাল মিডিয়াকে কাজে লাগাতে জানে বেশ ভালভাবেই; ট্যুরের আগে সব খোঁজ-খবর নিয়ে নেয়; ফ্লাইট ও হোটেল বুকিং দেয় অনলাইনে।
ভ্রমণ শিল্প বিষয়ক গবেষণা কোম্পানি ফোকাসরাইট মন্তব্য করেছে, চীন থেকে এখন আর আনাড়ি পর্যটক আসে না। মূল্যের স্বচ্ছতা, বৈচিত্র্য ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে পুরোপুরি খোজঁ-খবর নিয়ে তবেই তারা বিদেশে আসে। বেশিরভাগই ইংরেজিতে কাজ চালিয়ে নিতে পারে; বোবার মত থাকতে হয় না। হাতে ম্যাপ নিয়ে ঘুরে বেড়ায় নিজেরাই।
— ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন অনুসরণে
