শীতে নাক কান ও গলা শরীরের এই তিনটি অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি হতে পারে। সাধারণ হাঁচি-সর্দি থেকে শুরু করে গলার স্বর বসে যাওয়া সবই রয়েছে এই তালিকায়। স্বল্পপরিসরে সেসব রোগের কয়েকটি সম্পর্কে ধারণা দেয়া হল।
১. নাকের এ্যালার্জি
এটি এ্যালার্জিজনিত নাকের প্রদাহ। ধূলোবালি, ঠাণ্ডা-গরমসহ বিভিন্ন ধরনের এ্যালার্জি উদ্রেককারী উপাদান এর কারণ। রোগটি স্থায়ীভাবে নিরাময়যোগ্য না হলেও নিয়ন্ত্রণযোগ্য। ওষুধের ব্যবহার ও ঠাণ্ডা-এ্যালার্জি উদ্রেককারী বস্তুসমূহ এড়িয়ে চলার মাধ্যমে এর চিকিত্সা করা যায়।
২. নাক দিয়ে রক্তপড়া
নাকদিযে রক্ত পড়ার অনেক কারণ আছে। ছোটদের ক্ষেত্রে সাধারণত নাক খোঁটার কারণে নাকে ক্ষত হয়ে রক্তপাত হয়। বড়দের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের কারণে নাক দিয়ে রক্ত ঝরে। শীতে নাকের ভিতরটা শুকিয়ে চামড়া উঠে যায় এবং তখন নাকের ঝিল্লি ছিঁড়ে গিয়ে নাক দিয়ে রক্ত পড়তে পারে।
৩. নাকের পলিপ
সাধারণত দীর্ঘদিন নাকে এ্যালার্জি থাকলে এমনটি হয়ে থাকে। নাকের মধ্যে মিউকাস ঝিল্লিগুলো ফুলে আঙ্গুরের দানার মতো বিভিন্ন আয়তনের হয়ে থাকে। নাকের পলিপে নাক বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সেই সঙ্গে সাইনাসের ইনফেকশন হয়ে মাথা ব্যথা হতে পারে। এই সমস্যার জন্য অপারেশন করার দরকার পড়ে। সনাতন পদ্ধতির অপারেশনে আবার পলিপ দেখা দেয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু আধুনিক এন্ডোস্কোপিক সার্জারির মাধ্যমে রোগটি নিরাময়ে প্রভূত সাফল্য এসেছে। প্রাথমিক অবস্থায় স্টেরয়েড সেপ্র ব্যবহার করে অবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। শীতে এই ধরণের সমস্যা একটু বেড়ে যায়।
৪. সাইনাসের ইনফেকশন
সাধারণত নাকে এ্যালার্জি ও পলিপ, নাকের হাড় বাঁকা ইত্যাদি কারণে নাকের দু’পাশের ম্যাক্সিলারি সাইনাসে ইনফেকশন দেখা দেয়। এক্ষেত্রে মাথা ব্যথাই মূল উপসর্গ। সাইনাসের একটি এক্সরে করলেই রোগ সম্পর্কে অনেক ধারণা পাওয়া যায়। প্রাথমিক অবস্থায় ওষুধ ব্যবহার, পরবর্তীতে সাইনাস ওয়াশ এবং শেষ পর্যায়ে এন্ডোস্কোপিক সাইনাস সার্জারি করে রোগটি সারানো যায়। শীতে বারবার নাকের মধ্যে প্রদাহ হয়, নাক বন্ধ থাকে বলে সাইনাসের ইনফেকশন সহজেই হতে পারে।
৫. মধ্যকর্ণে প্রদাহ
এই সমস্যা শিশুদের বেশি হয়ে থাকে। সাধারণত উর্ধ্ব শ্বাসনালীর প্রদাহ, টনসিলের ইনফেকশন, এডিনয়েড নামক গুচ্ছ লসিকা গ্রন্থির বৃদ্ধি ইত্যাদি থেকে এই ইনফেকশন হয়ে থাকে। শীতে এই উপসর্গগুলো ব্যাপকভাবে দেখা দেয়ার কারণে হঠাত্ করেই মধ্যকর্ণে ইনফেকশন হতে পারে। এই রোগে কানে বেশ ব্যথা হয়, কান বন্ধ মনে হয়। সঠিক সময়ে এই রোগের চিকিত্সা না করলে কানের পর্দা ফুটো হয়ে রোগটি কান পাকা রোগে রূপ নিতে পারে। এন্টিবায়োটিক ও নাকের ড্রপসহ অন্যান্য ওষুধ হচ্ছে এই রোগের চিকিত্সা।
৬. মধ্যকর্ণে পানির মত তরল জমা
এই রোগের কারণ ও উপসর্গ অনেকটা মধ্যকর্ণে প্রদাহের মতই । তবে উপসর্গসমূহের তীব্রতা অনেক কম থাকে। শীতের সময় শিশুদের ঘনঘন সর্দি লাগে। বারবার সর্দি লাগার কারণে কিংবা এডিনয়েড সমস্যার জন্য দীর্ঘদিন ধরে নাক দিয়ে শ্লেষা ঝরার পরিণতিতে এই রোগ হয়ে থাকে। শীতে এর প্রকোপ বেড়ে যায়। নাকের পিছনের অংশের সঙ্গে কানের যোগাযোগ রক্ষাকারী নালীটি নাকের প্রান্তবর্তী মুখটি যদি ঠাণ্ডা-সর্দি কিংবা এডিনয়েড এর বৃদ্ধির জন্য বন্ধ হয়ে যায় তখন মধ্য কর্ণে তরল পদার্থ জমা হয়। অনেক সময়ে নালীর মুখটি বন্ধ হয়ে ভিতরে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। তাতে কান বন্ধ মনে হয়। কানের মধ্যে ফরফর শব্দ করে। সাধারণ ওষুধেই এ রোগ সারে। অনেক সময় ছোট্ট অপারেশন করে মধ্যকর্ণে জমে থাকা পানি বের করে দিতে হয়। এডিনয়েড বড় থাকলে শিশুদের ক্ষেত্রে তা অপারেশন করিয়ে নিতে হয়।
৭. এডিনয়েড ও টনসিলের ইনফেকশন
শীতে গলা ব্যথা হয় অনেকেরই। এই গলা ব্যথার জন্য মূলত দায়ী হচ্ছে টনসিলের ইনফেকশন। এটি মূলত শিশুদের সমস্যা। বড়দেরও হয়। টনসিলের সমস্যায় গলা ব্যথা, খেতে গেলে ব্যথা, সামান্য জ্বর ইত্যাদি থাকে। প্রথমত ওষুধ দিয়ে চিকিত্সা করা হয়। বারবার হতে থাকলে সম্যক জটিলতা ও কষ্টের কথা বিবেচনা করে টনসিল অপারেশন করিয়ে নিতে হয়। সারা পৃথিবীতে শিশুদের যত অপারেশন হয় তারমধ্যে টনসিল অপারেশনের অবস্থান সবার শীর্ষে। নাকের ছিদ্রের পিছন দিকে যে অঞ্চলটি রয়েছে সেখানে এই এডিনয়েড নামক লসিকা গ্রন্থির অবস্থান। এটি অনেক সময় বড় হয়ে নাক আংশিক বন্ধ করে দেয় ফলে নাক দিয়ে অধিকাংশ সময়েই সর্দি ঝরে। কানের সাথে নাকের পিছনের অংশের যোগাযোগরক্ষাকারী টিউবটির মুখও আংশিকভাবে বন্ধ থাকে। ফলে কানও বন্ধ থাকে। কানের মধ্যে পানির মত তরল জমে কান ব্যথা করে। এডিনয়েড বড় হলে শিশু মুখ দিয়ে শ্বাস নেয়। ঘুমের মধ্যে শ্বাসবন্ধ হয়ে জেগে
ওঠে। রোগীর চেহারা ক্রমশ হাবাগোবা হয়ে পড়ে। অনেক অভিভাবকই এ সমস্যাটির ফলে সৃষ্ট ক্ষতি অনুধাবন করেন না। ফলে শিশুর অনেক ক্ষতি হয়। অপারেশনই হচ্ছে এর একমাত্র চিকিত্সা। শীতে নাক কান ও গলার এই সাতটি অসুখের ঝামেলা এড়াতে শীত থেকে রক্ষার যাবতীয় ব্যবসা্থ নিতে হবে। বিশেষ করে শীতবস্ত্র-গলাবন্ধনী, মাথা ঢেকে রাখা, হাত-পায়ে মোজা পরা, ঠাণ্ডা এড়িয়ে চলতে হবে । সেই সঙ্গে সকালে হাত-মুখ ধোয়ায় এবং গোসলে কুসুম গরম পানি ব্যবহার করতে হবে। আর এত প্রস্তুতির পরও যদি অসুস্থতায় পেয়ে বসে তখন পরামর্শ নিতে হবে আপনার চিকিত্সকের।
