ভোগবাদী লালসায় বন্দী এ সমাজ

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৩৬
জীবন সংহারী দুর্ঘটনা ঘটার পরপরই সংশ্লিষ্ট ‘অপরাধী’রা কথার ফুলঝুরির বাজি ফোটায় সর্বত্র। গঠন করা হয় তথাকথিত তদন্ত কমিটি। পোশাকশিল্পের সাম্প্রতিক তালাবদ্ধ কলাপসিবল গেটকেন্দ্রিক দুর্ঘটনার পরও একই অবস্থা দেখা গিয়েছে। তাজরিনের মালিক নিজেই মিডিয়ায় বলেছেন, তিনি গার্মেন্টস শ্রমিক থেকে এখন ৬ পোশাককলের মালিক হয়েছেন এবং সিঁড়িঘর বিগত দু-বছর ধরে গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করলেও কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। তাঁর কান্নাকাটিও মেকি ও মানুষের চোখে ধুলা দেয়ার মতোই দেখেছেন অনেকে। টিভি ক্যামেরার সামনেই অপরিকল্পিত নির্মাণ, পানির ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, ফায়ার লাইসেন্স, সিঁড়িঘর কাম গোডাউন, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের মেয়াদ, ফায়ার ড্রিলে অসহযোগিতা ইত্যাদি ব্যাপারে জানতে গেলে ফ্যাক্টরিতে সাংবাদিকদের ঢুকতে বাধা দেয়ার দৃশ্য সাধারণকে বিস্ময়াভিভূত করে। শুধু পোশাকশিল্পই নয়, সমাজের সর্বত্রই এ চিত্র দৃশ্যমান। সদরঘাটে বিলাসবহুল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হাজারও মানুষ ধারণ ক্ষমতার বিশালাকার লঞ্চগুলোর প্রতিটি কেবিনে আধুনিক কালার টিভি, কার্পেট, কলিং সার্ভিস ইত্যাদি থাকলেও জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জামের সংখ্যা নিতান্তই কম। প্রবেশ ও বের হওয়ার সিঁড়ি তাজরিন গার্মেন্টসের চেয়েও সংকীর্ণ। হাজারও মানুষের জন্যে কয়েকটি মাত্র বয়া, আগুন নেভানোর যন্ত্র রাখা হয়েছে শো হিসেবে ২-৪টি মাত্র। নেই কোনো লাইফবোট, লাইফ জ্যাকেট, রাডার ইত্যাদি (যা এখন বিদেশের একটি সাধারণ ফিশিং বোটেও দেখা যায়)। যে কারণে একটি লঞ্চ ডুবলে তখন খুব কম মানুষই বাঁচতে পারে। অথচ ধারণ ক্ষমতার সমান প্রত্যেকটি যাত্রীর জন্যে লাইফ সাপোর্ট থাকলে লঞ্চ ডুবলেও মানুষ না মরারই কথা, সবাই ভেসে থাকবে লাইফ সাপোর্ট নিয়ে। একই কথা সড়কে চলমান হাজারও বাসের ক্ষেত্রে। দু-একটি বাস ছাড়া কোনো বাসেই ‘জরুরি নির্গমন দরজা’ ও প্রাথমিক চিকিত্সার কোনো ব্যবস্থা থাকে না। জানালা ও সিটগুলো ভাঙাচোরা হওয়ার কারণে দুর্ঘটনায় জীবন হারায় অসংখ্য মানুষ। অনেক বাসেই অতিরিক্ত কোনো চাকা না থাকার কারণে রাস্তায় পাংচার হয়ে বাসগুলো দাঁড়ালে ড্রাইভার-কন্ডাকটর এক ফাঁকে সরে পড়ে, আগাম টিকেট কাটা যাত্রীরা এক-আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করে অন্য বাসের খোঁজে বের হন বাধ্য হয়ে আবার গাঁটের পয়সা খরচ করে। বাস্তবতা হচ্ছে লঞ্চে ওঠার ঘাটগুলো অনিরাপদ, বাসস্টেশনে ব্যবহারের মতো একটা টয়লেটও পাওয়া যায় না। সিন্ডিকেট সর্বত্র— ইউনিয়ন বা সমিতিগুলো কেবল চাঁদাবাজি আর নিজেদের স্বার্থে কথাবার্তা বলে আখের গোছানোর ধান্ধায়! গার্মেন্টসের চেয়েও এখন অনেক বেশি বহুতল আবাসিক-বাণিজ্যিক ভবন ঢাকার সেখানে-সেখানে। ১৫-২০ তলার ভবনেরও অভাব নেই। কিন্তু হাজার মানুষের আশ্রয় হাইরাইজ ভবনগুলোতে অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্প হলে কীভাবে বাসিন্দারা বের হবেন ছোট চিকন সিঁড়ি দিয়ে তা তাঁদেরকে জানাননি নির্মাতা কোম্পানি কিংবা ফায়ার সার্ভিসের লোকজন কেউই। অনেক ভবনেই অগ্নিনির্বাপণের কোনো জিনিসপত্রই নেই কিংবা ২/১টি যাও লোকদেখানো আছে, তা ভবন নির্মাণের সময় যেভাবে লাগানো হয়েছিল দীর্ঘ ১০-১৫ বছরেও সেভাবেই বিদ্যমান ব্যবহারের অনুপযোগী হিসেবে। ফায়ার সার্ভিস, পরিদর্শক, ভবনগুলো বিল্ডিং কোড মানে কিনা তা দেখার মনে হয় কেউ নেই। প্রত্যেকেই জনবলের স্বল্পতার কথা বলে দায় এড়ায় কিংবা একে অপরকে দোষারোপ নীতি গ্রহণ করে এদেশে। নির্মাণ ত্রুটি এখন সর্বত্র ধরা পড়ে সাধারণের চোখেও। ১০০ বছর আগে নির্মিত কলকাতার হাওড়া ও শিয়ালদহ স্টেশন এখনও চকচকে। আমাদের দেশেও বৃটিশ আমলে নির্মিত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এখনও কার্যকর। কিন্তু বাংলাদেশের দুর্নীতিবাজ কৃতীমানরা নির্মাণের কয়েকদিন পরই ব্রিজ ভেঙে পড়ে, রাস্তার ঢালাই উঠে যায়, ভবন টেকে না ৫০ বছরও। কিন্তু দেশের নামকরা প্রকৌশলীদের কেরামতিতে বিল পাস হতে সময় লাগে না মোটেও। চট্টগ্রামের ফ্লাইওভারের বিলও হয়তো নিয়ে গেছে কিংবা পেয়ে যাবে নির্মাণকারী কিন্তু মানুষের জীবনের কী হবে? সহজ হিসেব-নিকেশের ব্যাপার এ যুগে। সকল পোশাকশিল্প-শ্রমিক, লঞ্চ-বাস যাত্রীর, নির্মাণ ও অন্যবিধ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে জীবনের বীমা উচ্চহারে করা থাকলে অনেকাংশে সমাধান পাওয়া যেতে পারে এ অমানবিক সমস্যার। প্রতিটি মৃত্যুর জন্যে কমপক্ষে ১০ লাখ টাকার বীমা করা থাকলে, মৃত্যুর পর যদি পরিবারটি অন্তত ১০ লাখ টাকার বীমা সুবিধে পায়, তবে বাঁচতে পারবে অসহায় স্বজনরা কিংবা অন্তত কিছুটা সান্ত্বনা পাবে পরিবারটি। এজন্যে পোশাককল মালিক, নির্মাণকারী কট্রাকটর, লঞ্চ ও বাস মালিককে পরিশোধ করতে হবে নির্দিষ্ট হারে প্রিমিয়াম। যা মূলত তাঁদের সমস্যা। একজন তাজরিন মালিক পোশাক শ্রমিক থেকে ৬টি পোশাককলের মালিক কিংবা ১টি সাধারণ বাস-মালিক ৩ বছরে ২০টি আধুনিক গাড়ির মালিক হলে কিংবা একটি দ্বিতল লঞ্চের মালিক ৫ বছরে ১০টি লঞ্চের মালিক হলেও ঐ জাতীয় ‘ফালতু প্রিমিয়াম’ পরিশোধে তাঁরা কখনো রাজি হন না। এ ক্ষেত্রে তাদের সমিতিগুলো সকল দায় চাপান সরকারের ওপর। যেন তাদের কাজ শুরু যাত্রীদের জীবন নিয়ে ব্যবসা করা, চাঁদাবাজি ও নিজেদের পরিবারের জন্যে লেক্সাস-প্যারাডো কেনা। শুনেছি কেবল বছরে ২টি ঈদের সময়ে একটি লঞ্চ যে লাভ করে, তা দিয়ে তারা আরেকটি লঞ্চ বানাতে পারে। ডিজেলের দাম বেশি হওয়া সত্ত্বেও ভুটান ও ভারতে লঞ্চ-বাস-ট্রেন ভাড়া বাংলাদেশের চেয়ে অর্ধেকেরও কম। এদেশের যাত্রীরা পাশের দেশের দ্বিগুণের বেশি ভাড়া দিয়েও বীমা সুবিধা পাবে না কেন? সরকার যদি বাধ্যতামূলক আইন জারি করেন পোশাকশ্রমিক, লঞ্চ, বাসযাত্রী ও নির্মাণ দুর্ঘটনায় নিহতদের জন্যে ন্যূনতম ১০ লাখ টাকা বীমা সুবিধার, তাহলে এ সমস্যা কমতে পারে এবং সমাধান হতে পারে একটি অমানবিক অন্ধকার যুগের! ঢাকা