নানা প্রতিকূলতার কারণে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা স্বর্ণশিল্পী বা স্বর্ণকাররা। বংশ পরম্পরায় ধরে রাখা জাতপেশা ছেড়ে টিকে থাকার সংগ্রামে অন্য পেশা বেছে নিতে হচ্ছে তাদের। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি, মেশিনে তৈরি অলঙ্কারের সাথে প্রতিযোগিতা, বিনাশুল্কে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ আমদানির সুযোগ, হাতে তৈরি অলঙ্কারের চাহিদা থাকা সত্যেও রপ্তানিতে জটিলতা, নির্দিষ্ট স্বর্ণশিল্প নীতিমালার অভাব, ন্যায্য মজুরির অভাব, জীবনের নিরাপত্তাহীনতাই স্বর্ণশিল্পীদের অন্য পেশা বেছে নিতে বাধ্য করছে। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে নিপুণ হাতে স্বর্ণালঙ্কার তৈরির কারিগররা। স্বর্ণশিল্পী শ্রমিক সংঘের নেতারা বলছেন, সরকারের সদিচ্ছাই পারে এই শিল্পীদের সংকটজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে।
দেশে স্বর্ণশিল্পীদের কর্মক্ষেত্রের প্রধান জায়গা পুরনো ঢাকার তাঁতীবাজারে এক সময় প্রায় প্রতিটি ভবনে ছিল স্বর্ণালঙ্কার তৈরির কারখানা। স্বর্ণকারদের অলস বসে থাকার ফুরসত্ ছিল না। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলতো অলঙ্কার তৈরির কর্মযজ্ঞ। ছোট্ট একটি ঘরে কারিগর ছিল ১০ থেকে ১২ জন। স্থান সংকুলানের অভাবে শোয়া-বসা নিয়ে ঝগড়া বেধে যেত নিজেদের মধ্যে। এসিডে সোনা গলানোর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকত এলাকার পরিবেশ। সময়ের ব্যবধানে বদলে গেছে সেই দৃশ্য। কমে গেছে ব্যস্ততা। নেই কর্মকোলাহল পরিবেশ। নেই বিপুল সংখ্যায় স্বর্ণশিল্পী। সোনালী অতীতের কথা মনে করে আফসোস করলেন তাঁতীবাজার চলন্তিকা ওয়ার্কশপের কারিগর কৃষ্ণ চন্দ্র পাল। তিনি বলেন, ‘চারজন শিল্পীর সাথে কাজ করি। আগের মতো কাজও নাই, টাকাও নাই।’ তিনি জানান, কাজের অভাবে দিন দিন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কারখানা।
কেন নেই কাজ ঃ শিল্পীরা জানান, স্বর্ণের দাম এতটাই বেড়ে গেছে যে, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের পক্ষে স্বর্ণালঙ্কার কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর দুটি পরিবারে বিয়ে হলে কম করে হলেও পাঁচ থেকে ছয় ভরি স্বর্ণালঙ্কার কনেকে উপহার হিসেবে দেয়া হতো। বর্তমানে ২৪ ক্যারেট মানের এক ভরি স্বর্ণের দাম ৫৫ হাজার টাকা। যা অনেকের পক্ষেই কেনা সম্ভব নয়। জন্ম দিন, বিয়ে, ঈদ বা পূজার মতো উত্সবে তেমন করে কেউ স্বর্ণালঙ্কার উপহার দেয় না।
নিজেদের পেশাগত কাজ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে স্বর্ণশিল্পীরা বলছেন, ভারত, সিঙ্গাপুর, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে মেশিনে তৈরি অলঙ্কার বিনাশুল্কে আমদানির সুযোগ। মেশিনে অলঙ্কার তৈরির খরচ তুলনামূলকভাবে কম। তাই হাতে তৈরি স্বর্ণালঙ্কারের বাজার দখল করছে মেশিনে তৈরি অলঙ্কার।
মজুরিতে দিন চলে না ঃ স্বর্ণশিল্পীরা তাদের কাজের উপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট হারে কমিশন বা মজুরি পান। তাঁতীবাজারের কারিগররা জানান, এক ভরির অলঙ্কার বানালে সংশ্লিষ্ট স্বর্ণশিল্পী পান এক আনা দুই রতি সোনা। যদিও স্বর্ণশিল্পী শ্রমিক সংঘ ও জুয়েলারি মালিক সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একজন শিল্পীর প্রতি ভরিতে ১১ শতাংশ অর্থাত্ এক আনা পাঁচ রতি স্বর্ণ পাওয়ার কথা। সেই হিসেবে বর্তমানে কোনো কোনো স্বর্ণশিল্পী মাসে সাত থেকে আট আনা সোনা পাওয়ার মতো কাজও পান না। কাজের অনুপাতে সোনা পাওয়ার এই প্রথার বাইরে একজন শিল্পী মাসে পাঁচশ টাকা ভাতাও পেতেন। ২০০৬ সাল পর্যন্ত এই ব্যবস্থা টিকে ছিল। এখন তাও নেই বলে জানান সুমিত মণ্ডল।
১৮ বছর ধরে কাজ করছেন তাঁতীবাজার এলাকার আরেক স্বর্ণশিল্পী রঞ্জিত ঘোষ। কাজের অভাবে দিন দিন কমে গেছে তার সহশিল্পীদের সংখ্যা। নিজের তিনটি কারখানার মধ্যে আছে এখন কেবল একটি কোনোমতে টিকে আছে। দক্ষ কারিগর হয়েও পর্যাপ্ত কাজের অভাবে সাধু বড়াল নামে অপর ব্যক্তি বর্তমানে সাবেক পেশা ছেড়ে দিয়ে ছারপোকা মারার ওষুধ আর লাইটার বিক্রি করে জীবনযাপন করছেন।
তাদের মানবেতর জীবনঃ তাঁতীবাজারের স্বর্ণালঙ্কার তৈরির কারখানাগুলো শুধু কর্মক্ষেত্র হিসেবেই নয়, ব্যবহূত হয় কারিগরদের থাকার ঘর হিসেবেও। কাজের জন্য যে ছোট্ট টেবিলটি তারা ব্যবহার করেন, তা সরিয়ে কোনমতে শুয়ে থাকেন মেঝেতে। স্বর্ণের কারখানার ধুলোবালি বিক্রি হয় সের দরে, কারণ ধুলোতে মিশে থাকে স্বর্ণের গুঁড়ো। যা প্রক্রিয়াজাত করলে পাওয়া যায় স্বর্ণ। তাই কারখানা ঝাড়ু দিয়ে ময়লা বাইরে ফেলা হয় না। কারিগরদের পানি সংকটও প্রকট। তাঁতীবাজারের ২১ নম্বর পানিটোলার মার্কেটটি একটি পাঁচতলা ভবন। নিচতলায় হাউজে থাকা পানি দিয়েই চলে তাদের খাওয়া ছাড়া যাবতীয় কাজ। যে পরিমাণ পানি হাউজে থাকে তাতে মার্কেটের দুই শতাধিক কারিগরের যাবতীয় কাজ সারা সম্ভব হয় না। প্রতিদিনই লাইন দিয়েও স্নান করতে পারেন না অনেকে। আরও পরিতাপের বিষয়, ৩১ নম্বর রাখাল চন্দ্র বসাক লেন মার্কেটে নেই কোন টয়লেট ব্যবস্থা। তারা টয়লেটের জন্য ছোট বালতি নিয়ে আশেপাশের মার্কেটে ছোটাছুটি করেন। কেবল রাখাল চন্দ্র বসাক লেন নয়, এমন অনেক কারখানা আছে যাদের নিজস্ব টয়লেট ও পানির ব্যবস্থা নেই। স্বর্ণ পাকা করার জন্য নাইট্রিক এসিড এবং আগুনে পোড়ানো স্বর্ণকে পরিষ্কার করার জন্য সালফিউরিক এসিড ব্যবহার করা হয়। মাঝে মধ্যেই এসিড দুর্ঘটনায় অনেক কারিগর আহত হয়। কিন্তু সচেতনতা ও সামর্থ্যের অভাবে তাদের নেই কোন বীমার ব্যবস্থা।
তাদের সংগঠনঃ স্বর্ণশিল্পীদের কল্যাণের জন্য আছে স্বর্ণশিল্পী শ্রমিক সংঘ। প্রতি মাসে তাদের পাঁচ টাকা করে সমিতিতে চাঁদা দিতে হয়। কিন্তু এই সমিতি তাদের জীবন-মান উন্নয়নে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। ঢাকা স্বর্ণশিল্পী শ্রমিক সংঘের সাধারণ সম্পাদক দীনেশ চন্দ্র পাল জানান, ২০০২ সালের তাঁতীবাজারে স্বর্ণশিল্পী শ্রমিক সংঘে ২২ হাজার সদস্য ছিল। আরও দশ হাজারের মতো প্রশিক্ষণার্থী কারিগর ছিল যাদের সদস্যপদ ছিল না। বর্তমানে তাঁতীবাজারে স্বর্ণশিল্পীর সংখ্যা ১০ হাজারে নেমে এসেছে।
যা কিছু করণীয় বলে দাবি স্বর্ণশিল্পীদের ঃ
দীনেশ চন্দ্র পাল বলেন, ‘আমাদের হাতে তৈরি অলঙ্কারের বিদেশে ভাল চাহিদা আছে। আমরা দেশের বাইরে কয়েকটি প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে ভাল সাড়া পেয়েছি। তবে সরকারের এক্ষেত্রে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বিনাশুল্কে এই শিল্পের কাঁচামাল আমদানি, হাতে তৈরি অলঙ্কার রপ্তানির ব্যবস্থা গ্রহণ, স্বর্ণশিল্প ব্যবসার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন, দেশীয় প্রদর্শনীগুলোতে ভারতীয় অলঙ্কারের প্রদর্শনী বন্ধ এবং অবৈধ পথে স্বর্ণ আনা প্রতিরোধ করা গেলে এ দেশীয় স্বর্ণশিল্পীদের জন্য সহায়ক হবে। ঢাকা স্বর্ণশিল্পী শ্রমিক সংঘের সভাপতি ও বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট গঙ্গাচরণ মালাকার মনে করেন, শুধু নীতিমালা করেই এই শিল্পের উন্নতি ঘটানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে একজন ব্যক্তি বিদেশ থেকে আসার সময় দুইশ গ্রাম স্বর্ণালঙ্কার বিনা শুল্কে নিয়ে আসতে পারে। প্রচলিত এই নিয়মটি বাদ দেয়া দরকার। এজন্য সরকারের কাছে একাধিকবার লিখিতভাবে আবেদন জানানো হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্যাংক থেকে স্বর্ণ কেনার জন্য কোন টাকা দেয়া হয় না। অথচ অন্যান্য দেশে এই সুবিধা বিদ্যমান। ফারুক খান বাণিজ্যমন্ত্রী থাকাকালে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু তা সেই আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।
