আসন্ন বোরো মৌসুমে সেচভাবনা

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:৩০
দেশের প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি জমিতে ধান চাষ হয়। এর মধ্যে রয়েছে আউশ, আমন ও বোরো। তবে দেশের ৪১ ভাগ জমিতে বোরোর আবাদ হয়ে থাকে। উত্পাদনও সর্বাধিক। চলতি বছর বোরো ধানের চাষ হচ্ছে ৪৮ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে আর উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ কোটি ৯৩ লাখ মেট্রিক টন। আউশ ও আমন মৌসুম বৃষ্টিনির্ভর হলেও বোরো মৌসুমের উত্পাদন সম্পূর্ণ নির্ভর করে পানি সেচের উপর। ফসলের ক্ষেতে দুটি উত্স থেকে সেচের পানির যোগান দেয়া হয়। এক, ভূ-উপরিস্থ ও দুই, ভূ-গর্ভস্থ। এই দুই উেসর পানি সরবরাহের ক্ষমতা বর্তমানে বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। ১৯৮২ সাল থেকেই দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় সেচের পানির সংকট দেখা দেয়। এ সময় বহুসংখ্যক অগভীর নলকূপ অকেজো হয়ে যায়। এর কারণ হল দিন দিন ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এরপর গভীর নলকূপেও এ সমস্যা দেখা দেয়। বর্তমানে বিশেষজ্ঞরা একমত যে, ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার সীমিত না করলে পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। তাই কৃষি মন্ত্রণালয় খসড়া জাতীয় কৃষিনীতিতে ভূ-উপরিস্থ সেচের এলাকা বৃদ্ধির কৌশলের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। একই সঙ্গে বৃষ্টিনির্ভর আউশ ও আমনের চাষ বৃদ্ধি করার কৌশল চিহ্নিত করেছে। অর্থাত্ যেসব এলাকা এই দুই ধরনের ধান চাষের উপযোগী অথচ যেখানে বোরো চাষ করা হয়, সেসব এলাকায় আউশ ও আমন ধান চাষ করার কৌশল অবলম্বনের নীতি গ্রহণ করেছে। দেশে যান্ত্রিক সেচব্যবস্থা সমপ্রসারণের ফলে বোরো চাষের দিকেই কৃষকরা অধিকতর আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। সামপ্রতিককালে বিএআরসি জোনভিত্তিক শস্য চাষের একটি গবেষণায় জানা যায়- আউশ ও আমন চাষ উপযোগী এলাকা বোরো চাষের আওতাধীন। কৃষকদের বোরো চাষে অধিক আগ্রহের আরো দুটি কারণ চিহ্নিত করা যায়। এক, উচ্চ ফলনশীল বীজ বোরো ধানের জন্য সর্বাধিক। আউশ ও আমন ধানে তুলনামূলক কম। দুই, শুকনো মৌসুমে বন্যা হয় না। এ জন্য বোরো চাষ অপেক্ষাকৃত ঝুঁকিহীন। ফসলের ক্ষেতে পানি সেচের কথা আসলেই আসে সেচযন্ত্রের কথা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে ১০ লাখের অধিক বিভিন্ন ধরনের সেচযন্ত্র কৃষকরা ব্যবহার করেন। এ ব্যবহার মূলত বোরো চাষের জন্য। তবে এসব যন্ত্র ডিজেল দিয়েও চালানো হয়। বিদ্যুত্চালিত সেচযন্ত্রের সংখ্যা সর্বমোট সেচযন্ত্রের প্রায় ২০ শতাংশ। অর্থাত্ বেশির ভাগ সেচযন্ত্রই ডিজেলচালিত। এদিকে চলতি বোরো মৌসুমে প্রায় ২৭ হাজার কৃষক নতুন বিদ্যুত্ সংযোগের জন্য আবেদন করলেও তারা কোনো সংযোগ পাবেন না। কেননা বিগত কয়েক বছরে বিদ্যুত্ সরবরাহের ঘাটতি মেটানো এখনো সম্ভব হয়নি। যে সেচযন্ত্রে বিদ্যুত্ সংযোগ আছে সেগুলোও যে আসন্ন মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ থাকবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই তা সবারই জানা। তাই আগামী বোরো মৌসুমে কৃষককে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের উপরই নির্ভর করতে হবে বেশি। তবে সে ক্ষেত্রে সরকার ডিজেলে ভর্তুকি দেবে কিনা তা এখনো জানা যায়নি। বিদ্যুতের চেয়ে ডিজেলে ধান উত্পাদন খরচ বেশি হয়। যার কারণে উত্পাদন খরচও বেড়ে যায়। কিন্তু পর পর দু’বছর ধানের বাজার মন্দা বলে কৃষক হতাশার মধ্যেও ধান চাষে এগিয়ে আসবে। উত্পাদন খরচ কমাতে বোরো মৌসুমের পুরোটাই সেচনির্ভর হলেও সেচসাশ্রয়ী পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। এমনিতেই দেশ সেচের ক্ষেত্রে ভূ-গর্ভস্থ পানির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং অপচয়ের অভিযোগে অভিযুক্ত। যখনই সেচের পানি অপচয়ের প্রশ্ন আসে, তার সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও চলে আসে তা হচ্ছে বেশি পানি অপচয়ের পেছনে কে দায়ী? কৃষক নাকি অন্য কেউ? ফসল আবাদের জন্য সেচ অপরিহার্য এই সত্য বুঝেই কৃষক জমিতে সেচ দিয়ে থাকে, লিটার হিসেবে কিংবা গ্যালন হিসেবে সেচের পানির হিসাব করা কৃষকের কাছে অসম্ভব একটি ব্যাপার। কতক্ষণ সেচ দিলে আবাদি ক্ষেত ভিজবে বা কয় আঙুল পরিমাণ পানির উচ্চতা হবে এটুকু পর্যন্ত কৃষক বোঝে। এক কেজি ধান উত্পাদনে সাড়ে তিন থেকে পাঁচ হাজার লিটার পানি ব্যয় হয় এর মধ্যে দেড় থেকে দু’হাজার লিটারই অপচয় হয় এগুলো বিশেষজ্ঞদের তথ্য। যার আলোকে কৃষককে আগামীদিনের জন্য প্রস্তুত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এগুলোর খুটিনাটি সম্পর্কে কৃষককে অনেক বেশি সচেতন করা প্রয়োজন রয়েছে, কারণ নির্দিষ্ট সময়ে পানি প্রাপ্তির প্রশ্নে দিনের পর দিন দেশ সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সেচ দক্ষতার প্রশ্নেও দেশ পিছিয়ে পড়েছে। বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী- ৯০ সালে দেশের সেচ দক্ষতা ছিল ৩০ শতাংশ। আর সে সময়ে নেয়া পরিকল্পনা বা লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আগামী ২০২৫ সালে দেশের সেচ দক্ষতা নিয়ে যেতে হবে ৬০ শতাংশে। তা না হলে সেচের প্রশ্নে নানামুখি সংকটের মধ্যে পতিত হবে কৃষক। দেখা যাচ্ছে গত ২১ বছরে দেশ সেচ দক্ষতার মাত্র ৫ ভাগ অর্জন করতে পেরেছে। বর্তমান সময়ে সেচ দক্ষতার হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৫ শতাংশে। আগামী ১৩ বছরে কীভাবে দেশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে পারবে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। এখানে দৃষ্টান্ত হিসেবে আসতে পারে মালয়েশিয়ার কথা। যারা ৯০ সালে সেচ দক্ষতার প্রশ্নে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক নিচে অবস্থান করলেও অল্প দিনেই তারা ৪৫ শতাংশ অতিক্রম করেছে। ভারতেরও বর্তমান সেচ দক্ষতা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি। আগামী বোরো মৌসুমকে সামনে রেখে সেচের কারিগরি বিষয়গুলোতে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। দেশের কৃষকদের সেচের পানির অপচয় রোধ করা এবং অল্প পরিমাণ পানি ব্যবহার করে ধানের বেশি ফলন নিশ্চিত করার প্রযুক্তিগুলো কার্যকরভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে এডব্লিউডি বা জমি ভিজিয়ে আবার শুকিয়ে সেচ দেয়ার পদ্ধতিটি যত দ্রুত সম্ভব দেশের অধিকাংশ এলাকার কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।