বিজয়ের একচল্লিশতম বার্ষিকী উদ্যাপনে বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকের অগ্রগতি তুলে ধরে বলা যায়- গত ৪১ বছরে দেশ অনেক এগিয়েছে; সেই সাথে কৃষিও। কিন্তু কৃষকের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি।
জনসংখ্যা ও খাদ্য উত্পাদনের সূচকের দিকে তাকালে দেখা যায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের লোকসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি এবং খাদ্য উত্পাদন ছিল ১ কোটি টন। ৪১ বছর পর জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি আর খাদ্য উত্পাদন তিনগুণের বেশি। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল স্বাধীনতার পরপরই যে পরিমাণ আবাদি জমি ছিল তা কমেছে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত। জনসংখ্যা দ্বিগুণ বৃদ্ধি আর আবাদি জমি কমে যাওয়ার পরও খাদ্য উত্পাদন বৃদ্ধির ক্যারিশমা কোথায়? এর মূলে রয়েছে- কৃষকের সচেতনতা বৃদ্ধি, উচ্চ ফলনশীল ধানের আধুনিক জাত উদ্ভাবন ও চাষ বৃদ্ধি, পতিত জমি আবাদের আওতায় আনা, কৃষি প্রযুক্তি হস্তান্তর, ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি ইত্যাদি। তবে সার্বিকভাবে বলতে গেলে কৃষিতে সম্ভাবনা থাকলেও কৃষক তার পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকের অর্থনৈতিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন আসেনি। স্বাধীনতার ৪১ বছর পরও কৃষক নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
কৃষকের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি খাদ্য বহির্ভূত জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি। বিশেষ করে চিকিত্সা খাতের কথা উল্লেখ করা যায়। একজন কৃষকের পরিবারে কারো যদি এ্যাপেন্ডিকস অপারেশন করাতে যায় তাহলে তার খরচ হবে জেলা শহরে ১০ হাজার টাকার নিচে নয়। একজন প্রসূতির জন্যও সামগ্রিক খরচ তাই যদি সার্জারি করাতে হয়। এছাড়া অন্য কোনো রোগের বড় ধরনের অপারেশন করতে হলে তো কথাই নেই। মাত্র একটি পরিবারে ১০ হাজার টাকার চিকিত্সা খরচ হলে তাকে ২০ থেকে ২৫ মণ ধান বিক্রি করতে হয়। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের ফিস পরিশোধ করতে একমণ ধান বিক্রি করতে হয়। একজন সন্তানকে শিক্ষালাভের, পরিবারের পোশাকের জন্য, ভোজ্য তেল বা অনান্য খাদ্য বহির্ভূত খাতে তার সবখানে ব্যয় করতে হচ্ছে আয়ের কয়েক গুণ। অথচ তার মূল আয়ের উত্স খাদ্যশস্যের বাজারমূল্য সবচেয়ে কম।
কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে খাদ্য আমদানির পরিমাণ কমিয়ে দেশকে স্বনির্ভরতার পথে আনতে যে সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি কৃষক তারা তাদের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। ধান-চাল সংগ্রহের কথাই ধরা যাক- গত দু’বছর পর পর বোরোর ও আমনের ভাল ফলন হওয়ার পর ধান-চালের সংগ্রহ মূল্য যা নির্ধারণ করা হল তা আশানুরূপ না হলেও কাছাকাছি। কিন্তু সমস্যা হল কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল সংগ্রহ না করা। মিল মালিকদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করা হল। এর ফলে কৃষক সরকারিভাবে নির্ধারিত বাজারমূল্য পেলেন না। তাকে উত্পাদন খরচের চেয়ে কমমূল্যে ধান বিক্রি করে দায়-দেনা মেটাতে হল। গত বছর এ পরিস্থিতির পর বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি ও মিডিয়া কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল কেনার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু এ বছরও তা হল না। অনেকের মন্তব্য- চালের দাম বাড়লে এ সাড়ে তিনকোটি মানুষের কষ্ট বা তাদের প্রতিক্রিয়ার আশংকায় মূল্য ততোটা বাড়ানো যাচ্ছে না। অপরদিকে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনতে মাঠ পর্যায়ে যে অবস্থা তার চেয়ে মিল মালিকদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহ সুবিধাজনক। তাহলে কি কৃষক তার ক্ষতির বোঝা বয়েই চলবেন? দেশে কৃষি বিশেষজ্ঞরা গত দু’মৌসুম সরকারকে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন যে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল সংগ্রহ করলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন। তাদের মধ্যে খাদ্য উত্পাদনে আগ্রহ বাড়বে। ফলে বছরে আরো ৩০ থেকে ৪০ লাখ টন খাদ্যশস্য উত্পাদন বৃদ্ধি পাবে। কৃষক ভাল দাম পেলে আরো একটি অন্তবর্তী ফসল উত্পাদনে আগ্রহী হবেন। কৃষকের অর্থনীতির ৭০ ভাগ মূলত ধান চাষের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষজ্ঞরা এটাও বলছেন যে, আমরা যদি মনে করি আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ নয়, তবে কেন আমরা সীমিত চাল রফতানি করার অনুমতি দিচ্ছি না। তবে আশার কথা এই যে সরকার সুগন্ধি চাল রফতানির অনুমতি দিয়েছে। এটার সুফল আমরা দেখতে পাচ্ছি। বাজারে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় উন্নতমানের সুগন্ধি চাল বিক্রি হত। রফতানির কারণে এর মূল্য ৮০ থেকে ১০০ টাকায় উঠেছে। ফলে সুগন্ধি ধান চাষে কৃষকের আগ্রহ দেখা দিয়েছে। অন্য ফসলের ক্ষেত্রেও একই হিসেব।
কৃষক এখন অনেক সচেতন ও তাদের মধ্যে এক ধরনের দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় জন্মেছে। মাত্র সাড়ে তিন মাসে ৫০ লাখ থেকে এক কোটি টন খাদ্য উত্পাদনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণে তারা সক্ষম। এলাকাভিত্তিক ও মৌসুমভিত্তিক বিবেচনায় এখন প্রায় সারা বছর দেশের কোথাও না কোথাও ধানসহ খাদ্যশস্যের আবাদ হয়। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও মাত্র ৬ মাসের মধ্যে সে ক্ষতি অনেকটা পুষিয়ে নেয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে দেশের কৃষক। তাই খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে ভয় করার কোনো কারণ বাংলাদেশের নেই। এ কথা সাহসের সাথে, দৃঢ়তার সাথে বলার সময় এসেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের একচল্লিশ বছর শেষে এর চেয়ে বড় সুসংবাদ আর কি হতে পারে?
