রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক) নির্বাচনে পরাজিত দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়েছে গতকাল শনিবার। এতে ডালিম (২৭) নামের এক যুবক নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে ১০ জনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে কাউন্সিলর প্রার্থী শামছুল আলমসহ ১৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
গতকাল সকালে ৩১নং ওয়ার্ডের দর্শনার মানজাই নাজিরদিগর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ সময় কাউন্সিলর প্রার্থী শামছুল আলমের এক পুত্র আলমগীরের হাতের আঙ্গুল কেটে নেয়া হয় এবং আরেক পুত্র সাদ্দামের বুকে ছুরিকাঘাত করা হয়। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, ৩১নং ওয়ার্ডের পরাজিত দুই কাউন্সিলর প্রার্থী বেলাল হোসেন ও শামছুল আলম পরাজয়ের কারণ হিসেবে একে অপরকে দায়ী করেন। এ নিয়ে গতকাল সকালে বেলাল হোসেনের সমর্থকরা শামছুল আলমের এক সমর্থকের বাড়িতে হামলা চালালে সংঘর্ষ বেধে যায়। পরে শামছুল আলমের বাড়িসহ বেশকয়েকটি বাড়ি ভাংচুর করা হয়। সংঘর্ষে ২০ জন আহত হয়। এদের মধ্যে গুরুতর অবস্থায় ডালিম, আলমগীর, সাদ্দাম, মোকলেছ, বেলাল হোসেন, মাজেদুল, রাবেয়া, রোসনা, শাহিনুর, সাজু, পালোয়ান ও সিফাতকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ডালিমের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পুলিশ পরাজিত প্রার্থী শামছুল আলম, মোকছেদ, হামিদুল, শাহিন, সেলিম, রাসেল, শাহাদত্, শাহাজাদা, রবিউল, সালাম, লাবলু, সোহেল, ইমরান, সাহিদসহ উভয় গ্রুপের ১৪ জনকে গ্রেফতার করেছে।
সহকারী পুলিশ সুপার জাকির হোসেন বলেন, নির্বাচনে পরাজিত হয়ে একে অপরকে দায়ী করা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। যে কোনো অপ্রীতিকর অবস্থা মোকাবেলায় ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
কারচুপির অভিযোগ: এদিকে গতকাল সকালে ২৭নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে নির্বাচিত আকরাম হোসেনের বিরুদ্ধে অপর প্রার্থীদের ৬৫ ভোট কারচুপির অভিযোগ এবং সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোয়ারা সুলতানাকে কারচুপির মাধ্যমে ৪ ভোটে পরাজিত করার অভিযোগে শত শত নারী-পুরুষ আজিজনগর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র ঘেরাও করে। সেখান থেকে তারা বেশ কয়েকটি সিল ও ভোটের ব্যালট পেপার উদ্ধার করে। এক পর্যায়ে তারা স্টেশন রোড অবরোধ করে। ১ ঘণ্টা অবরোধ চলার পর পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। একই অভিযোগে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেছেন ২১, ২৬ ও ২৭নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত কাউন্সিলর মনোয়ারা সুলতানা মলি। নির্বাচনে ‘সঠিক’ ফলাফল ঘোষণার দাবিতে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ৩১, ৩২ এবং ৩৩নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী ঝর্না বেগম এবং ১০, ১১ এবং ১২নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী শ্রী মতি রীভা রানি।
জামানত হারালেন ৭ মেয়র প্রার্থী: রসিক নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জামানত খুইয়েছেন ৭ প্রার্থী। কেউ বিজয়ী প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের অন্তত ৮ ভাগের ১ ভাগ না পেলে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। নিবাচনে ১ লাখ ৬ হাজার ২৫৫ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাফিউর রহমান সফি ৪ হাজার ৯৫৪ ভোট পাওয়ার ফলে জামানত হারিয়েছেন। এছাড়া নাগরিক মঞ্চের জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী মাজিরুল ইসলাম লিটন ৩ হাজার ৮৬৪ ভোট, নাগরিক ঐক্যের ব্যানারে ইঞ্জিনিয়ার ফারুখ আজীজ শাহীন ২ হাজার ৩১৬ ভোট, নাগরিক কমিটির প্রার্থী রংপুর সদর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট ফিরোজ কবীর চৌধুরী গুঞ্জন ১ হাজার ৮৬৮ ভোট, বাসদ জেলা সমন্বয়কারী কমরেড আব্দুল কুদ্দুস ৯৭৯ ভোট, স্বতন্ত্র প্রার্থী মেহেদী হাসান বনি ৯৫৯ ভোট ও আলী হায়দার সরকার দুলু ৫০৬ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন।
কাউন্সিলর হলেন যারা: রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩৩টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ৩২৭ প্রার্থী। এর মধ্যে নির্বাচিত সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থীরা হলেন: ১নং ওয়ার্ডে রফিকুল ইসলাম, ২নং ওয়ার্ডে আব্দুল কাদের, ৩নং ওয়ার্ডে আশেক আলী, ৪নং ওয়ার্ডে হারাধন হারা, ৫নং ওয়ার্ডে মোখলেছুর রহমান তরু, ৬নং ওয়ার্ডে ফজলুল হক, ৭নং ওয়ার্ডে আনোয়ারুল ইসলাম, ৮নং ওয়ার্ডে আব্দুল মঞ্জুর কুটিয়াল, ৯নং ওয়ার্ডে নজরুল ইসলাম নজু, ১০নং ওয়ার্ডে আনোয়ারুল ইসলাম, ১১নং ওয়ার্ডে আব্দুর রাজ্জাক, ১২নং ওয়ার্ডে সুলতান আহমেদ প্রামাণিক, ১৩নং ওয়ার্ডে ফজলে ইলাহী, ১৪নং ওয়ার্ডে রাজু আহমেদ, ১৫নং ওয়ার্ডে শাফিউল ইসলাম লিটন, ১৬নং ওয়ার্ডে গোলাম কবীর কাজল, ১৭নং ওয়ার্ডে জহুরুল ইসলাম আজাব্বর, ১৮নং ওয়ার্ডে নিজামুল হাসান বাদল, ১৯নং ওয়ার্ডে শফিকুল ইসলাম দুলাল, ২০নং ওয়ার্ডে তৌহিদুল ইসলাম, ২১নং ওয়ার্ডে মাহবুবার রহমান মঞ্জু, ২২নং ওয়ার্ডে শাহজালাল করিম বকুল, ২৩নং ওয়ার্ডে সেকেন্দার আলী, ২৪নং ওয়ার্ডে আব্দুল হাফিজ ছট্টু, ২৫নং ওয়ার্ডে নূরুন্নবী ফুলু, ২৬নং ওয়ার্ডে আব্দুর রাজ্জাক মণ্ডল, ২৭নং ওয়ার্ডে আকরাম হোসেন, ২৮নং ওয়ার্ডে ইদ্রিস আলী, ২৯নং ওয়ার্ডে মোক্তার হোসেন, ৩০নং ওয়ার্ডে জাহাঙ্গীর আলম তোতা, ৩১নং ওয়ার্ডে মো. আক্তারুজ্জামান, ৩২নং ওয়ার্ডে আবুল কাশেম ও ৩৩নং ওয়ার্ডে সুলতান আহমেদ।
এছাড়া সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে বিজয়ী প্রার্থীরা হলেন: ১, ২, ৩নং ওয়ার্ডে দিলারা বেগম, ৪, ৫, ৬নং ওয়ার্ডে হাফিজা খাতুন পান্না, ৭, ৮, ৯নং ওয়ার্ডে রুবি বেগম, ১০, ১১, ১২নং ওয়ার্ডে শামীমা আক্তার, ১৩, ১৪, ১৫নং ওয়ার্ডে রুনা লায়লা ফরিদা বানু, ১৬, ১৭, ১৯নং ওয়ার্ডে আঞ্জু মনোয়ারা বেগম, ১৮, ২০, ২২নং ওয়ার্ডে জাফরিন ইসলাম রিপা, ২৩, ২৪, ২৫নং ওয়ার্ডে হাসনা বানু, ২১, ২৬, ২৭নং ওয়ার্ডে মঞ্জুরি বেগম, ২৮, ২৯, ৩০নং ওয়ার্ডে ফরিদা কালাম বেগম এবং ৩১, ৩২, ৩৩নং ওয়ার্ডে নাজমুন নাহার নাজমা।
কে কত ভোট পেলেন: রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু। তিনি মোটর সাইকেল প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১ লাখ ৬ হাজার ৫৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির বহিষ্কৃত নেতা মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা হাঁস প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৭৭ হাজার ৮০৫ ভোট। এছাড়া তার পরের দুই স্থানে আছেন আব্দুর রউফ মানিক (৩৭ হাজার ২০৮ ভোট) এবং আলহাজ্ব কাওছার জামান বাবলা (২১ হাজার ২৩৫ ভোট)।
