জনপ্রশাসনে ক্রমেই সংকটের নতুন নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে। পদোন্নতি ও নিয়োগ (পোস্টিং) বঞ্চিতদের ক্ষোভ-হতাশা বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আবারও তিন স্তরে পদোন্নতির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চলতি মাসে না হলেও আগামী নতুন বছরেই এ সরকারের সময়ে পঞ্চমবারের মতো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মকর্তার পদোন্নতির প্রস্তুতি নিচ্ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
২০০৯ সাল থেকে গত প্রায় চার বছরে এ সরকার চারদফা পদোন্নতি দিয়েছে। উপ-সচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব এই চার স্তরেই পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান পদের চেয়ে বেশি সংখ্যক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়ায় অনেককে ওএসডি কিংবা পদোন্নতির পূর্ব পদে বহাল রাখতে হয়েছে। আবার চাকরির ১০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর যেখানে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রথম পদোন্নতি পাওয়ার কথা সেখানে কমবেশি ২০ বছরের মাথায় পদোন্নতি হচ্ছে কর্মকর্তাদের। দীর্ঘদিন পদোন্নতি না দেয়ায় প্রশাসনে এক প্রকার পদোন্নতিজট লেগে আছে। বিশেষ করে ২০০১ সালের পর থেকে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে ‘রাজনৈতিক’ চিহ্নিত করে পদোন্নতির বাইরে রাখার প্রবণতা ব্যাপকভাবে দেখা দেয়। সরকার বদলের সুবাদে পরবর্তী সরকার এসে নতুনদের পদোন্নতি দেয়ার পরিবর্তে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের নিজেদের ঘরানার বিবেচনা করে পদোন্নতি দিতে শুরু করে। ফলে নতুনদের জন্য পদোন্নতির দরজা প্রায় সব সরকারের আমলেই সংকুচিত হয়। এভাবেই পদোন্নতিজট তৈরি হয়েছে। এখন সে জট খুলে নতুনদের পদোন্নতি দিতে গিয়ে লেগেছে পোস্টিং বা ওএসডি জট। পদোন্নতি দিলেও তারা পদোন্নতিপ্রাপ্ত পদে নিয়োগ পাচ্ছেন না। হয় ওএসডি, না হয় পদোন্নতির পূর্ব পদে কাজ করতে হচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০০২ সালে তৈরি পদোন্নতি নীতিমালার ২ ধারায় সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) কর্মকর্তার পদোন্নতি দিতে বা না দিতে পারবেন। মূলত এই সুযোগ নিয়ে যোগ্যতা থাকার পর শুধু ‘রাজনৈতিক’ বিবেচনায় সব সরকারই অসংখ্য কর্মকর্তার পদোন্নতি আটকে রাখে। এতে প্রশাসনে দলাদলির সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে বলে দীর্ঘদিন থেকে অভিযোগ করা হলেও কোনো সরকারই এ বিষয়ে কর্ণপাত করেনি। বরং এখনো বিএনপি-জামায়াতের করা নীতিমালায় প্রশাসনে পদোন্নতির প্রক্রিয়া চলছে।
দেখা যাচ্ছে, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পর্যায়ে এখনো প্রায় ৪৫০ কর্মকর্তা ওএসডি আছেন। এদের মধ্যে অবশ্য কেউ কেউ শৃংখলাজনিত কারণে ওএসডি রয়েছেন। তবে বেশিরভাগ কর্মকর্তা আছেন পদোন্নতি পাওয়ার পর নতুন পদের অভাবে পোস্টিং না পাওয়ার কারণে বা পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়ায় জ্যেষ্ঠতা ক্ষুণ্ন হওয়ার কারণে কনিষ্ঠদের নিচে পোস্টিং দিতে না পারার কারণে।
এখন আবার নতুন করে পদোন্নতি দেয়া হলে এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি আরও বাড়বে। সেটি যেমন একটি সমস্যা আবার পদোন্নতি প্রত্যাশীদের চাপও বাড়ছে। কারণ, ১০ বছরে যাদের উপ-সচিব হওয়ার কথা তারা এখনো ২০ বছর পর্যন্ত সিনিয়র সহকারী সচিব। এবার ১৭তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের উপ-সচিব করা হবে। ১৯৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তাদের যুগ্ম সচিব এবং ১৯৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সচিব করা হবে।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ পদোন্নতির সময় বিভিন্ন স্তরের ৬৯২ জনকে পদোন্নতি দেয়া হয়। এ সময় সহস্রাধিক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়নি। বলা হয়েছিল, যারা অন্যায্য কারণে পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন তারা আবেদন করলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে। এক্ষেত্রে প্রায় ৫০০ কর্মকর্তা তাদের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকার এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আব্দুস সোবহান সিকদার ইত্তেফাককে বলেন, বিশেষ বিবেচনার কোন সুযোগ নেই। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এসএসবি যখন হবে তখন সকল বিষয় বিবেচনায় নেয়া হবে। খুব শিগগির পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরু হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ চলছে।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে উপ-সচিব পদে পদোন্নতি পান ২৭৯ জন। নবম থেকে ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের উপ-সচিব পদের জন্য বিবেচনায় নেয়া হয়। এসব ব্যাচে উপ-সচিব হওয়ার যোগ্য ছিলেন ৫৫৪ জন কর্মকর্তা। উপ-সচিব থেকে যুগ্ম সচিব পদে ১৯৮২ সালের দুইটি ব্যাচ, ১৯৮৪ এবং ’৮৫ ব্যাচের মোট ৭৫১ জন কর্মকর্তা পদোন্নতির জন্য যোগ্য ছিলেন। ২৭৪ জন পদোন্নতি পান। ১৯৮২ থেকে শুরু করে ১৯৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তাদের যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হয়। ২৮৯ জন কর্মকর্তার মধ্যে পদোন্নতি পান ১২৯ জন। অর্থাত্ বাকিরা পদোন্নতি বঞ্চিত হন। বর্তমান সরকারের সময় এর আগে তিন দফায় ১৬৩ জন যুগ্ম সচিবকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। এর মধ্যে ২০০৯ সালের ২৭ জানুয়ারি ৭২ জন, ৭ সেপ্টেম্বর ৬০ জন এবং ১০ অক্টোবর ৩১ জন। অবশ্য দুই দফা পদোন্নতি বঞ্চিত ২৯ জন কর্মকর্তা শেষবার অতিরিক্ত সচিব হয়েছিলেন। যুগ্ম সচিব পদে তিন দফায় এক হাজার ২১৫ জন পদোন্নতি পান। এর মধ্যে ২০০৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ৮৬ জন, ৭ সেপ্টেম্বর ১৬৩ জন এবং ২১ নভেম্বর ১৬৬ জন। যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির সময় অন্তত ১৫০ জন কর্মকর্তা পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে জ্যেষ্ঠতা হারান। এখনো তারা উপ-সচিব। যদিও তাদের সহকর্মীরা এখন যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব। এ সরকারের সময় দুই দফায় উপ-সচিব পদে পদোন্নতি পান ৫৭৮ জন। ২০০৯ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ২৮০ জন এবং ২০১০ সালের ১৫ অক্টোবর ২৯৮ জন। প্রথম দফায় ৯ম ও ১০ম ব্যাচের এবং দ্বিতীয় দফায় ১১ এবং ১৩তম ব্যাচের ১৪ জনসহ ২৯৮ জনকে পদোন্নতি দেয়া হয়। বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে জ্যেষ্ঠতা হারানোয় প্রশাসনের শৃংখলা কার্যত নেই। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বলছেন, পদের অতিরিক্ত সংখ্যায় পদোন্নতি দেয়ায় এখনও নিয়োগ (পদায়ন) সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি। এখন আবার নতুন করে পদোন্নতি দেয়া হলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব নাও হতে পারে। এসব বিষয় যেমন বিবেচনায় নিতে হচ্ছে, তেমনি সত্যিকার বঞ্চিতদের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হচ্ছে।
