গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ : নে ত্র কো না

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৩৪
নেত্রকোনার আছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ফকির বিদ্রোহ, টংক আর তেভাগা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান কিংবা ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ - প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে নেত্রকোনার মুক্তিকামী মানুষ। সকল আন্দোলন, সংগ্রামেই রক্ত দিতে হয়েছে নেত্রকোনার বিদ্রোহী মানুষকে, কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধে সেখানে যে পরিমাণ জীবনহানি ঘটেছে, তার কোন তুলনা নেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর নেত্রকোনার সংগ্রামী মানুষ প্রিয় জন্মভূমিকে করেছে শত্রুমুক্ত। সেই সংগ্রামের কাহিনীই তুলে ধরেছেন ইত্তেফাকের নেত্রকোনা প্রতিনিধি শ্যামলেন্দু পাল। যুদ্ধের প্রস্তুতি: ১৯৭১ এর নির্বাচনে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ১৯৭১-এর ১ লা মার্চ সংসদ অধিবেশন স্থগিত করার সাথে সাথে নেত্রকোনায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। সেদিন নেত্রকোনার বড়বাজার বটতলায় চলছিল তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ শহর শাখার সম্মেলন। এই সম্মেলনে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন তত্কালীন ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা রেডিও মারফত শোনার সাথে সাথেই সম্মেলন মঞ্চ থেকে শ্লোগান ওঠে ‘সংহতিতে লাথি মার, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ ‘কৃষক শ্রমিক অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ তোমার দেশ আমার দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ, জয়-বাংলা। তারা বের করে মিছিল। সেই মিছিল পরে হাজার হাজার ছাত্র জনতার গণমিছিলে পরিণত হয়। এ সময় ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ কালেক্টরেট ভবনের ছাদ থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলে। স্বাধীনতার দাবিতে সংগ্রামী ছাত্র জনতা যখন শহরে প্রতিদিন জঙ্গি মিছিল, গণসমাবেশ, লাগাতার হরতাল করছিল, আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ তখন স্বাধীনতা আন্দোলনকে সশস্ত্র আন্দোলনে রূপান্তরিত করতে ছাত্র যুবকদের সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদানসহ অস্ত্র সংগ্রহের তাগিদ অনুভব করছিলেন। অস্ত্র সংগ্রহ করার জন্যে আন্দোলনকারী নেতৃবৃন্দ বেশ কয়েকটি গোপন বৈঠকে মিলিত হয় শহরের আশপাশের গোপন স্থানগুলোতে। ঐসব গোপন বৈঠকে উপস্থিত থাকতেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মজিদ তারা মিয়া এমপি, জামাল উদ্দিন আহম্মেদ, শহীদ মেহের আলী, মোঃ শামছুজ্জোহা, সাফায়েত আহম্মেদ খান, আশরাফ আলী খান খসরু, গোলাম এরশাদুর রহমান, হায়দার জাহান চৌধুরী, আব্দুল্লাহ আল মামুদ বুলবুল, খন্দকার আনিছুর রহমান, আলাউদ্দিন খান, আব্দুল ওয়াহেদ, মতিয়র রহমান, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, গোলজার হোসেন, মরহুম গাজী দেলোয়ার হোসেন, আমিরুল ইসলাম, আব্দুল মান্নান, শহীদ উদ্দিন আহম্মেদ, বাদল মজুমদার, আলাউদ্দিন খান, শ্যামলেন্দু পাল,আব্দুর রহিম, নির্মল কুমার দাস, উজ্জ্বল বিকাশ দত্তসহ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। প্রশিক্ষণ: বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর নেত্রকোনায় সকল শ্রেণী পেশার লোকজন পাক সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিদিন মিছিল সমাবেশ করতে থাকে। ২৩ মার্চ মোক্তারপাড়ার মাঠে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। ছাত্রলীগ আর ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা মুক্তিযুদ্ধের জন্য সক্রিয় হয়ে উঠে। আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কমিউনিষ্ট পার্টির নেতৃবৃন্দ নেত্রকোনায় আন্দোলনরত দলগুলোকে সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করতে থাকে। ২৫ মার্চ কাল রাত্রির পর থেকে নেত্রকোনায় শুরু হয়ে যায় গেরিলা প্রশিক্ষণ। ১৯৭১ এর ১২ এপ্রিল নেত্রকোনায় আনসারদের প্রশিক্ষণের জন্য রাখা ৩০০টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে নেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এই রাইফেল দিয়েই চলে মোক্তারপাড়া মাঠে চলে গেরিলা প্রশিক্ষণ। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠনের খবর জানার পরপরই নেত্রকোনায় পাক সরকার ও হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। ২৩ এপ্রিল সকালে পাক বাহিনী নেত্রকোনায় বিমান হামলা চালায়। মুক্তিবাহিনীও থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে পাল্টা গুলি চালায়। এরপর মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিতে চলে যায় সীমান্তের ওপারে। শুরু হলো যুদ্ধ: এদিকে নেত্রকোনা শহরে মুক্তিযোদ্ধা আর আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িঘর দখল করে নেয় রাজাকার আলবদররা। শহরের বাইরে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে গিয়ে স্কুল শিক্ষক বদিউজ্জামান মুক্তা রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন এবং তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে নেত্রকোনার বীর মুক্তিযোদ্ধারা ১৮টি কোম্পানিতে বিভক্ত হয়ে পাক সেনাদের উপর আক্রমণ চালাতে থাকেন। ৭ জুলাই বাঁশাটি গ্রামের হংস নদীতে রাজাকারদের একটি নৌকায় মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ চালিয়ে ৭ রাজাকারকে আটক করে । এসময় মুক্তিযোদ্ধারা পাক সেনাদের গতি রোধ করতে কংস নদীর উপর ঠাকুরাকোনা রেল সেতু, তেমোহিনী সেতু, হিরণপুর রেলওয়ে কালভার্ট বোমা বিস্ফোরণে ধ্বংস করে দেয়। ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী কলমাকান্দা থানার নাজিরপুরে ২৬ জুলাই পাক বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের এক ভয়াবহ সন্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা গোপনে জানতে পারেন যে, দুর্গাপুর থানার বিরিশিরি ক্যাম্প থেকে পাক বাহিনী দুর্গাপুর ও কলমাকান্দার মধ্যবর্তী নাজিরপুরে হামলার পরিকল্পনা করছে। এ খবর মাত্র একদিন আগে পৌঁছে ভারতের মেঘালয়ের রংরা ক্যাম্পে। বিএসএফ ক্যাম্পের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন চৌহান জরুরি তলব করলেন রংরা এফএফ ক্যাম্পের কমান্ডার তারাকে। ৪০ জন চৌকস মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে টাইগার কোম্পানির কমান্ডার তারা পরিকল্পনা অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধাদের তিনটি ভাগে ভাগ করে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। প্রথম গ্রুপের নেতৃত্ব দেন নাজমুল হক তারা স্বয়ং। অপরটির নেতৃত্ব দেন সেকশন কমান্ডার মোঃ রহমত উল্লা এবং অপরটির নেতৃত্ব দেন আব্দুল জব্বার। কোম্পানি কমান্ডার নাজমুল হক তারার নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের দলটি নাজিরপুর বাজার সংলগ্ন তহশিল অফিসের সামনে দুর্গাপুর-কলমাকান্দা রাস্তার ওত পেতে থাকে পাক সেনাদের আগমনের অপেক্ষায়। সারা রাত মুক্তিযোদ্ধারা সেখানে বসে থাকলেও পাক হানাদাররা আসায় তারা অ্যাম্বুস প্রত্যাহার করে চলে আসে। কিছু দূর যেতে না যেতেই সকাল নয়টার দিকে নদী পথে আসা পাক বাহিনীর অতর্কিত হামলার মুখে পড়ে মুক্তিযোদ্ধারা। দু’পক্ষের মধ্যে বেধে যায় প্রচন্ড যুদ্ধ। কমান্ডার তারা এই যুদ্ধে মারাত্মক আহত হন। একটি গুলি নাজমুল হকের গলার একদিক দিয়ে ঢুকে অপর দিক দিয়ে বের হয়ে যায়। এরপরও তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। দীর্ঘসময়ব্যাপী এই যুদ্ধে সাত বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এরা হলেন মুক্তাগাছা উপজেলার নুরুজ্জামান, ইয়ার মাহমুদ, দ্বিজেন্দ্র, ভবতোষ, নেত্রকোনার ডাঃ আজিজ, ফজলুল হক, নারানদিয়ার জামাল । আহত তারাকে চিকিত্সার জন্য দিল্লীর পুণা হাসপাতালে নেয়া হলে কমান্ডারের দায়িত্ব পান মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার। নেত্রকোনার মদন থানায় ২৮ আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৩ মাসব্যাপী যুদ্ধ চলে। ৮ নভেম্বর সকালে মদন থানাকে পাক হানাদার মুক্ত করা হয়। এই যুদ্ধে ১৫৫ জন পাক সেনা এবং ৬০ রাজাকার নিহত হয়। ১ লা ডিসেম্বর মোহনগঞ্জ থানার রড়তলীতে পাক সেনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে ৩৫ জন পাক সেনা নিহত হয়। ৩ ডিসেম্বর জারিয়া বিরিশিরি সড়কে পাকসেনার একটি ট্রাকে মুক্তিবাহিনী হামলা চালিয়ে ৬ পাক সেনাকে হত্যা করে। অবশেষে মুক্তি: ১লা ডিসেম্বর থেকে নেত্রকোনার বিভিন্ন থানাগুলো ধীরে ধীরে শত্রু মুক্ত হতে থাকে। ৮ ডিসেম্বর পাক সেনারা কোনঠাসা হয়ে নেত্রকোনা শহরের নাগড়া কৃষি ফার্মে এসে জড়ো হয়। ৯ ডিসেম্বর ভোর রাত থেকেই মুক্তিযোদ্ধা আবু সিদ্দিক আহমেদের নেতৃত্বে আব্দুর রহিম, আইয়ূব আলী, আবু আক্কাছ, সুরুজ আলী, হেকিম, মতিন, আব্দুর রশিদ, আবু খাঁ ও আব্দুস সাত্তারসহ বেশ কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা কৃষি ফার্ম এলাকায় পাক সেনাদের ওপর প্রচন্ড আক্রমণ চালায়। উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু খাঁ, আব্দুর রশিদ ও আব্দুস সাত্তার শহীদ হন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড আক্রমণে পাক হানাদাররা টিকতে না পেরে পালাতে শুরু করে। সকালেই পাক সেনারা ময়মনসিংহের দিকে পালিয়ে যায়। সাথে নিয়ে যায় বেশ কয়েকজন রাজাকার দোসরকে। শত্রুমুক্ত হয় নেত্রকোনা। জনতা জয়বাংলা স্লোগান দিতে দিতে ঘর থেকে বের হয়ে আসে।