দেশের প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগের আগামী কাউন্সিলে নতুন কমিটি গঠন নিয়ে দলের অভ্যন্তরে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। প্রায় সাড়ে তিন বছর পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে এ কাউন্সিল। দলের এ মহোত্সবকে ঘিরে নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিপুল উত্সাহ উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে সামনে জাতীয় নির্বাচন থাকায় এ কাউন্সিলের দিকে তাকিয়ে আছে দলের নেতা-কর্মীসহ দেশবাসী। নতুন কমিটির সাধারণ সম্পাদক নিয়ে যেমন উত্সাহ আছে, সাথে সাথে সংস্কারবাদীদের ভাগ্য নিয়েও জোর আলোচনা চলছে।
এদিকে, আওয়ামী লীগের আগামী কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় কমিটিতে বেশ কয়েকজন নতুন মুখও আসতে পারে বলে জানা গেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা এবং বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের কেন্দ্রীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্তি নিয়েও আলোচনা রয়েছে। আগামী ২৯ ডিসেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হবে ত্রি-বার্ষিক এ কাউন্সিল।
আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা জানিয়েছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের সংস্কারবাদীদের কারো কারো ভাগ্য ফিরতে পারে। যারা বিতর্কিত ওয়ান ইলিভেনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার একক ক্ষমতা খর্ব করতে চেয়েছিলেন তাদের কয়েকজনকে দলীয় হাইকমান্ড ক্ষমা করে দিতে পারেন। ২০০৯ সালে এসব সংস্কারবাদীদের অনেকে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ পড়েছিলেন। ওই কেন্দ্রীয় নেতা জানান, সংস্কারবাদীরা সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ দুই নেতাকে বাদ দিয়ে মাইনাস-টু ফর্মূলা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাকসহ কয়েকজন নেতা তাদের সংস্কার প্রস্তাব জাতির কাছে পেশ করেন। এসব নেতাকে প্রেসিডিয়াম সদস্য থেকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদে স্থান দেয়া হয়। এছাড়া দলের মধ্যম সারির নেতা শেখ হাসিনার তত্কালীন রাজনৈতিক সচিব সাবের হোসেন চৌধুরী, আব্দুল মান্নান, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ, মাহমুদুর রহমান মান্না, মুকুল বোস, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, খ.ম জাহাংগীর, নাজমা রহমান, অধ্যাপক আবু সাইয়িদসহ অনেকে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ পড়েন। অপরদিকে, দলের তখনকার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল কারাগারে থাকা অবস্থায় স্ত্রীর একটি বিবৃতির সূত্র ধরে তাকেও প্রেসিডিয়াম সদস্য থেকে বাদ দেয়া হয়।
দলের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং বর্তমানে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কাউন্সিল নিয়ে ইত্তেফাককে বলেছেন, কাউন্সিল নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। আমাকে যেখানে দায়িত্ব দেয়া হবে সেখানেই আমি দায়িত্ব পালন করবো, এখনো যেভাবে করছি। কেমন কমিটি আশা করেন? এমন প্রশ্নের জবাবে সুরঞ্জিত বলেন, আমার তো মনে হয় আগে যা ছিলো তাই হবে।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, সাবেক সংস্কারবাদীদের কাউকে কাউকে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরিয়ে আনার জন্য বর্তমান কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। হাইকমান্ড থেকেও এদের অনেকের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। হাইকমান্ড মনে করে, সংস্কারবাদীদের অনেকে তাদের আস্থাশীল হয়েছেন। সে হিসেবে আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আব্দুল জলিল, সুলতান মোহাম্মদ মুনসুরসহ আরো কয়েকজন নেতা দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদে ফিরে আসতে পারেন।
উল্লেখ্য, কয়েকমাস আগে দলের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ এবং আব্দুল জলিলকে দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় কমিটির সদস্যপদ দিয়ে মূল্যায়ন করেছিলেন। তবে একজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দলের দুই জন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যের প্রেসিডিয়ামে স্থান নাও হতে পারে।
এদিকে, কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান লাভের জন্য প্রবীণ ও নবীন নেতাদের গ্রুপিং-লবিং জোরদার হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে প্রেসিডিয়ামের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিলো বর্ষীয়ান নেতা আতাউর রহমান খান কায়সারকে। তার মৃত্যুর পর এ শূন্যপদে চট্টগ্রামের অপর প্রবীণ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুকে দেয়া হয়। তিনিও গত নভেম্বর মাসে ইন্তেকাল করেন। দলীয় সূত্র জানায়, আগামী কাউন্সিলে চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে প্রেসিডিয়াম সদস্য করা হতে পারে। ছাত্রলীগের কয়েকজন সাবেক নেতাকে এবারের কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন পদ দেয়ারও চিন্তাভাবনা চলছে।
দলে এখন সাংগঠনিক সম্পাদকের সংখ্যা সাত। বিভাগ ওয়ারী এ পদে সঠিক জেলা থেকে নেতা নির্বাচন না করায় কিছু কিছু এলাকায় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ঝিমিয়ে পড়ে। যেমন, খুলনা বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক নেয়া হয়েছে ঢাকা বিভাগ থেকে। চট্টগ্রামে যিনি দুই বছরেরও বেশি সময় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন তার বাড়ি নেত্রকোনা জেলায়। এবারের কাউন্সিলে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নতুন মুখ আসতে পারে বলে জানা গেছে। তবে দলের তৃণমূল নেতারা চাইছেন, সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদকের পদে ওই জায়গার নেতা নির্বাচন করা হোক।
