মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে করা মামলায় আসামি জামায়াতে ইসলামীর আমীর মতিউর রহমান নিজামী এবং নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচার পুনরায় শুরুর আবেদন করেছে তাদের পক্ষের আইনজীবীরা। গতকাল রবিবার বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আসামিপক্ষ এ আবেদন করে। আজ সোমবার এসব আবেদনের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। আসামিপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে গতকাল সাঈদীর আবেদনের শুনানিতে অংশ নিয়ে আইনগত দিক তুলে ধরে সংক্ষিপ্ত যুক্তি তুলে ধরেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি শুনানিতে বলেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেই বিচার কাজ পুনরায় শুরু করা প্রয়োজন।
ট্রাইব্যুনাল-১ এর সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের সঙ্গে বেলজিয়াম প্রবাসী বাংলাদেশি ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের স্কাইপে সংলাপের সূত্র ধরে এসব আবেদন করা হয়েছে। স্কাইপে সংলাপের কিছু অংশ যুক্ত করে গত ১৯ ডিসেম্বর গোলাম আযমের মামলা পুনরায় শুরুর জন্য ৬০০ পৃষ্ঠার আবেদন করে আসামিপক্ষ। গতকাল নিজামীর পক্ষে ২১৪ পৃষ্ঠা ও সাঈদীর পক্ষে প্রায় ৬শ’ পৃষ্ঠার আবেদন করা হয়। তিন আবেদনের শুনানি আজ এক সঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জেয়াদ আল মালুমকে প্রত্যাহারের জন্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর করা আবেদনের ওপর আজ শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
সাঈদীর পক্ষে শুনানিতে মওদুদ আহমদ বলেন, বিচারপতি নিজামুল হক পুরো বিচার কার্যক্রমকে কলুষিত করে রেখে গেছেন। তিনি পদত্যাগ করেছেন এবং তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৬ এর (৬) ধারায় বলা হয়েছে, শুধু ট্রাইব্যুনালের কোন সদস্যের পরিবর্তন হলে বা কোন সদস্য অনুপস্থিত থাকলে ইতিপূর্বে সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন এমন কোন সাক্ষীকে পুনরায় সাক্ষ্য দেয়ার জন্য তলব করতে বা পুনরায় শুনানি গ্রহণে ট্রাইব্যুনাল বাধ্য থাকবে না। আবার ২ এর (এ) ধারায় বলা আছে, ট্রাইব্যুনাল স্বাধীনভাবে বিচার কাজ পরিচালনা করবেন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন।
মওদুদ আহমদ বলেন, ‘সংবিধানে বলা আছে, প্রধান বিচারপতি স্বাধীনভাবে বিচার কাজ পরিচালনা করবেন। আপনারাও সংবিধান অনুযায়ী স্বাধীনভাবে বিচার কাজ করবেন। কিন্তু এই বিচারে চার্জ গঠনের আদেশ বাইরে থেকে এসেছে। দুনিয়ার ইতিহাসে এটা ঘটেনি। রায়ের কাঠামো কি হবে তাও বাইরে থেকে এসেছে। এরপর ট্রাইব্যুনালের স্বাধীনতা থাকল কোথায়?’ তিনি ট্রাইব্যুনালে বলেন, বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম যা রেখে গেছেন তার ওপর ভিত্তি করে আপনারা রায় দিতে পারেন। তবে তার গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু থাকবে এটাও ভাবতে হবে। আপনারা এমন একটা রায় দিন যাতে মানুষ বিশ্বাস করে ন্যায়বিচার হয়েছে। শুনানি শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বিচারপতি নিজামুল হক স্বাধীনভাবে বিচার কাজ পরিচালনা করেননি। তিনি সুবিচার পাবার পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। নৈতিকতার স্বার্থে, সংবিধানের স্বার্থে এ বিচার পুনরায় শুরু করতে হবে।
তিন আইনজীবীর ব্যাপারে আদেশ ১০ জানুয়ারি
ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার বিষয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম, তাজুল ইসলাম এবং ব্যারিস্টার তানভীর আহমেদ আল আমীনের ওপর জারি করা শোকজ নোটিসের শুনানি শেষ হয়েছে। আগামী ১০ জানুয়ারি এ ব্যাপারে আদেশ দেবেন ট্রাইব্যুনাল-১। তবে ট্রাইব্যুনালে আইনজীবী তাজুল ইসলামের প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞার আদেশ কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছে। তিনি এখন থেকে ট্রাইব্যুনালে প্রবেশ করতে পারলেও কোন ধরনের শুনানিতে অংশ নিতে পারবেন না। গতকাল আইনজীবীদের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি বলেন, আইনজীবীরা নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। ক্ষমা করা না করার বিষয়টি সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ার।
আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শুরু
জামায়াতে ইসলামের সাবেক রুকন আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গতকাল ট্রাইব্যুনাল-২ এ যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সাহিদুর রহমান যুক্তি উপস্থাপন করেন। তিনি একাত্তরে নিহত রঞ্জিত কুমার ও একেএম ইউসুফ ওরফে পাখি হত্যার সঙ্গে আযাদ ওরফে বাচ্চুর সম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরেন।
ট্রাইব্যুনালে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। অন্যান্য দিনের তুলনায় গতকাল ট্রাইব্যুনালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি ছিল বেশি। গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যদের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা গেছে। ট্রাইব্যুনালে প্রবেশ করতে গোয়েন্দাদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে প্রায় সবাইকে।
