রংপুর সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু সাবেক মেয়র ও জাতীয় পার্টির (এ) বহিষ্কৃৃত নেতা একেএম আব্দুর রউফ মানিককে চোর ও দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, তদন্ত কমিটি গঠন করে দুদকের মাধ্যমে মানিকের সকল দুর্নীতি ও অপকর্মের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে। গতকাল রবিবার সাংবাদিক ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কাউন্সিলরদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
ঝন্টু বলেছেন, আমি যখন পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলাম তখন পৌরসভাকে দুর্নীতিমুক্ত ও ৮ কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ করে আয়ের অনেকগুলো উত্স সৃষ্টি করেছিলাম। অথচ পৌরসভার সাবেক মেয়র মানিক পৌরসভাকে অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়া বানিয়েছিলেন। কর্মচারী নিয়োগের নামে প্রতিজনের কাছ থেকে ২ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত উেকাচ নিয়েছিলেন। এছাড়া রাস্তার মাঝখানে বৈদ্যুতিক পিলার স্থাপন, শ্যামাসুন্দরী খাল সংস্কার ও পুনঃখনন, ঠিকাদারী কাজসহ বিভিন্ন কাজে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এজন্য তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। মানিক তার দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে সিটি করপোরেশনের কাগজপত্র পুড়িয়ে দিয়েছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। নবনির্বাচিত মেয়র ঝন্টু পৌরসভার সাবেক মেয়র মানিকের উন্নয়ন কাজের নামে দুর্নীতির বিষয় উল্লেখ করে সকল ধরনের চলমান ঠিকাদারী কাজ বন্ধ করে তার কাছে রিপোর্ট দেয়ার জন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া তিনি সিটি করপোরেশনের সকল নথি-ফাইল তৈরি করে যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তাদের খতিয়ান তৈরি করারও নির্দেশ দেন। ঝন্টু বলেন, আমি ১ টাকাও দুর্নীতি করবো না এবং কাউকেও করতেও দিবো না। তিনি বলেন, আমি কোন দুর্নীতি করলে তা জনসম্মুখে প্রকাশ করবেন। রংপুরবাসীর প্রয়োজনে আমার জীবন উত্সর্গ করে আমি আমার দায়িত্ব পালন করে যাবো। বর্তমানে তিনি কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নয় দাবি করে বলেন, আমি রংপুরবাসীর সঙ্গে আছি। তারা চাইলে যে কোন সিদ্ধান্ত নিবেন। রংপুরের বেকার সমস্যার সমাধানকল্পে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ, পাইপ লাইনের মাধ্যমে রংপুরে গ্যাস সরবরাহ করে শিল্পায়ন এবং বেকার সমস্যা দূর, সিটি করপোরেশনবাসীর প্রয়োজনীয় দাবিগুলো অতি সত্ব্বর পূরণের উদ্যোগ গ্রহণের আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, অন্যথায় আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করা হবে। তিনি বলেন, রংপুরের মানুষকে ‘মফিজ’ বলা হয়। এই অপবাদ আমি মুছে ফেলে ‘রংপুরী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবো। তিনি সত্ ও দুর্নীতিমুক্ত সিটি করপোরেশন চালানোর জন্য কাউন্সিলর, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সহযোগিতা কামনা করেন। গতকাল সকালে নবনির্বাচিত মেয়র শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু সিটি করপোরেশন কার্যালয় গেলে তাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন। পরে সিটি করপোরেশন মিলনায়তনে মতবিনিময়কালে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন নবনির্বাচিত কাউন্সিলর সেকেন্দার আলী, আবুল কাশেম, সচিব আখতার হোসেন আজাদ প্রমুখ। এ সময় তিনি সিটি করপোরেশনের সকল শাখা প্রধানদের তাদের কাগজপত্র তৈরি করে রাখার নির্দেশ দেন। পরে তিনি সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন শাখা পরিদর্শন করেন।
এদিকে মানিক তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, আমি কোন দুর্নীতি করিনি। নিয়ম ও বিধি মোতাবেক সকল কাজ করেছি।
এদিকে শনিবার রাতে গুপ্তপাড়া এলাকায় গুপ্তপাড়া আইন-শৃঙ্খলা কমিটির উদ্যোগে নবনির্বাচিত মেয়র ঝন্টু ও এলাকার নবনির্বাচিত কাউন্সিলর হাফিজ আহমেদ ছট্টুকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় পার্টির (এ) প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রংপুর জেলা এবং মহানগর কমিটির সভাপতি মসিউর রহমান রাঙ্গা।
অপরদিকে, গতকাল বিকেলে নগরীর রাজা রামমোহন ক্লাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জাতীয় পার্টির (এ) বহিষ্কৃৃত নেতা ও পরাজিত মেয়র প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, জাতীয় পার্টির (এ) কতিপয় ষড়যন্ত্রকারী নেতা আমাকে পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনে পরাজিত করেছে। তবে নির্বাচনের ফলাফল আমি মেনে নিয়েছি। এ ব্যাপারে জেলা ও মহানগর জাতীয় পার্টির (এ) সভাপতি মসিউর রহমান রাঙ্গা, জেলা সম্পাদক আবু মাসুদ চৌধুরী নান্টু ও মহানগর সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন কাদেরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, আমরা কোন ষড়যন্ত্র করিনি। দলের ও চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে যারা নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এরশাদ ভক্ত জনগণ তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
সহিংসতার ঘটনায় মামলা : সিটি করপোরেশন নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় নিহতের ঘটনায় কাউন্সিলর প্রার্থীসহ দেড় শতাধিকের নামে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ৮ জন গ্রেফতার হয়েছে। আতঙ্কে এলাকা পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। সংঘর্ষে নিহত ডালিমের বড় ভাই সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা ফতেহ আলী খোকন বাদি হয়ে ৭৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও দেড়’শ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেছেন। এতে প্রধান আসামি করা হয়েছে পরাজিত কাউন্সিলর প্রার্থী শামছুল আলমকে। শনিবার ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতারকৃত ১৪ জনের মধ্যে আরও ৭ জনকে হত্যা মামলায় আসামি করা হয়। এরা হলেন সেলিম মিয়া, সোহেল মিয়া, ইমরান হোসেন, মোকলেস মিয়া, রাসেল মিয়া, হামিদুর রহমান ও আবু সাঈদ।
রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩১নং ওয়ার্ডে পরাজিত ২ কাউন্সিলর প্রার্থী বেলাল হোসেন ও শামছুল আলমের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। পরে শনিবার তা সংঘর্ষে রূপ নেয় এবং এতে ২০ জন আহত হয়। আহতদের মধ্যে ১৫ জনকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিত্সাধীন অবস্থায় কাউন্সিলর প্রার্থী বেলাল হোসেনের ভাই ডালিম মারা যান।
