নয়টি খুনের মামলার আসামি, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় ‘সিরিয়াল কিলার’ হিসাবে পরিচিতি পাওয়া সালাউদ্দিন অবশেষে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দিন কাটাচ্ছে। একাধিক সূত্রের ভাষ্যমতে, ‘ক্রসফায়ার’ আতঙ্কে আতঙ্কিত সালাউদ্দিন স্বেচ্ছায় পুলিশের হাতে ধরা দেয়। গত ২২ অক্টোবর যাত্রাবাড়ীর বিবিরবাগিচা এলাকায় আগে থেকেই ঠিক করে রাখা পুলিশের একটি টহল গাড়িতে উঠে পড়ে সে। সেখান থেকে তাকে যাত্রাবাড়ী থানায় নেয়ার পর খবর দেয়া হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে। ডিবি দক্ষিণের একটি টিম সালাউদ্দিনকে যাত্রাবাড়ী থানা থেকে মিন্টো রোডে ডিবির কার্যালয়ে নেয়। পরে ডিবি পুলিশ তাকে দুটি গুলিভর্তি একটি রিভলবারসহ গ্রেফতার দেখায়।
সালাউদ্দিন ও তার বাহিনীর নানা অপতত্পরতায় অতিষ্ঠ স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ, গ্রেফতারের খবরটি যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ প্রথম দফায় গোপন করে যায়। তবে পরদিন সালাউদ্দিনকে আদালতে পাঠানোর পর বিষয়টি আর গোপন থাকেনি।
এ প্রসঙ্গে উত্তর যাত্রাবাড়ী এলাকায় খুন হওয়া যুবক আলমগীরের মা ফরিদা বেগম ইত্তেফাকের কাছে অভিযোগ করে বলেন, আলমগীর হত্যার ঘটনায় সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করলেও পুলিশ মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে আসামিকে ‘অজ্ঞাত’ হিসাবে উল্লেখ করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশের সঙ্গে সালাউদ্দিনের সুসম্পর্ক রয়েছে। তাকে বাঁচাতে পুলিশ গ্রেফতারের বিষয়টি গোপন রাখে। গ্রেফতারের প্রায় এক মাস পর তিনি খবরটি জানতে পারেন।
সালাউদ্দিনকে গ্রেফতারের সময়ে যাত্রাবাড়ী থানায় ওসি হিসাবে দায়িত্ব পালনকারী আবুল কাশেম ও ওসি (তদন্ত) মাজহারুল ইসলাম দুজনই সম্প্রতি অন্যত্র বদলি হয়েছেন। সালাউদ্দিনের সঙ্গে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশের সখ্যের ব্যাপারে জানতে আবুল কাশেমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘অভিযোগটি মোটেও সঠিক নয়। বরং পুলিশই সালাউদ্দিনকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।
তিনি জানান, সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে ৫টি হত্যার ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে মামলা রয়েছে। এছাড়া আরও চারটি খুনের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মদদ দেয়ার অভিযোগে মামলা রয়েছে।’
র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিটের পরিচালক লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, ‘সালাউদ্দিনকে র্যাবও আগে থেকেই খুঁজছিল। কিন্তু এরই মধ্যে সে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে। যাত্রাবাড়ী এলাকার বেশিরভাগ খুনের ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।’
কে এই সালাউদ্দিন:৩০ বছরের যুবক সালাউদ্দিন সায়দাবাদ বাস টার্মিনালে এক সময় বাসের লাইনম্যান হিসাবে কাজ করত। পরে সে পুলিশের সোর্স হিসাবে কাজ করতে শুরু করে। এক সময় যাত্রাবাড়ী এলাকায় ছিনতাই ও ভাড়াটে খুনি হিসাবে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ ওঠে। তার বাবার নাম মোহাম্মদ আলী। সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত যে কয়টি খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২-১টি বাদে বাকি খুনের ঘটনাগুলো ঘটেছে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র অথবা শনিবার।
আলোচিত কয়েকটি হত্যা ও মামলা :গত ২১ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ীর বিবিরবাগিচার ৭৬/২/৬/সি নম্বর হোল্ডিংয়ের পাশে একটি খালি জায়গায় জবাই করা হয় মঙ্গল মিয়া (২০) নামে এক যুবককে। এ সংক্রান্ত মামলায় অভিযোগ রয়েছে, উঠতি সন্ত্রাসী সালাউদ্দিন এ হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেয়। গত ১৯ মে গভীর রাতে বিবিরবাগিচার ১৬/৮/সি নম্বর একটি বাড়ির সামনে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশের সোর্স আলমগীর হোসেনকে (২৬) জবাই করা হয়। আলমগীর হত্যা মামলায় অভিযোগ রয়েছে, নিজ গ্রুপের এক সদস্যকে ধরিয়ে দিতে পুলিশকে সহায়তা করায় সালাউদ্দিন তার বাহিনী নিয়ে আলমগীরকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করে।
২০১১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিবিরবাগিচার ৭২/ক/১, সূর্যকমল ক্লাবের বারান্দায় আমীর সিকদার (২৮) নামে এক যুবককে জবাই করা হয়। এ ঘটনাতেই সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রথম হত্যা মামলা দায়ের হয়। একই বছরের ১৭ অক্টোবর বিবিরবাগিচার ৮২/৯/এ, হালিমা ফার্মেসীর সামনে মাছ ব্যবসায়ী নূরুল ইসলামকে জবাই করা হয়। এ ঘটনায়ও সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
