দেশে কি হতে যাচ্ছে, সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে যথাসময়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে কিনা, নাকি নির্বাচনই হবে না, অথবা অগণতান্ত্রিক বা অসাংবিধানিক কোনো শক্তির আগমন ঘটবে কিনা- এরকম নানা প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক অঙ্গনসহ প্রায় প্রতিটি মহলে। খোদ বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও এসব প্রশ্নে দ্বন্দ্বে রয়েছেন। তার সাম্প্রতিক বক্তব্য-বিবৃতির মধ্যেই এর স্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে। প্রায় এক মাসে দেয়া খালেদা জিয়ার বক্তব্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি নিজেও দেশে জরুরি অবস্থা জারিসহ নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির উদ্ভবের আশঙ্কা করছেন।
নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের যে মূল দাবিতে বিরোধী দল আন্দোলন করছে, সেই ইস্যুতে খালেদা জিয়ার বক্তব্যের দিকে দৃষ্টি ফেরালে দেখা যায়, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার বিষয়ে আপাতত তিনি বা ১৮ দলীয় জোট কোনো ছাড় দিতে রাজি নন। তবে সংঘাতময় পরিস্থিতি, নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং গণতন্ত্রকে উপেক্ষা করে কোনো অসাংবিধানিক শক্তির আগমন যে তিনিও চান না সেটি তার বক্তব্যে পরিষ্কার। এজন্য তিনিও এ প্রশ্নে রাজনৈতিক সুরাহার জন্য সরকারকে সংলাপের আয়োজন করার জন্য ধারাবাহিকভাবে তাগিদ দিচ্ছেন। বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্য-বিবৃতি ও শারীরিক ভাষার দিকে আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, কার্যত নির্বাচনকালীন সরকার প্রধান পদে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তিনি বা তার দল দেখতে চান না-এরকম ইঙ্গিতও লুকায়িত রয়েছে। একইসঙ্গে এটাও পরিষ্কার যে, নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে সরকার যদি তার বর্তমান অবস্থানে অনঢ় থাকে তাহলে তীব্রতর আন্দোলনই যে বিরোধী জোটের কাছে একমাত্র পথ হয়ে উঠবে তা বারবার জানান দিচ্ছেন খালেদা জিয়া। কৌশলে পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বর্তমান সরকার নির্বাচনের আগেই দেশে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারে বলে গত ২৮ নভেম্বর নয়াপল্টনে ১৮ দলের সমাবেশে দেয়া বক্তব্যে আশংকা প্রকাশ করেছেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন, ‘বহু ফিসফাস শোনা যায়, ক্ষমতায় টিকে থাকতে দরকার হলে এ সরকার নাকি ইমার্জেন্সি (জরুরি অবস্থা) দেবে। কিন্তু ইমার্জেন্সি দেয়া হলে তা এ সরকারের জন্যই কাল হয়ে দাঁড়াবে। মানুষও তা মানবে না। সরকারের পতন ঘটাতে মানুষ রাজপথে নেমে আসবে। কারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।’
একই সমাবেশে বিরোধী দলীয় নেতা বলেছেন ‘দেশে নির্বাচন চাই। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। দেশের মধ্যে অন্যকিছু দেখতে চাই না।’ সংঘামত রাজনৈতিক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটলে নির্বাচনের বদলে দেশে অন্যকিছুরও যে আগমন ঘটতে পারে, সেরকম শঙ্কাই উচ্চারিত হয়েছে বিএনপি প্রধানের কণ্ঠে।
আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির সামনে যে আরও কঠিন পরিস্থিতি আসতে পারে, খালেদা জিয়া এরকম শঙ্কা ব্যক্ত করেন গত ১৯ ডিসেম্বর বিএনপির দেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের চিন্তা আজীবন ক্ষমতায় থাকার। এজন্য তারা অন্য সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করতে চায়। এই চিন্তা-চেতনার কারণেই তারা বিরোধী দলকে মিছিল ও সভা-সমাবেশের অনুমতি দেয় না, কোনো স্থান দেয়া হয় না।’ তিনি আরও বলেন, বিরোধী দলের ২৫ হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা’ মামলা দেয়া হয়েছে। এসব ‘মিথ্যা’ মামলা দিয়েও কোনো কাজ হবে না। যতোই মামলা দেয়া হোক, গ্রেফতার-নির্যাতন চালানো হোক, তাতে ১৮ দলের শুধু যোগই হবে, বিয়োগ হওয়ার কিছু নেই। এখন বিয়োগ হতে থাকবে শুধু আওয়ামী লীগের।
গত ১৩ ডিসেম্বর বিজিএমইএ আয়োজিত বাটেক্সপোর সমাপনী অনুষ্ঠানেও বিরোধী দলীয় নেতা বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার একদলীয় মনোভাব নিয়ে গণতন্ত্রের নাম-নিশানা মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। ভিন্নমত ও বিরোধী দলকে ফ্যাসিস্ট কায়দায় দমনের চেষ্টা আজ দিবালোকের মত স্পষ্ট। এর আগে গত ১০ ডিসেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গ্রেফতারের পর তার মুক্তি দাবি করে দেয়া বিবৃতিতেও খালেদা জিয়া বলেছেন, সরকার দেশকে সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গণবিচ্ছিন্ন হয়ে সরকার খুন, গুম, হামলা, জুলুম ও নির্যাতন চালিয়ে এবং চক্রান্তের মাধ্যমে বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়।
খালেদা জিয়া তার সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্যে এমন অভিযোগের ইঙ্গিতও দিয়েছেন যে, আগামী মেয়াদেও যে কোনোভাবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা করছে এবং বিএনপিকে ক্ষমতায় আসতে না দেয়ার দেশি-বিদেশি চক্রান্ত চলছে। ১৯ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘মনে হচ্ছে দেশটা তাদের (আওয়ামী লীগের) পৈতৃক সম্পত্তি। কিন্তু এদেশকে কারও পৈতৃক সম্পত্তি হতে দেয়া হবে না।’ বিদেশি চক্রান্তের দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেছেন, ‘আমি স্পষ্টভাবে বলে দিতে চাই-বিদেশে আমাদের বন্ধু রয়েছে, তবে বিদেশে আমাদের কোনো প্রভু নেই। আওয়ামী লীগ দেশের মানুষকে যেমন অন্যের পদানত রাখে তেমনি দেশকেও করদরাজ্য বানিয়ে আজীবন ক্ষমতায় থাকতে চায়। কিন্তু তা হতে দেয়া হবে না। কারও আধিপত্য মেনে নয়, এদেশ পরিচালিত হবে এদেশেরই জনগণের নির্দেশ-নির্দেশনায়।’ এর আগে ২৮ নভেম্বরের সমাবেশেও তিনি বলেছেন, ‘এদেশ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। এখানে রাজতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র চলে না। কোনো একটি পরিবারের জন্য এদেশ নয়। এদেশ জনগণের। এদেশের জণগণই ঠিক করবে-দেশ কারা চালাবে।’
নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে ২৮ নভেম্বর ও ১৯ ডিসেম্বর দু’দিনই খালেদা জিয়া বলেছেন, নির্দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে এবং হতেই হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে এদেশে কোনো নির্বাচন হবে না, হতেও দেয়া হবে না। তত্ত্বাবধায়কের দাবিতে আন্দোলন চলছে, আন্দোলন চালিয়ে যাব।
তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে সমঝোতার জন্য সংলাপের কথা সর্বশেষ গত ১১ ডিসেম্বরও বলেছেন বিরোধী দলীয় নেতা। ঐদিন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ও ব্লেকের সঙ্গে বৈঠককালে তিনি বলেছেন, ‘আমরাও সংলাপ চাই। তবে সরকারই সংলাপের সকল পথ বন্ধ করে দিচ্ছে।’
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বললেও কার্যত নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান পদে বিএনপি যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেখতে চায় না সেটির ইঙ্গিত মেলে চলতি বছরের জানুয়ারিতে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে যোগ দিয়ে খালেদা জিয়া যে লিখিত বক্তব্য রেখেছিলেন সেখানেও। এই বক্তব্যে তিনি বলেছেন, সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হোক। এরপর সরকার প্রধান কে হবেন তা নিয়ে আলোচনার জন্য আমরা সংলাপে বসতে রাজি। নির্বাচনকে সামনে রেখে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগগুলোকেও জোরালোভাবে উপস্থাপনের কৌশল নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। ১৯ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকারের ডানে-বায়ে মন্ত্রী উপদেষ্টা ও এমপিদের সবাই চোর। কান টানলে মাথা চলে আসবে বলেই দুই আবুলকে (সৈয়দ আবুল হোসেন ও আবুল হাসান চৌধুরী) ধরা হয়নি। এর আগে ২৮ নভেম্বর ১৮ দলের সমাবেশে তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবার দুর্নীতিগ্রস্ত। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে বর্তমান সরকারের ‘দুর্নীতি’র বিচার করা হবে বলে উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘বিচারের জন্য প্রস্তুত হোন, শাস্তির জন্য প্রস্তুত হোন’।
