ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল ঘরে ঘরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়নি, কারণ এ বছরে দেশে বিনিয়োগ হয়নি কাঙ্খিত মাত্রার। বিনিয়োগ না বাড়ার কারণ হিসাবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সরকারের মেয়াদ শেষের দিকে। রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ঘোলাটে। ব্যবসায়ীদের মাঝে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছে। চারিদিকে প্রশ্ন দেশে হচ্ছেটা কী? এরসঙ্গে যোগ হয়েছে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট। আর গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটতো লেগেই আছে।
আর উচ্চ দ্রব্যমূল্যের কারণে ভোগান্তিতে পড়ে মধ্যবিত্তরা। সঞ্চয়পত্র ভেঙ্গে চালাতে হচ্ছে সংসার।
ব্যাংকিং সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিনিয়োগের দিক থেকে ভালো কাটেনি ২০১২ সাল। ব্যাংকগুলোতে টাকার অভাব থাকায় শিল্প উদ্যোক্তারা চাহিদা মতো ঋণ পাননি। যা পেয়েছেন, তা ছিল চড়া সুদে। এরপরও যারা বিনিয়োগ করেছেন তারা বিপাকে পড়েছেন গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সঙ্কটের কারণে। দফায় দফায় জ্বালানির দাম বাড়ায় আরও চাপের মুখে পড়েছেন শিল্প উদ্যোক্তারা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ দেয়া হয়নি। যাদের সংযোগ আছে তারা তীব্র লোডশেডিংয়ে পড়েছেন। গ্যাসের চাপও ছিল খুব কম। ফলে শিল্প উত্পাদন ব্যাহত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সঙ্কটের কারণে শিল্প কারখানাগুলোতে উত্পাদন ক্ষমতার প্রায় ৩০ শতাংশ উত্পাদন করা সম্ভব হয়নি। এদিকে দফায় দফায় জ্বালানির দাম বাড়ায় উত্পাদন খরচ ও সরবরাহ খরচ বেড়ে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হয়েছে। দেশের রাস্তা ঘাটের বেহাল দশা ও সর্বোপরি বিশ্বব্যাপী মন্দা পরিস্থিতিতে শিল্প উদ্যোক্তারা শিল্প চালাতে বেশ হিমশিম খাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তারা ভরসা পাচ্ছেন না। ফলে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। চাপ সৃষ্টি হচ্ছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে।
বিনিয়োগ বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, ২০১১ সালে ১৯৭৪টি প্রকল্পে দেশি-বিদেশি মোট বিনিয়োগ নিবন্ধের পরিমাণ ছিল ১০,৩১,০৭৫ মিলিয়ন টাকা। আর চলতি বছরে (অক্টোবর পর্যন্ত) ১৬০১টি প্রকল্পে মোট বিনিয়োগ নিবন্ধের পরিমাণ ৪,৯৮,১৮৭ মিলিয়ন টাকা।
দেশে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির চিত্র থেকেও। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসে শিল্প স্থাপনের যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার হার প্রায় ২৫ দশমিক ৮২ শতাংশ কমে গেছে। অথচ গত বছর এই সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতির ওপর এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছিল ৬০ দশমিক ৩৯ শতাংশ। যন্ত্রপাতি আমদানি না হলে বিনিয়োগ ও উত্পাদন ব্যাহত হয়।
অর্থশাস্ত্র অনুযায়ী, বিনিয়োগের সাথে কর্মসংস্থান ও জাতীয় মোট উত্পাদনের (জিডিপি) সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিনিয়োগ বাড়লে দেশে কর্মসংস্থান ও জিডিপি বাড়ে। আর বিনিয়োগ কমলে কমে যায় কর্মসংস্থান, কমে যায় মানুষের আয়, নেতিবাচক প্রভাব পড়ে জিডিপির উপর। গেল বছরটিতে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভালো না থাকায় কর্মসংস্থান প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি। অথচ উচ্চ দ্রব্যমূল্য বিদ্যমান ছিল। তাই সীমিত আয়ের মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেককে সঞ্চয় ভেঙ্গে জীবন চালাতে হয়েছে। অনেকে সঞ্চয় বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। আর সঞ্চয় কমে যাওয়ায় ব্যাংকের ঋণযোগ্য তহবিলে প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, চলতি বছরে দেশের ব্যাংকগুলোর স্বল্পমেয়াদি আমানত ও দীর্ঘমেয়াদি আমানত আগের মতো বাড়ছে না। গত অক্টোবরে ব্যাংকগুলোর স্বল্পমেয়াদি আমানতের (ডিমান্ড ডিপোজিট) প্রবৃদ্ধি গত বছরের অক্টোবরের তুলনায় ১ দশমিক ২৩ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে দীর্ঘমেয়াদি আমানতের (টাইম ডিপোজিট) প্রবৃদ্ধি গত সেপ্টেম্বরের তুলনায় মাত্র ১ দশমিক ২৮ শতাংশ বেড়েছে। অথচ গত বছরও এ প্রবৃদ্ধি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের উপরে ছিল।
সঞ্চয় প্রবণতা কমে যাওয়ায় সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ভাটা পড়েছে। জাতীয় সঞ্চয় পরিদপ্তরের তথ্যে দেখা গেছে, সঞ্চয়পত্র কিনে বিনিয়োগকারীরা যা জমা করছেন সঞ্চয়পত্র ভাঙ্গিয়ে উঠিয়ে নিয়েছেন প্রায় তার সমান। ফলে নীট সঞ্চয় হয়েছে খুব কম। চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়ে নীট জমা হয়েছে ৫১১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এই সময়ে ৭ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা জমার বিপরীতে উত্তোলন হয়েছে ৭ হাজার ৪২২ কোটি টাকা।
এদিকে সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে সরকার জনগণের কাছ থেকে ঋণ নিতে পারে। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সঞ্চয়পত্র বিক্রি না হওয়ায় সরকার বাধ্য হয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ করছে। ফলে ব্যাংকের তহবিলে টান পড়ছে। তাছাড়া উচ্চ দ্রব্যমূল্যের কারণে আমানতকারীদের মধ্যে সঞ্চয় প্রবণতা কমে যাওয়ায় ব্যাংকের তারল্য সঙ্কট আরও বড় হয়ে দেখা দেয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকের ঋণের সুদ হার বেড়ে যায়। যা দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও স্বীকার করেছেন বিনিয়োগ মন্দার কথা। বিশেজ্ঞদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিতে গিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ সংকুচিত করা হয়েছে। শেয়ার বাজারে কারসাজির মাধ্যমে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে, এই দুই উত্স থেকে সম্ভাব্য পুঁজির যোগান আসেনি। অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, বিনিয়োগ সুরক্ষা ও গভর্নেন্স ইস্যুগুলো মোকাবেলা না করলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আসবে না। বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান হবে না। আমাদের জাতীয় আয়ও কাঙ্খিত হারে বাড়বে না। তাই বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ সর্বাগ্রে নিশ্চিত করা দরকার।
আগামীকাল পড়ুন: আস্থা ও তারল্য সংকটে তলানিতে শেয়ার বাজার
