ধান ক্ষেতের মাঝে টাঙানো হয়েছে প্যান্ডেল। দূর-দূরান্ত থেকে আসছেন মানুষ, হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান শুনতে। উপমহাদেশের প্রবাদপ্রতীম এই গণসঙ্গীত শিল্পী ও সুরকারের জন্মশতবর্ষ উত্সবের সমাপনী ছিল কাল। ‘কাস্তেটারে দিও জোরে শান কিষাণ ভাই রে...’ এই শ্লোগান নিয়ে উত্সবের শেষ দিনের আয়োজন বসেছিল শিল্পীর জন্মস্থান হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশী গ্রামে।
এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে যেন জন্মগ্রামে ফিরে এলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। প্রজা নির্যাতনের প্রতিবাদ করায় জমিদার পিতা যাকে বের করে দিয়েছিলেন ঘর থেকে, সেই তিনি নিজের জীবন উত্সর্গ করেছিলেন নিপীড়িত, শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য। অথচ নিজ গ্রামেই তিনি ছিলেন অপরিচিত। প্রায় হারিয়ে গিয়েছিলেন বিস্মৃতির অতলে। গতকাল সোমবারের আয়োজনের মাধ্যমে চুনারুঘাটের মানুষ যেন তাদের সেই গ্লানি কাটাতে চাইলেন। গভীর রাত পর্যন্ত গান শুনে, অতিথিদের আলোচনায় তারা যেন নতুন করে চিনে নিচ্ছিলেন তাদের ঘরের ছেলে এই বিশিষ্ট গণসঙ্গীত শিল্পীকে। অনুষ্ঠানে ভারতের কলকাতা থেকে এসে যোগ দেন হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মেয়ে রঙিলী বিশ্বাস। এই প্রথমবারের মতো পিতার জন্মগ্রামে এলেন। বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগতাড়িত গলায় বললেন, ‘আমি অভিভূত। ধন্য। কখনোই ভাবিনি আমার বাবাকে নিয়ে এই আয়োজন হবে। এজন্য বাংলাদেশের মানুষের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। বাবা নেই। কিন্তু তিনি আছেন এখানেই। মানুষের মনে বেঁচে আছেন। শুধু তার গানের মধ্যে বেঁচে আছেন তা নয়, তার জন্মস্থান থেকেও তিনি হারিয়ে যাননি।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী। উত্সবের সহযোগী সংগঠন চুনারুঘাট সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদের সভাপতি সালেহউদ্দিনের সভাপতিত্বে আলোচনা পর্বে আরো বক্তব্য রাখেন হাসান ফকরি, মফিজুর রহমান লাল্টু, মাহফুজুর রহমান, শুভেন্দু ইমাম, হবিগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ জাহানারা খাতুন, বৃন্দাবন সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ বিজিত কুমার ভট্টাচার্য, চুনারুঘাট পৌর মেয়র মোহাম্মদ আলী, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী তালুকদার প্রমুখ।
আলোচনা শেষে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান গেয়ে শ্রোতা-দর্শকদের উদ্দীপ্ত করেন শিল্পীরা। চুনারুঘাট সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদের শিল্পীদের গান দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। স্থানীয় বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ ও সঙ্গীত পরিবেশন করে ।
হেমাঙ্গ বিশ্বাস ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত গায়ক, গীতিকার, সুরকার ও সংগঠক। ১৯১২ সালের ১৪ জানুয়ারি তার জন্ম, মারা যান ১৯৮৭ সালের ২২ নভেম্বর। লোকসঙ্গীতকে কেন্দ করে গণসঙ্গীত সৃষ্টির ক্ষেত্রে তার অবদান উল্লেখযোগ্য। তার গান আজো মানুষকে উদ্দীপ্ত করে। ‘ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না’, ‘থাকিলে ডোবাখানা’, ‘তোমার কাস্তেটারে দিও জোরে শান’, ‘শঙ্খচিল’, ‘শহীদের খুনে রাঙা পথে’, ‘আরো বসন্ত বহু বসন্ত’, ‘আমরা তো ভুলি নাই শহীদ’ প্রভৃতি গান আজো যেকোন আন্দোলনে-সংগ্রামে গাওয়া হয়।
এদিকে জন্মশতবর্ষ উত্সব শেষ হলেও চুনারুঘাট সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ হেমাঙ্গ বিশ্বাস স্মরণে আজ মঙ্গলবার একই মঞ্চে একক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করবেন দেশের জনপ্রিয় গণসঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীর ও তার দল ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠীর শিল্পীরা।
