সাহসী এক মালালার কথা

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:২৪
ফুলের মতো সুন্দর একটি মেয়ে। বয়স মাত্র ১৫ বছর ৫ মাস। এরই মধ্যে সারা পৃথিবীর মানুষ তার নাম জানে। ধন্যি ধন্যি দেয় তার নামে। এরই মধ্যে সে ভারী ভারী দুটো পুরস্কারও অর্জন করে ফেলেছে— একটি আন্তর্জাতিক এবং অন্যটি জাতীয় পুরস্কার। একটি পুরস্কারের নাম ‘ইন্টারন্যাশনাল চিলড্রেন’স পিস প্রাইজ’ (আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার); আর অন্যটির নাম ‘ন্যাশনাল ইয়ুথ পিস প্রাইজ’ (জাতীয় যুব শান্তি পুরস্কার)। দুটো পুরস্কারই সে পেয়েছে ২০১১ সালে— মাত্র ১৪ বছর বয়সে। শুধু কি তাই? এই ছোট্ট মেয়েটিকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় পুরস্কার ‘নোবেল প্রাইজ’ (নোবেল শান্তি পুরস্কার) দেয়ার জন্যও দাবি উঠছে বিভিন্ন দেশ থেকে। এ ছাড়া জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল বান কি মুন ১০ নভেম্বরকে বিশ্বব্যাপী তার নামে উদযাপনের ঘোষণা দিয়েছেন তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ। এ বছর ১১ নভেম্বর তা পালিতও হয়েছে। সারা দুনিয়ার মানুষের মুখে আজ তার কথা। তার সাহসের কথা। তার সংকল্প আর হার-না-মানা দৃঢ়তার কথা। অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার কাহিনী। সে যেন এক রূপকথার সাহসী রাজকন্যা- হাউ মাউ খাউ দৈত্য-দানোকেও যে ভয় পায় না। এই সাহসী মেয়েটি বিদায়ী ২০১২ সালের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র এবং তাকে নিয়ে ঘটে-যাওয়া যত্ত ঘটনা বছরের সবচেয়ে সাড়া জাগানো ঘটনা। বর্তমান বিশ্বে শক্তিধর মার্কিন রাষ্ট্রপতি ওবামার পরই মালালার স্থান। তো, এতটুকু বয়সে দুনিয়া জুড়ে হৈ চৈ ফেলে দেয়া সেই সোনার মেয়েটি কে? কি কাজ সে করেছে যে, সারা পৃথিবী তাকে নিয়ে এত মাতামাতি করছে? তার নাম মালালা। পুরো নাম মালালা ইউসফজাঈ। বাবার নাম জিয়াউদ্দিন ইউসফজাঈ। পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের সোয়াত উপত্যকার সোয়াত জেলার মিঙ্গুরায় জন্ম মালালার, ১৯৯৭ সালের ১২ জুলাই। মালালার মাতৃভাষা পশতু- পাকিস্তানের একটি প্রাদেশিক ভাষা। এই ভাষায় ‘মালালা’ শব্দের মানে হলো ‘দুঃখিত!’, ‘বিষণ্ন’। পশতু ভাষার বিখ্যাত মহিলা কবি এবং ১৮৮০ সালে দ্বিতীয় আফগান যুদ্ধে ব্রিটিশ বিরোধী সাহসী যোদ্ধা মালালাইয়ের নামে রাখা হয় তার নাম। নামটি রাখেন মালালার কবি-পিতা জিয়াউদ্দিন ইউসফজাঈ। আসলে মালালা শব্দের অর্থ ‘দুঃখিত’ বা ‘বিষণ্ন’ হলে কী হবে। বাস্তবে কিন্তু আমাদের মালালা মোটেই দুঃখিত বা বিষণ্ন নয়। সে বরং বীরাঙ্গনা কবি মালালাইয়ের সাহসী চরিত্রই পেয়েছে। ভারী প্রাণবন্ত, নির্ভয়, অটল এবং প্রতিবাদী। অন্য আর দশটি মেয়ের থেকে সে আলাদা। সব সময় পড়তে চায়। জানতে চায়। কম্পিউটার নিয়ে ব্লগিং করে। কত্ত কী সার্চ করে! শুধু সে নিজে পড়ার প্রতি আগ্রহী, তাই নয়; অন্য মেয়েদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়ার ব্যাপারেও সে দারুণ আগ্রহী। পুরো সোয়াত উপত্যকায় এজন্য তার সুনাম। কিন্তু পড়াশুনার ব্যাপারে তার এই আগ্রহ একটি গোষ্ঠী ভালো চোখে দেখল না। তারা কে? তারা হলো তালেবান জঙ্গি। বড় হলে তোমরা তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পরবে। এখন শুধু এটুকু জেনে রাখো যে, তালেবানরা হলো অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। এদের উত্পত্তি আফগানিস্তানে। এখন তাদের অনেক অনুসারী পাকিস্তানেও ঘাঁটি গেড়েছে। তারা আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা মানে না। মেয়েরা স্কুলে যাক, লেখাপড়া শিখুক— তা তারা পছন্দ করে না। ছবি আঁকা, গান-বাজনা তারা একদম সহ্য করতে পারে না। তারা এখনো পড়ে আছে মধ্যযুগীয় অচল সব ধ্যান-ধারণা নিয়ে। এই তালেবান জঙ্গি গোষ্ঠী মালালাদের এলাকায় দারুণ উত্পাত করল। তারা মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। ঘোষণায় বলা হলো: ১৫ জানুয়ারি, ২০০৯-এর পর কোনো মেয়ে স্কুলে যেতে পারবে না। তারা মালালাকে ভয় দেখালো। সাবধান করে দিল। এ সময় মাত্র ১২ বছর বয়সে কম্পিউটার ব্লগে মালালা এই হুমকির কথা বিবিসিকে জানালো। আর সমস্ত ভয়, হুমকি-ধামকির তোয়াক্কা না করে সে শিক্ষা বিস্তারে কাজ চালিয়ে যেতে লাগল। মেয়েদের শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে সে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সাক্ষাত্কার দিল। পেশোয়ার প্রেসক্লাবে ভাষণ দিয়ে সাংবাদিকদের তাক লাগিয়ে দিল। তার জীবন ও কাজকর্ম নিয়ে হলো তৈরি তথ্যচিত্র। কিশোরী একটি মেয়ে। সে মেয়েদের শিক্ষার জন্য এতকিছু করছে। মানুষ তার প্রশংসা করছে। পত্রপত্রিকায় নাম আসছে, ছবি ছাপা হচ্ছে। তালেবানদের রক্তচক্ষু আর হুমকি-ধমকি সে পাত্তাই দিচ্ছে না— এটি একেবারেই পছন্দ হলো না জঙ্গি তালেবানদের। তারা মালালাকে সতর্ক করেছে; কিন্তু সাহসী মেয়েটি তা আমলে নেয়নি। সুতরাং আর তাকে বাঁচতে দেয়া যায় না। নিষ্ঠুর জঙ্গিরা তখন তাজা গোলাপের মতো সুন্দর মেয়ে, সাহসী মেয়ে মালালাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চাইল। দিনটি ছিলো ৯ অক্টোবর, ২০১২ খ্রিস্টাব্দ। মালালা স্কুলবাসে করে বাড়ি ফিরছিল। বাসটি তার বাড়ির কাছে এসেছে। বাসে আরো মেয়েরা রয়েছে। তখন এক মুখোশপরা তালেবান বন্দুকধারী চিত্কার করে বলল, “তোমাদের মধ্যে মালালা কে? বলো, না হলে সবাইকে গুলি করে মারব।” তারপর মালালার পরিচয় জানতে পেরে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে সেই তালেবান বন্দুকধারী। গুলি মালালার মাথায় ও ঘাড়ে লাগে। তাকে বিমানে করে পেশোয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু তার অবস্থা ছিলো সংকটজনক। শেষে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পাঁচদিন পর ১৫ অক্টোবর তাকে জরুরিভিত্তিতে লন্ডনে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। উন্নত চিকিত্সার ফলে মালালার অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। এখন সে অনেকটা সুস্থ। পুরোপুরি সুস্থ হলেই সে আবার ফিরে আসবে তার দেশে। দূর দেশের সোনার মেয়ে— প্রিয় বোন মালালা! তুমি আমাদের প্রাণঢালা ভালোবাসা আর আশীর্বাদ গ্রহণ করো। তুমি ভালো থাকো। সুস্থ থাকো। নিরাপদে থাক।