মঞ্জু বেশ খানিকক্ষণ বেঞ্চিতে বসা। অন্যদিন বিস্কুট, চকলেট কিনে খায়। কিছুক্ষণ বসে। নতুবা বিস্কুট চকলেট কিনে বাড়ির পথে পা বাড়ায়। নিজ বাড়ি নয়, শরণার্থী ঘর। ময়নামতি সেনানিবাস থেকে পোয়া মাইল উত্তরে মীর বাড়ি। শাহ দৌলতপুর গ্রাম। বাড়ির পাশেই ময়নামতি সাবের বাজার। এ বাজারের বুক চিরেই চলে গেছে কুমিল্লা সিলেট মহাসড়ক।
চাচা, মুক্তিযোদ্ধা কি? মঞ্জু চা দোকানিকে চাচা বলে ডাকে। চা দোকানে বসে আড্ডা দেয়ার অভ্যাস নেই মঞ্জুর। কিন্তু এখানে যে খবর শোনার আর কোনো সুযোগ নেই। দিনে তিনবার। খবরের সময় দোকানে এসে হাজির হয়। দোকানির নাম সে জানে না। দোকানির ছেলে আলমগীর তার সহপাঠী। স্কুল থেকে মাইল তিনেক দূরত্বে আলমগীরদের বাড়ি। সহপাঠীর সাথে গল্পসল্প করে সময় কাটে মঞ্জুর। শুধু খবরের সময় দোকানে আসে। বিবিসি, আকাশবাণী ও ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদ সে প্রায়ই শোনে। চা দোকানে হাটবারে লোকজনের ভিড় বেশি থাকে। তারা একে অপরে দেশ নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলে। মঞ্জু তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে। খবরও শোনে মনোযোগ দিয়ে। মঞ্জু শুনেছে যুদ্ধ মানে মারামারি। মারামারিতে থাকে দুটি পক্ষ। একপক্ষ আক্রমণ করলে অন্যপক্ষ প্রতিরোধ করে। উভয়ই অস্ত্র ব্যবহার করে। যার যা আছে তাই নিয়ে।
আজ হাটবার নয়। দোকান নিরিবিলি। খবরে শুনেছে, মুক্তিযোদ্ধারা বেদম মার দিচ্ছে পাকিস্তানি সৈন্যদের। মার খেয়ে সৈন্যদের অনেকে মারা পড়েছে। কেউ কেউ পালিয়েছে। তা শুনে মঞ্জুর মনে আনন্দ লাগছে। ভীষণ উত্তেজনা অনুভব করছে। মুক্তিযোদ্ধারা মারছে আর শত্রু সেনারা পরাজিত হচ্ছে। চা দোকানি টুংটাং শব্দ করে কাজ করে যাচ্ছে। মঞ্জুর কথা তার কানে পৌঁছালো বলে মনে হয় না। মঞ্জু আবারো বলল, চাচা মুক্তিযোদ্ধা কি? চাচা এবার বলল, মুক্তিযোদ্ধা কি? তা কি তুমি জানো না? মঞ্জু ছোট্ট করে জবাব দিলো, “না”। মুক্তিযোদ্ধা মানে এদেশের সন্তান। এদেশের হয়ে পাকিস্তানী সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। যারা এদেশের জন্য যুদ্ধ করছে তারা মুক্তিযোদ্ধা। পাকিস্তানি সৈন্যরা দখলদার। চাচা একটানে কথাগুলো বললেন।
মঞ্জু নিজ কানে শুনেছে— বঙ্গবন্ধু বলেছেন, তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করো। দেশকে শত্রুমুক্ত করো। পাকিস্তানি সৈন্যরা আধুনিক অস্ত্র নিয়ে এদেশবাসীর উপর রাতের আঁঁধারে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। অনেককে হত্যা করেছে। বাড়ি-ঘরে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে বসতবাড়ি করেছে পোড়া ভিটা। বহুলোক ঘরছাড়া হয়েছে। হয়েছে শরণার্থী। নিজ দেশে থেকে নিজ ঘরে না থেকেও জীবন বাঁচাতে দূর গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। মঞ্জুদের পরিবারও তো আশ্রয় নিয়েছে আলমগীরদের বাড়ি।
অন্য একদিন চা দোকানে এসেছে খবর শুনতে। লোকজন নাই। দুপুরের খবর। থ্রি ব্যান্ড রেডিওতে খবর চলছে। মুক্তিবাহিনী চরম মার মারছে। গেরিলা মাইরে পাকিস্তানি সৈন্যরা নাস্তানাবুদ। এমন সময় গেঞ্জি-লুঙ্গি পরা এক লোক এলো। পিঠে পুরোনো লুঙ্গি দিয়ে পেচানো পোটলা। লোকটি এসেই পানি চাইলো। আর বলল, “এক কাপ চা দেন। কলা রুটি কিছু আছে?” কলা রুটি নিয়ে কিছুক্ষণ আগে দোকানি চাচা দোকান খুলেছেন। কেটলীতে পানি গরম করে চা পাতা দিয়েছেন মাত্র। চাচা নিজ থেকে কলা পাউরুটি নিয়ে একটি প্লেটে করে তার সামনে দিলেন। পানি শূন্য জগ। এই মুহূর্তে ওঠারও সুযোগ নেই। চাচা বললেন, একটু পানি এনে দাওতো বাবা ঐ টিউবওয়েল থেকে। মঞ্জু কোনো কথা না বলে জগ নিয়ে টিউবওয়েল থেকে পানি এনে দিল। লোকটির কলা পাউরুটি খাওয়া শেষ। চাচা গ্লাস ধুয়ে পানি দিলেন। কয়েক গ্লাস পানি পান করার পর চা পান করে টাকা পরিশোধ করে চলে গেল লোকটি।
লোকটি চলে যাওয়ার পর চাচা বললেন, লোকটিকে চেনো? না। মঞ্জু বলল, ‘মনে হয় লোকটি কোথাও কাজের উদ্দেশ্যে যাচ্ছে। পিঠে পোটলা-পুটলি। দিনমজুর হবে হয়তো। চাচা বললেন, “না, না দিনমজুর হবে কেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা। তুমি যাকে পানি এনে সেবা দিয়েছ, তুমি মুক্তিযোদ্ধাকেই সহায়তা করেছ।’
মঞ্জু চাচার মুখের দিকে তাকিয়ে থ হয়ে গেল। মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগল। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে দিনমজুর বলল। চাচা মঞ্জুর মনের অবস্থা বুঝতে পারলেন। বললেন, না না তুমি বুঝবে কেমন করে। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা এমনই পোশাক পরে। সাধারণ মানুষের মত। সাধারণ মানুষের সাথে মিশে গিয়ে অতর্কিতে শত্রু বাহিনীর উপর হামলা চালায়। গেরিলা যুদ্ধ করে। এ যোদ্ধা গেরিলা বাহিনীর লোক।
মঞ্জু একজন মুক্তিযোদ্ধাকে চিনতে পেরে গর্ববোধ করে। মনে মনে সে সিদ্ধান্ত নেয়— সেও যুদ্ধে যাবে।
