ফ্লোরা লিমিটেড

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৪৩
প্রযুক্তিতে জনমানুষকে সম্পৃক্ত করার প্রত্যয় নিয়ে আজ থেকে ৪০ বছর পূর্বে টাইপরাইটারের মাধ্যমে প্রযুক্তি ব্যবসায় প্রবেশ করে দেশের স্বনামধন্য আইটি কোম্পানি ফ্লোরা লিমিটেড। সেই থেকে বর্তমানের বিশ্বসমাদৃত আইটি ব্র্যান্ডের পাশাপাশি নিজস্ব ব্র্যান্ড ‘ফ্লোরা’ নিয়ে সফলতার সাথে এগিয়ে চলেছে এই প্রতিষ্ঠানটি। আমাদের দেশের ৪ দশক বয়সী একমাত্র আইটি কোম্পানি ফ্লোরা লিমিটেডের নানা কথা উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা সামসুল ইসলামের সাথে আলাপচারিতায়। বিষয়গুলো তুলে ধরছেন মোজাহেদুল ইসলাম চল্লিশ বছর সময়টা নেহায়েত কম নয়। ফ্লোরা লিমিটেড এই দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে সেরা মানের আইটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে। সামসুল ইসলাম বলেন, ‘ফ্লোরা লিমিটেডের চেয়ারম্যান এমএস ইসলাম পাকিস্তানীদের সাথে বনাবনি না হওয়ায় তার ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দেন। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশে সম্পূর্ণ বেকার তিনি চিন্তা করলেন প্রযুক্তির সাথে নিজেকে কীভাবে সম্পৃক্ত করা যায়, যাতে নিজের বেকারত্বও ঘুচবে আবার নতুন প্রযুক্তির সাথেও জনগণকে সম্পৃক্ত করা যাবে। তিনি দেখেন ব্যাংকগুলোকে আরও বেশি কর্মক্ষম করতে হলে টাইপরাইটার দরকার। তখন তিনি কিছু ব্যাংকে টাইপরাইটার সাপ্লাই দেন। তিনি দেখেন বাংলা টাইপরাইটার জনপ্রিয় হতে থাকে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগেও টাইপরাইটার নিয়ে বাণিজ্যিক কাজ করছে। তখন কোর্টে এবং বিভিন্ন অফিসে টাইপরাইটার দিয়ে লেখা হত। এই ধরনের কিছু টাইপরাইটার এখনও পর্যন্ত পল্টন দৈনিক বাংলার মোড়ে অল্প কিছু চোখে পড়ে। এখনও পর্যন্ত যারা টিকে রয়েছেন, তাদের প্রজন্মের পরে আর এই টাইপরাইটারগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেই প্রজন্মের অনেক মানুষকে ফ্লোরা যেমন যন্ত্র ধরিয়ে দিয়েছে এবং একইসাথে নিজেও কিছু ব্যবসা করেছে; তেমনি আধুনিক এই যুগে এসে ফ্লোরা নতুন নতুন প্রযুক্তি পণ্য নিয়ে আধুনিক মানুষদের নতুনভাবে শিক্ষিত করে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির সাথে।’ ফ্লোরা লিমিটেডের ব্যবসার ধারাবাহিকতা তুলে ধরতে গিয়ে মোস্তফা সামসুল ইসলাম বলেন, ‘এরপর আমরা ডুপ্লিকেটিং মেশিন আনি দেশে। ১৯৮৩ সালে ফ্লোরা দেশে প্রথম ক্যানন ক্যালকুলেটর মেশিন বাজারজাত করা শুরু করে। তখনই মূলত অফিস অটোমেশন শুরু হয় এই দেশে। আশির দশকে আমরা পুরোপুরি দেশে টেকনোলজি ট্রান্সফারের দিকে নজর দেই। আমরা দেখি দেশিয় কোম্পানিগুলোকে আরও দক্ষ করতে হলে তাদের হাতে প্রযুক্তি তুলে দিতে হবে। ১৯৮২ সালে বাণিজ্যিকভাবে আমরা কিছু কম্পিউটার নিয়ে আসতে শুরু করি। তখনকার সময়ে এসব কম্পিউটারের মূল্য ছিল তিন (৩) থেকে সাড়ে তিন (৩.৫) লাখ টাকা ছিল। এত উচ্চমূল্য হওয়া সত্ত্বেও বিত্তবান মানুষরা কিনতে শুরু করে কম্পিউটার। ১৯৮৬ সাল থেকেই মূলত তথ্যপ্রযুক্তির জাগরণ শুরু হয় আমাদের দেশে। তখন আইবিএম, এইচপি, কমপ্যাক প্রভৃতি ব্র্যান্ডের কম্পিউটার জনপ্রিয় হতে শুরু করে।’ সামসুল ইসলাম জানান, ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ফ্লোরা অনেক ছোট পরিসরে কাজ করেছে। ১৯৯২ সাল থেকে তারা বাংলাদেশের বাজারে এইচপি, এপসন, ক্যানন, মাইক্রোসফট, সিসকো সিস্টেমস, থ্রিএম, সিস্টেম্যাক্স, এপিসি, অলিম্পাস, নাইকন, রোল্যান্ড, ক্রিয়েটিভ, ভারবাটিম, ডেল, লিংকসিস ও ইন্টেলের পণ্য বাজারজাত করে আসছে। অতি সম্প্রতি তাদের ব্র্যান্ড লাইন-আপে যুক্ত হয়েছে লেনোভো। মোস্তফা সামসুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথমে আমরা টাইপরাইটার বাজারজাত করেছি। এরপর কম্পিউটার বাজারজাত করা শুরু করি। সময়ের সাথে সাথে আমরা বিশ্বের সেরা সব ব্র্যান্ডের কম্পিউটার নিয়ে আসতে শুরু করি বাজারে। আর এখন বিশ্বমানের তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী তৈরিতে সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করে চলেছি। দেশের অর্থনীতির চাকা আজ ৩০ বছর পর হলেও অনেকটা সচল রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে আমরা শুধু ব্যবসাই করিনি, পাশাপাশি আমরা নিবিড়ভাবে কাজ করেছি স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশ বিনির্মাণে।’ নিজেদের অর্জনের কথা বলতে গিয়ে এমএস ইসলাম বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো দেশ এখন তথ্যপ্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে; ডিজিটাল বাংলাদেশের কর্মযজ্ঞ চলছে। আমাদের জন্য গর্বের বিষয়, দেশের একমাত্র ডিজিটাল হাইপার মেট্রোনেট তৈরি করছে ফ্লোরা লিমিটেড। দেশব্যাপী ২৬টি শাখা ও ৭০০ লোকের সরাসরি কর্মসংস্থান করতে সক্ষম হয়েছে ফ্লোরা।’ সামসুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে গত কয়েক বছর ধরে আমাদের প্রচেষ্টায় কম মূল্যে বেকার যুবকদের মাঝে ডিজিটাল স্টুডিও তৈরির প্রকল্প চালিয়েছি। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছে এই প্রকল্পের মাধ্যমে। নব্বইয়ের দশকে ফ্লোরা যে নেটওয়ার্কিং, ব্যাংকিং সফটওয়্যার সলিউশন, ডাটা সেন্টার, ভিস্যাট সলিউশন, ফাইবার নেটওয়ার্ক নিয়ে কাজ করেছে, আজ সবাই সেই পথেই হাঁটছে।’ দেশের বাজারে তথ্যপ্রযুক্তির পণ্য বাজারজাত করতে গিয়ে ফ্লোরা কেবল বিদেশি ব্র্যান্ডগুলো বাজারজাত করার মধ্যেই থেমে নেই। বরং তারা নিজস্ব ব্র্যান্ডের কম্পিউটার বাজারে আনতে সমর্থ হয়েছে। এমএস ইসলাম বলেন, ‘ফ্লোরা ব্র্যান্ড নামে আমরা নিজস্ব ব্র্যান্ডের কম্পিউটার বাজারজাত করছি। ডেস্কটপ, ল্যাপটপ আর অল-ইন-ওয়ান পিসি মিলিয়ে ৭০০-এর মতো মডেল আমরা বাজারে এনেছি। এগুলোর প্রায় প্রতিটিই ক্রেতাদের কাছে সমাদৃত হয়েছে।’ সময়ের সাথে সাথে ফ্লোরা যেমন মানুষের কাছে নতুন নতুন প্রযুক্তি পৌঁছে দিয়েছে, তেমনি নিজেরাও প্রযুক্তির সাথে তালমিলিয়ে আত্মীকরণ করেছে নতুন প্রযুক্তি। সামসুল ইসলাম বলেন, ‘পথ পরিক্রমায় ফ্লোরা এখন আরও আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর কোম্পানি হিসেবে পরিণত হয়েছে। ফ্লোরা দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অটোমেশন করে দিচ্ছে। নিজেরাই বা কেন পিছিয়ে থাকবে এই অনলাইনের যুগে! আর তাই আমরা চালু করেছি অনলাইনে ফ্লোরার পণ্যসামগ্রী ক্রয় করার সুযোগ। ফ্লোরার সব পণ্যই ক্রেতারা যেকোনো স্থান থেকে অনলাইনেই কিনতে পারবেন।’ এমএস ইসলাম বলেন, ‘দেশের তরুণ প্রজন্ম দ্রুত প্রযুক্তি নির্ভর হচ্ছে, আউটসোর্সিং ফ্রিল্যান্সিং করছে। তারা যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে, তাতে আমরা আশাবাদী, তারা আগামী ১০ বছরের মধ্যে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি থেকেও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনতে সক্ষম হবে তুলনামূলকভাবে আরও কম লোকবল ব্যবহার করেই। আমাদের শুধু দরকার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা, বিদ্যুত্ ও পরিবহন সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করা। এসব সমস্যার সমাধান করতে পারলে তরুণ প্রজন্ম তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করেই দেশকে এগিয়ে নিতে সমর্থ হবে।’