তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের রেলওয়েতে কর্মরত জয়নাল আবেদীন এবং তোফানো শেখ আজো পাননি শহীদের স্বীকৃতি। তাদের পরিবারের দিন কাটে অনাহারে-অর্ধাহারে। জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ পৌর শহরের ডালবাড়ি এলাকার বাসিন্দা সহযোগী ট্রেনচালক (ফায়ারম্যান) রেল শ্রমিক নেতা জয়নাল আবেদীন এবং তত্কালীন লোকো শেডে কর্মরত তোফানো মুক্তি সংগ্রাম পরিষদে যোগ দেন। বিষয়টি ওই এলাকার পিস কমিটির সদস্যসহ রাজাকার আলবদর বাহিনী জেনে যায়। ১১ এপ্রিল/৭১ তোফানো শেখ অন্যান্য দিনের ন্যায় ওইদিন সকালে রেলওয়ে লোকো শেডে কাজকর্ম শেষ করে দুপুরে বাড়িতে খেতে আসেন। রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা পাকসেনাদের সাথে নিয়ে তার বাড়ি ঘেরাও করে চোখ বেঁধে, টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যায়। এ সময় স্ত্রী তছিরন ও তার ৫ বছর বয়সী শিশু ছেলে তসলিমসহ অবুঝ দু’কন্যার চোখের সামনে তাকে জ্বলন্ত কয়লার ইঞ্জিনের আগুনে নিক্ষেপ করে ঢাকনার মুখ বন্ধ করে দিয়ে হত্যা করে। কথাগুলো বলেছেন তোফানোর একমাত্র পুত্র তসলিম উদ্দিন । স্বাধীনতার ৪১বছর পর তসলিম তার শিশুকালে নিজের চোখে দেখা এবং মায়ের কাছে শোনা পিতৃহত্যার করুণ কাহিনী বলতে গিয়ে ভয়ে কম্পিত হয়ে তিনি মনের অজান্তে আঁতকে উঠেন। অপরদিকে রেল শ্রমিক নেতা জয়নাল আবেদীনের স্ত্রী হাসনা বানু কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ১৯৭১ সালে ১০মে রাতে স্বামী জয়নাল আবেদীন (সহযোগী ট্রেনচালক ফায়ার ম্যান) প্রচণ্ড ঝড় উপেক্ষা করে ডিউটিতে যায়। কথা ছিল ডিউটি শেষে ভোর ৪ টায় তার বাড়ি ফেরার । কিন্তু তাদের জীবনে কাঙ্ক্ষিত আসা পূরণ হয়নি। দুই অবুঝ শিশুকে নিয়ে তিনি স্বামীর প্রত্যাশায় অসংখ্য রাত জেগে জেগে প্রহর গুণছেন কিন্তু আর সে ফিরে আসেনি। পরে জানতে পেরেছেন, তার স্বামীকে ওই রাতে রাজাকাররা দেওয়ানগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন থেকে ধরে নিয়ে বাহাদুরাবাদ ঘাটে যমুনা নদীতে গুলি করে লাশ ভাসিয়ে দিয়েছে। আজো সেই লাশ কিংবা তার কবরের সন্ধান মেলেনি। নিখোঁজ জয়নালের স্ত্রী হাসনা বেওয়া অতি দুস্থ যন্ত্রণা ও স্মৃতি বুকে নিয়ে বলেন, বর্তমানে দু’ ছেলেকে নিয়ে অনাহারে-আর্ধাহারে অতিকষ্টে দিনাতিপাত করছি। বর্তমানে দু’পরিবারের আভিযোগ স্বাধীনতার ৪১ বছর পরও চিহ্নিত আলবদর, রাজাকার হত্যাকারীদের বিচার হয়নি। দুটি পরিবারের আক্ষেপ তারা স্বাধীন দেশের মানুষের জন্য অত্মাহুতি দিয়েছেন। অথচ আজও তাদের পরিবারবর্গের প্রতি দেয়া হয়নি রাষ্ট্রীয় কোন স্বীকৃতি, দেয়া হয়নি তাদের শহীদের মর্যাদা । এ পর্যন্ত ওই শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্রতি কোন সহানুভূতি, না দিয়েছে কোন সরকারি-বেসরকারি অনুদান।
