যেভাবে শুরু: একাত্তর সালের ১০ মার্চ বিশিষ্ট ব্যক্তি আহম্মদ হোসেন সরকার ও আহাম্মদ আলী বকসীকে যুগ্ম আহবায়ক করে কুড়িগ্রাম মহুকুমা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। তাদের নেতৃত্বেই কুড়িগ্রামের মুক্তিকামী মানুষ যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে।
১৭ মার্চ স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতাদের উদ্যোগে কুড়িগ্রামের সবুজপাড়াস্থ চিলড্রেন পার্কে তত্কালীন ডিএসপি দারোগার শিশুপুত্র তুষারকে দিয়ে প্রথম বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত স্বাধীন দেশের পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করা হয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন-তত্কালীন ছাত্রনেতা শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, আমিনুল ইসলাম, রওশন বারী, রুকুনুদ্দৌলা মন্ডল প্রমুখ।
১৮ মার্চ তত্কালীন মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়ের ছাদ থেকে পাকিস্তানি পতাকা পোড়াতে গিয়ে গ্রেফতার হন- সৈয়দ মনসুর আলী টুংকু, জোবেদ আলী সরকার, আব্বাস আলী, সুজাম ও খোকন ঘোষ। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে হানাদার বাহিনী রাজধানীতে নির্মম হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে ২৮ মার্চ কুড়িগ্রাম সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্বে স্থানীয় গওহর পার্ক মাঠে এক বিশাল জনসমাবেশের আয়োজন করা হয়। সেখান থেকেই আহাম্মদ আলী বকসী, অধ্যাপক হায়দার আলী, তাছাদ্দুক হোসেন, আমিনুল ইসলাম মন্ডল, আক্তারুজ্জামান মন্ডল, রওশনুল বারী, প্রফেসর হায়দার আলী, মৃত আব্দুস সামাদ, মৃত এটিএম আফজাল হোসেন দুলাল, মহিউদ্দিন আহাম্মদকে নিয়ে একটি বেসরকারি হাইকমান্ড গঠন করা হয়। তাদেরই নির্দেশে বিভিন্ন থানা থেকে গোলাবারুদ, অস্ত্র সংগ্রহ করে পুলিশ, আনসার ও ছাত্রদের মধ্যে সেগুলো বিতরণের মাধ্যমে কুড়িগ্রাম অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়।
৩০ মার্চ রংপুরের ইপিআর উইং-এর ক্যাপ্টেন নওয়াজেস উদ্দিন এবং নায়েক সুবেদার বোরহান উদ্দিন ইপিআর সহযোদ্ধাদের নিয়ে কুড়িগ্রামে আসেন। এখানকার স্থানীয় পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ, ছাত্র-জনতা এবং ইপিআরদের নিয়ে একটি সম্মিলিত বাহিনী গড়ে তোলা হয়। সেসময় টোগরাইহাটের আওয়ামী লীগ নেতা আহম্মদ হোসেন সরকারের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের হেড কোয়ার্টার স্থাপন করা হয়। অন্যদিকে সেনাবাহিনীর সুবেদার আলতাফ ১৭ জন সহযোদ্ধাকে নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারে রৌমারীর যাদুর চরে অবস্থান নিয়ে স্থানীয় যুবকদের যুদ্ধের কলাকৌশল শেখাতে থাকেন।
পাক বাহিনীর আক্রমণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ: ১ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ ঠেকাতে তিস্তা ব্রীজের পূর্ব পাড়ে মুক্তিযোদ্ধারা একটি শক্তিশালী ঘাঁটি গড়ে তোলে। পরদিন সেখান থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা তিস্তা নদীর কাউনিয়া অঞ্চলে হানাদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে।
৭ এপ্রিল পাক বাহিনী সাঁজোয়া বহর নিয়ে লালমনিরহাট ও রংপুর থেকে একযোগে গুলিবর্ষণ করতে করতে কুড়িগ্রাম শহরের দিকে এগুতে থাকে। বিকেলের দিকে পাক বাহিনী কুড়িগ্রাম শহরে প্রবেশ করে বর্তমান সার্কিট হাউজের সামনে পজিশন নিয়ে গোলাবর্ষণ শুরু করে। এসময় কুড়িগ্রাম জেলখানার কর্তব্যরত ইনচার্জ ও ৫ জন সিপাহীকে পাক বাহিনী বর্তমান সার্কিট হাউজের সামনের রাস্তায় কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে। শহীদ হন লাল মোহাম্মদ, আনসার আলী, সাজ্জাদ আলী ও জহির উদ্দিন। গুরুতর আহত জেলা ইনচার্জ শেক হেদায়েত উল্লাহ রাত ১১টার দিকে মারা যান। গুরুতর আহত সিপাহী আব্দুল জলিলের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। পাকবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে ঐদিনই কুড়িগ্রাম শহর ছেড়ে তিস্তার দিকে ফেরত চলে যায়।
১৪ এপ্রিল পাক বাহিনী কুড়িগ্রাম আক্রমণ করে কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে শহরের দখল নিতে ব্যর্থ হয়। ফেরার পথে পাক বাহিনী সফর ডাক্তারের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে এবং ডাঃ ছফর উদ্দিন, আব্দুল লতিফ, সাহাবুদ্দিনসহ কয়েকজনকে হত্যা করে টোগরাইহাটে এক ইটভাটায় আশ্রয় নেয়। এরপর রাতভর চলে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে গুলি বিনিময়।
১৫ এপ্রিল সকালে পাক বাহিনী তিস্তার দিকে পিছু হটে এবং যাওয়ার সময় দু’ধারের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
দখল হলো কুড়িগ্রাম: ২০ এপ্রিল পাক বাহিনী তিনদিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমণ চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ ভেঙ্গে সন্ধ্যার দিকে কুড়িগ্রাম শহর দখল করে। এরপর পাক বাহিনী এদেশীয় দালালদের সহযোগিতায় ২৭ ও ২৮ মে নাগেশ্বরী ও ভুরুঙ্গামারী দখল করে নেয়। ছত্রভঙ্গ মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতের সাহেবগঞ্জ সোনাহাট এলাকায় সংঘবদ্ধ করা হয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টা আক্রমণ: ২২ এপ্রিল ভোরবেলা মুক্তিযোদ্ধারা নাগেশ্বরীর রায়গঞ্জ ব্রিজটি বোমা বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেয় এবং ধরলা নদীর পূর্বপাড়ে প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তোলে।
২৪ এপ্রিল ভুরুঙ্গামারী সদর ও ভুরুঙ্গামারীর সোনাহাট হাইস্কুলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শিবির খোলা হয়। আগষ্ট মাসব্যাপী মুক্তিযোদ্ধারা পাক বাহিনী এবং এদেশীয় দালাল দোসরদের বিরুদ্ধে গেরিলা আক্রমণ জোরদার করে। সম্মুখ যুদ্ধ হয় বেশ কয়েকটি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১ আগষ্ট চিলমারী ও আন্ধাড়ীঝাড় অপারেশন, ১৪ আগষ্ট সোনাহাট ব্রীজে সম্মুখ যুদ্ধ, দুর্গাপুর অপারেশন, গাগলা অভিযান, পাঁচগাছিতে রাজাকার আটক অভিযান, রায়গঞ্জ অপারেশন ইত্যাদি।
পাক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ: কুড়িগ্রামের বিভিন্ন গ্রামে বিপুল সংখ্যক নারী পাক বাহিনীর হাতে সম্ভ্রম হারান। উলিপুরের হাতিয়া, কুড়িগ্রাম সদরের কাঁঠালবাড়ীতে পাক বাহিনী ও তাদের দোসররা চালায় নির্বিচার গণহত্যা। ১৩ নভেম্বর উলিপুরের হাতিয়ায় গুলি করে, পুড়িয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে ৬৯৭ জন নারী-পুরুষ-শিশুকে। ভুরুঙ্গামারীর সিও অফিস, রায়গঞ্জ ব্রিজের ক্যাম্প, কুড়িগ্রাম শহরের রিভার ভিউ হাইস্কুল ও সিএন্ডবি ডাকবাংলোয় পাক বাহিনী গড়ে তোলে নির্যাতন শিবির। এসময় এ অঞ্চলের প্রায় ৩ লাখ মানুষ ভারতে বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়।
অবশেষে মুক্তি: ব্রিগেডিয়ার জসির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ষষ্ঠ মাউন্টেন্ড ডিভিশনের সহযোগিতায় মুক্তিবাহিনী পাক হানাদারদের উপর পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে ১৪ নভেম্বর ভুরুঙ্গামারী, ২৮ নভেম্বর নাগেশ্বরী এবং ৩০ নভেম্বর গোটা উত্তর ধরলা হানাদার মুক্ত করে। ৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা কুড়িগ্রাম শহর ঘিরে ফেলে পাক বাহিনীর উপর আক্রমণ শুরু করলে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পেরে ৬ ডিসেম্বর বিকেল ৩টার দিকে পাক বাহিনী গুলি করতে করতে ট্রেনযোগে কুড়িগ্রাম শহর ত্যাগ করে রংপুরের দিকে পালিয়ে যায়। হানাদারমুক্ত হয় কুড়িগ্রাম। ঐ দিনই কোম্পানি কমান্ডার আব্দুল হাই সরকারের নেতৃত্বে ৩৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল শহরে প্রবেশ করে বিকেল ৪টায় নতুন শহরস্থ ওভারহেড পানির ট্যাংকের উপর স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে।
খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা: লেঃ আবু মঈন মোঃ আসফাকুস সামাদ বীর উত্তম (মরণোত্তর), শওকত আলী (বীর বিক্রম), সৈয়দ মনছুর আলী টুংকু (বীর বিক্রম), বদরুজ্জামান (বীর প্রতীক), আব্দুল হাই সরকার (বীর প্রতীক), আব্দুল আজিজ (বীর প্রতীক) এবং তারামন বিবি (বীর প্রতীক)।
বীর প্রতীক তারামন বিবির কথা: বীরপ্রতীক তারামন বিবির শেষ ইচ্ছা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তিনি জীবদ্দশায় দেখে যেতে চান। তিনি চান এ অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখতে একটি জাদুঘর স্থাপন করা হোক। তাকে দেশবাসী যে সম্মান দিয়েছে এজন্য তিনি চিরকৃতজ্ঞ।
কুড়িগ্রাম জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের বক্তব্য: কুড়িগ্রাম জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম টুকু বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা আজো অবহেলিত। তাদের পরিবারগুলো দৈনদশায় নিপতিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সন্মানী ভাতা নিয়মিত করার পাশাপাশি ন্যূনতম ৬ হাজার টাকা করা প্রয়োজন। এছাড়া তাদের জন্য সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিডিআরের মতো প্রতিমাসে রেশনিং সুবিধা দেয়াও প্রয়োজন।
