গৌরবোজ্জ্বল ’৭১-এ রায়পুরার কৃতী সন্তানদের অবদান

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৪০
মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ বিশেষ অবদান, সাহসিকতাপূর্ণ বীরত্ব ও জীবন ত্যাগের জন্য নরসিংদী জেলার বীর কৃতী সন্তানরা ৯টি রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভূষিত হন। এর মধ্যে রায়পুরার কৃতী সন্তানরা ১টি বীরশ্রেষ্ঠ (মরণোত্তর), ১টি বীর উত্তম, ২টি বীর বিক্রম ও ২টি বীর প্রতীক অর্জন করেন। এ যুদ্ধে পাকহানাদার বাহিনীর নির্মমতার শিকার হয়ে রায়পুরার ৩৭ জন বীর সন্তান শহীদ হন। রায়পুরার বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শহীদ মতিউর রহমান, বীর উত্তম ব্রিগ্রেডিয়ার ক্যাপ্টেন এ এন এম নূরুজ্জামান, বীর বিক্রম সুবেদার খন্দকার মতিউর রহমান, বীর বিক্রম শহীদ মো. শাহাবুদ্দিন, বীর প্রতীক লে. কর্নেল নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া ও বীর প্রতীক হাবিলদার মো. মোবারক হোসেন রাষ্ট্রীয় খেতাব পাওয়ায় রায়পুরাবাসী তাদের নিয়ে গর্ববোধ করে। তাদের ত্যাগ-তিতিক্ষার ফলে ১০ ডিসেম্বর রায়পুরা হানাদারমুক্ত হয়। সেক্টর কমান্ডার বীর উত্তম ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামানের নেতৃত্বে ৫নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের কবল থেকে গৌরবোজ্জ্বল বিজয় ছিনিয়ে আনেন। ৭ এপ্রিল রায়পুরায় সংগঠিত হয়েছিল সর্বদলীয় প্রশিক্ষণ। ১৩ এপ্রিল বেলাবোর বড়িবাড়ী এলাকায় পাকসেনাদের বিরুদ্ধে ৮ ঘণ্টাব্যাপী মুখোমুখি যুদ্ধ হয়। ১৪ এপ্রিল রায়পুরা থানায় অস্ত্রাগার লুট হয়। এতে অংশ নিয়েছিলেন রায়পুরা উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি আফজাল হোসাইন, তত্কালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি প্রয়াত জালালউদ্দিন আহমেদ ও সেক্রেটারি হারুনুর রশীদ। খবর পেয়ে ১৮ মে পাকবাহিনী রায়পুরায় প্রবেশ করলে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের কার্যক্রম। এতে স্থবির হয়ে পড়ে যাবতীয় চিন্তা-ভাবনা। পরবর্তীতে স্থানীয় এমপি প্রয়াত আফতাব উদ্দিন ভুঁইয়া, প্রয়াত গয়েছ আলী মাস্টার, রায়পুরার বর্তমান এমপি রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু, তত্কালীন ন্যাপের (ভাসানী) আব্দুল আলী মৃধা, তত্কালীন ছাত্রনেতা নুরুল ইসলাম কাঞ্চন, ন্যাপ, সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়নের অন্যতম সংগঠক, রাজনীতিবিদ ফজলুল হক খোন্দকারের নেতৃত্বে ৮টি গ্রুপকে ভারতের তেজপুর থেকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে মুক্তিযোদ্ধারা বীর বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েন মহিষমারা রেলওয়ে সেতু, দৌলতকান্দি, নলবাটা প্রভৃতি স্থানে। তত্কালীন রায়পুরার অন্তভুক্ত বর্তমান বেলাবো উপজেলার উজিলাব গ্রামের আ.হাইয়ের বাড়িট মিনি ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পায় এবং আ. হাই মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে মেজর হাই নামে পরিচিতি পান। ঢাকা থেকে আগত তিন শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও পুলিশের লোকজন এখানে সমবেত হন। ১৮ অক্টোবর ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ের মির্জানগর ইউনিয়নের বাঙ্গালীনগরে অবস্থিত ৫৫নং রেল সেতুতে দুই ঘণ্টাব্যাপী সম্মুখযুদ্ধ হয়। এতে ৬ জন পাকসেনা নিহত হয়। এছাড়াও ৩৩ জন পাকসেনা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এ আক্রমণে নেতৃত্ব দেন লতিফ কমান্ডার, কমান্ডার জয়ধর আলী, কাজী হারুন, প্রয়াত ইদ্রিস হালদার প্রমুখ। ৭ নভেম্বর পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখ রণাঙ্গনে প্রচণ্ড যুদ্ধ করে শহীদ হন চট্টগ্রামের রাউজানের সুবেদার বশর, রায়পুরার মরজাল গ্রামের সার্জেন্ট আ. বারি, খাকচক গ্রামের এয়ারফোর্সের নুরুল হক, রাজনগর গ্রামের বেঙ্গল রেজিমেন্টের সোহরাব। এছাড়াও কাজী হারুন-অর-রশিদ, রাজনগর গ্রামের সুবেদার (ইপিআর) জয়দর আলী ভুঁইয়া ও ইদ্রিস হাওলাদারের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। কবি শামসুর রাহমান, সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত মহিউদ্দিন আহমেদ, ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ, ফিরোজ আল মুজাহিদ, আজিজুল হক ভুঁইয়া কবিতা, গান রচনা করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রচারের ব্যবস্থা করে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করেন। এছাড়াও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাবুদ্দিন, শহীদ সাদত আলী মোক্তার, মেজর মাইনুদ্দিন, আব্দুল কাদির মাস্টার, শাহজাহান খানের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। বিজয়ের মাসে রায়পুরাবাসী গভীরভাবে স্মরণ করেন যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা শহীদ বশির, দুদুসহ আরো অনেককে। দীর্ঘ ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে সেক্টর কমান্ডারগণ ছাড়াও বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন কমরেড শামসুল হক। অবশেষে ১০ ডিসেম্বর মুক্ত হয় রায়পুরা। বিশেষ অবদানের জন্য রণাঙ্গনের কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মাননা দেয়া হয়।