গাছ, লতা-পাতা, ঘন সবুজে ঘেরা বন-জঙ্গল। এর মাঝে একজোড়া নর-নারী নগ্ন অবস্থায়। নারীটি পুরুষটিকে পিছন দিক থেকে আলিঙ্গন করে আছেন, এটাই নারীটির শরীরের একমাত্র পর্দা। এক হাতে তিনি পুরুষটিকে জড়িয়ে ধরেছেন আর বাম হাতে একটি আপেল ফল ধরে রেখেছেন। অন্যদিকে পুরুষটি তার ডান হাতে নারীটির পা জড়িয়ে রেখেছেন, আর বাম হাতটি ছড়িয়ে রেখেছেন। পুরুষটির শরীরের পর্দা বলতে শুধু গাছের পাতা দিয়ে নিচের অংশবিশেষ ঢাকা। ‘ফিল দ্য অরিজিন্যাল পাওয়ার অফ ম্যাসকুলিন ফ্যাগন্যান্স’ শিরোনামে লেখা: ‘উইথ ইটস উডি নোট, কুল অরিজিন্যাল ইস দ্য ফ্যাগন্যান্স দ্যাট হেল্পস ইউ গেট ব্যাক ইয়োর ট্রু আইডেনটিটি অ্যাজ এ ম্যান।’
কারওয়ানবাজার থেকে কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ ধরে বাংলামোটরের দিকে যেতে রাস্তার পাশে একটি বিলবোর্ডে মাসখানেক ধরে এই বিজ্ঞাপনটির প্রদর্শন চলছে। পল্টনে অফিস হওয়ায় এই রাস্তার আমি নিয়মিত পথচারী। আর এই সূত্র ধরেই বিজ্ঞাপনটির নিত্য দর্শক হয়ে উঠেছি।
কোনো বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন নেই, সাদামাটাভাবেই বোঝা যায়, বিজ্ঞাপনটির আবহ, টেক্সট, উপাদান, সর্বোপরি সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপনটি স্রেফ যৌনতাকেই উসকে দিচ্ছে। বিজ্ঞাপনটির বার্তা থেকে এটা বোঝা গেলো, পুরুষের আদি পরিচয় হলো সে বন্য, হিংস্র। যৌনতা তার এই পরিচয়কে আরো দৃঢ় করে। নারীটির হাতে ধরা আপেল ফলটি বিজ্ঞাপনটির যৌনতা-উপাদানকেই পাকাপোক্ত করছে। তারুণ্য, যৌবন, যৌনতা— এসব বিষয়কে নির্দেশ করতে এই ফলটির ব্যবহার বেশ পুরোনো।
যৌনতাকে ব্যবহার করে বাংলাদেশে বিজ্ঞাপনের অভাব নেই। কিন্তু এই বিজ্ঞাপন যেন সেই তালিকায় নতুন পালক সংযোজন করেছে। আমাদের এই সমাজে এখনও বাবার সামনে ছেলে ধূমপান করতে ইতস্তত করে এমনকি খায়ও না। বিবাহিত একজন নারী জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খান কিছুটা অগোচরেই। এমন একটি সংস্কৃতিতে জনপরিসরে উপস্থাপিত কোনো বিজ্ঞাপনে নর-নারীর যৌনতাকে, নগ্নতাকে এতোটা স্পষ্ট, দৃঢ়ভাবে উপস্থাপনের নমুনা বোধকরি বাংলাদেশে এটাই প্রথম।
এই সমাজে নারীদের প্রতিনিয়ত অনিরাপত্তাজনিত নানা ধরনের ইস্যু নিয়ে লড়াই করতে হয়। এই যুদ্ধের জন্যই নারীকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্টেরিওটাইপ এবং গৌণ চরিত্রে দেখা যায়। আর এজন্যই এই সমাজ নারীদেরকে নিয়ন্ত্রণেও রাখে এসব ভ্রান্ত চিত্রায়ন এবং বিষয়গুলো দিয়েই। এই বিজ্ঞাপনে পুরুষকে দেখানো হয় বলিষ্ঠ ও কামুক হিসেবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নারীকে এখানে দেখানো হয়েছে পুরুষের সঙ্গ কামনায় প্রবলভাবে লালায়িত হিসেবে। এই বিজ্ঞাপনটির উদ্দেশ্য হলো, পুরুষের ব্যবহার করা ডিওডের্যান্ড বিক্রি করা। কিন্তু একইসঙ্গে এটা সমাজে নারী সম্পর্কে বিদ্যমান থাকা অগৌণ অবস্থানকে আরো পাকাপোক্ত করছে।
প্রথম যেদিন বিলবোর্ডটি আমার নজরে এসেছিল, সেদিন আমি শুধুই বিস্মিত হয়েছি। এরপর থেকে রোজ আমি বিজ্ঞাপনটি দেখি আর আফসোস হয় আমার সংস্কৃতির জন্য। আমার বাংলাদেশের জন্য। পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফাল্গুন, বসন্তের প্রথম দিন— এতো বর্ণিল, স্নিগ্ধ, মায়াময় সংস্কৃতির দেশে এটা কী! আমার করুণা হয় তাদের জন্য যারা বাঙালির এতো বর্ণাঢ্য সংস্কৃতিকে অনুভব করতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে সাদা শাড়ি লাল পাড়, ফাল্গুনে হলুদ শাড়ি কিংবা রবীন্দ্রনাথের সাদা পাটভাঙা শাড়ির লাবণ্যদের স্নিগ্ধতার এই বাংলায় এটা কোন সংস্কৃতি?
ঢাকা
