ইউনিপে টু ইউ, ডেসটিনি, যুবকসহ বিভিন্ন মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) প্রতিষ্ঠানে অর্থ লগ্নি করে সর্বস্বান্ত হয়েছে দেশের অন্তত ৭০ লাখ গ্রাহক। সরকারি হিসাবে এমএলএম ব্যবসার নামে ১১টি প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। তবে ইউনিপে টু ইউ, ডেসটিনি, যুবক—এ তিনটি প্রতিষ্ঠানেই ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি লগ্নি করা হয়েছে বলে এদের গ্রাহকরা অভিযোগ করেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের প্রতিবেদন অনুসারে প্রায় এক কোটি গ্রাহক এমএলএম প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীদের বেশিরভাগই স্বল্প আয় ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা। অর্থ লগ্নিকারীদের অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। গ্রাহকরা অভিযোগ করছেন, এমএলএম ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা টাকার ৮০ ভাগই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।
ক্ষতিগ্রস্তরা এসব টাকা উদ্ধারের জন্য নিয়মিতভাবে সরকারের কাছে তাগাদা দিচ্ছে। এরপরও অজ্ঞাত কারণে এসব টাকা উদ্ধারের ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না বলে ক্ষতিগ্রস্তরা অভিযোগ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, স্ব স্ব এমএলএম কোম্পানির কার্যালয়ে নিয়মিত ধরনা দিচ্ছেন তারা, কিন্তু কোথাও কোনো সমাধান পাচ্ছেন না।
সূত্রমতে, ডেসটিনি, যুবক, ইউনিপে টু ইউ, ইউনিগেট ওয়ে টু ইউ, ইউনি রুট ফাইন্যান্স, মা পলিকম লিমিটেড, ইজেন্ট ইন্টারন্যাশনাল, র্যাবন এক্স, ল অ্যাট ভিশন এবং পিক এশিয়া অনলাইন বাংলাদেশ লিমিটেডে অর্থ লগ্নিকারীরা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে এমএলএম প্রতিষ্ঠান ৬২টি। এর মধ্যে এ পর্যন্ত ৫৫টির বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ এসেছে। দুদক সূত্র বলছে, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। বর্তমানে ডেসটিনিসহ এগারটি এমএলএম প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত চলছে। সূত্রটি জানায়, অনুসন্ধানে ডেসটিনির বিরুদ্ধে তিন হাজার ২৮৫ কোটি ২৬ লাখ ৮৮ হাজার ৫২৪ টাকা, ইউনিপে টু ইউ বিডির বিরুদ্ধে এক হাজার ২০০ কোটি ৭৪ লাখ ৮৫ হাজার ৮৬ টাকা, ইউনিগেটওয়ে টু ইউ ট্রেডিং প্রাইভেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে ২৯ কোটি ২২ লাখ ৪০ হাজার ২২৭ টাকা, ইউনি রুট ফাইন্যান্স অ্যান্ড কমার্স লিমিটেডের বিরুদ্ধে ১৬ কোটি তিন লাখ ৭৯ হাজার ৫৩০ টাকা, মা পলিকম লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৩৪ কোটি ৭৮ লাখ ৬৮ হাজার ৫০৮ টাকা, স্পিক এশিয়া নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ২৫০ কোটি টাকা ও ইজেন্ট ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৫১ লাখ ২৯ হাজার টাকা পাচারের অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে। এছাড়া রেভেঞ্জ বিডি লিমিটেড দুই হাজার কোটি টাকা, নিউওয়ে ১০ হাজার কোটি টাকা, গ্লোবাল নিউওয়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা, এইমওয়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা, ভিকন দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা, আর্থ ডিস্ট্রিবিউশন বিডি লিমিটেড এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা, টিভিআই এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা, আইডিয়া এক হাজার কোটি টাকা, ওশানা বিডি লিমিটেড ৩০০ কোটি টাকা, ফোরেঞ্জ শেয়ার ৫০ কোটি টাকা, ফোরেঞ্জ এলএলসি ৩০০ কোটি টাকা ও স্বদেশ বাংলা গ্রুপ গ্রাহকদের ২০০ কোটি টাকা পাচার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইতিমধ্যে ডেসটিনিসহ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক।
অপরদিকে ইউনিপে টু ইউতে বিনিয়োগ করা ছয় হাজার কোটি টাকার কোন হদিস পায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। ইউনিপের কর্মকর্তাদের জব্দ করা ব্যাংক হিসাবে পাওয়া গেছে মাত্র ৪২১ কোটি টাকা। ওই টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে গচ্ছিত রয়েছে। বাকি টাকা উদ্ধারের ব্যাপারে সরকারি কোন উদ্যোগ নেই।
ডেসটিনি গ্রুপের সব ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে সরকার। কিন্তু এসব হিসাবে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের কোনো অর্থ পাওয়া যায়নি। ডেসটিনি গ্রুপের অনিয়ম, দুর্নীতির তদন্ত ও প্রশাসক নিয়োগের বিষয়ে ধীরে চল নীতি নিয়েছে সরকার।
পাচার করা অর্থের অনুসন্ধান ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ ছয়টি সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত কমিটিও ঝিমিয়ে পড়েছে।
প্রশাসক নিয়োগ ও তদন্ত প্রক্রিয়ার মন্থর গতি সম্পর্কে বাণিজ্য সচিব মাহাবুব আহমেদ জানান, বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এমএলএম আইন চূড়ান্ত করে সে আইন অনুযায়ী প্রশাসক নিয়োগ করা হবে। অপরদিকে ডেসটিনি গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নিরীক্ষণ নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।
আইনি বাধার কথা উল্লেখ করে অডিট অধিদপ্তর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের বাইরে কোন প্রতিষ্ঠান নিরীক্ষণের এখতিয়ার তাঁদের নেই। এছাড়া বেসরকারি কোন প্রতিষ্ঠান নিরীক্ষণ করতে হলেও সেই প্রতিষ্ঠানে সরকারের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা থাকতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে তাও নেই। ফলে নিরীক্ষণ নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
যুব কর্মসংস্থান সোসাইটির (যুবক) ক্ষতিগ্রস্তরা বিনিয়োগ ফেরত না পেয়ে পথে বসে পড়েছেন। যুবকের সম্পত্তি বিক্রি করে গ্রাহকদের পাওনা ফেরতের ক্ষমতা প্রদানের বিষয়ে যুবক কমিশনের প্রস্তাবেও সাড়া দেয়নি অর্থ মন্ত্রণালয়। যুবক কমিশন চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, যুবকের সম্পত্তি বিক্রি ছাড়া তার গ্রাহকদের পাওনা ফেরত দেয়া সম্ভব নয়।
