আস্থা ফেরেনি শেয়ারবাজারে। ২০১০ সালে ধস শুরু। এ বছরও দরপতনের মধ্য দিয়েই কেটেছে শেয়ারবাজার। দিনের পর দিন পতনের ফলে বাজারের সূচক তলানিতে নেমে এসেছে। বেশিরভাগ কোম্পানির দাম চলে এসেছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এ সময়কে বিনিয়োগের উপযুক্ত সময় বিবেচনা করা হলেও বিনিয়োগকারীদের হাতে টাকা নেই। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগ করতে পারছেন না টাকার অভাবে। ফলে বাজারের লেনদেন নেমে গেছে অনেক নিচে। ২০১০ এ যেখানে দৈনিক (গড়) আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার কোটি টাকা লেনদেন হত, সেখানে বর্তমানে লেনদেন হচ্ছে (গড়) আড়াইশ থেকে তিন শত কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, শেয়ারবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কম করে হলেও বিশ লাখ। যাদের অনেকেই বড় অঙ্কের বিনিয়োগ হারিয়ে এখন প্রায় নিঃস্ব। ইতিমধ্যে তিনজন বিনিয়োগকারী আত্মাহুতি দিয়েছেন টাকা হারানোর শোকে। এর মধ্যে এ বছরই আত্মাহুতি দিয়েছেন দুইজন। আগামী নির্বাচনে শেয়ারবাজার ধসের প্রভাব পড়তে পারে এই আশঙ্কা আওয়ামী লীগকে ভাবিয়ে তুললেও বাজার উন্নয়নে তাদের তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসিও (সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন) এগুচ্ছে ধীর গতিতে। এদিকে একের পর এক দর পতনে বিনিয়োগকারীদের আস্থার ভরাডুবি হয়েছে। তার উপর ব্যাংকার এবং বীমা ও ব্যাংক মালিকরা যেসব প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাস দিয়েছিলেন তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় আস্থার অভাব আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে এসইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকও এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কিংবা প্রতিশ্রুতি দেয়ার বিষয়ে তাদেরকে জবাবদিহিতার মধ্যে নিয়ে আসতে পারেনি। খোদ এসইসি যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, তার সব ধাপ বাস্তবায়নেও সফলতার পরিচয় দিতে পারেনি এসইসি। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা শেয়ারবাজারের সূচকের মতোই তলানিতে নেমে এসেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, শেয়ারবাজারে ২০১০ সালের ধসে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের সর্বশেষ পুঁজিটুকুও হারিয়ে গেছে এ বছর। ২০১০ এর পতনের পর গত এপ্রিলে ডিএসই’র সূচক সাড়ে পাঁচ হাজারে উঠে আসে। এর পর পুনরায় তা কমতে কমতে গত মাসে ৪ হাজারের নিচে নেমে যায়। বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই বছরে নতুনভাবে যারা বিনিয়োগ করেছেন, তারাও বড় অঙ্কের লোকসানের মধ্যে রয়েছেন। তাই বিনিয়োগকারীদের আস্থা একেবারেই নিম্ন পর্যায়ে চলে এসেছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্যে দেখা গেছে, ২০১০ সালের ৬ ডিসেম্বর বাজারে সর্বোচ্চ পিই অনুপাত (প্রাইস আর্নিং রেশিও) ছিল ২৯ দশমিক ১৬। অর্থাত্ এ সময় বাজারে বিনিয়োগ করলে মুনাফা দিয়ে মূলধনের টাকা আসতে সময় লাগবে ২৯ বছরেরও বেশি সময়। বিশ্লেষকরা বলছেন, পিই অনুপাত যত বেশি বিনিয়োগ ততো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। ২০১০ এ বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও আস্থার কারণেই বিনিয়োগ এসেছে। তথ্যে দেখা গেছে, বর্তমানে বাজারে পিই অনুপাত নেমেছে ১৩.৫০-এ। এ অবস্থাকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের উপযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বাজারে খুব একটা ক্রেতা নেই। ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা বেশিরভাগক্ষেত্রেই পুঁজি হারিয়ে বসে আছেন। আর নতুনরা বাজারে আসার ভরসা পাচ্ছেন না। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও ভালো নেই। মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর পুঁজি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাজারে আটকে আছে। তাই তারা নতুন বিনিয়োগ করতে পারছেন না। মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো নিজেরাই লোকসানের মধ্যে রয়েছে। তার উপর ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের সুদ মওকুফ করতে গিয়ে বড় অঙ্কের টাকা গুণতে হচ্ছে। তাই মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোও বিনিয়োগ করতে পারছে না। বড় বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে একমাত্র ব্যাংকগুলোর। তবে সুযোগ থাকলেও ব্যাংকগুলো বিনিয়োগে আসছে না। এর বড় কারণ হলো আস্থার সঙ্কট। ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের ব্যাপারে সমপ্রতি এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সভাপতি নুরুল আমিন বলেন, ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করতে পারে। তবে আস্থার অভাব থাকায় বিনিয়োগ করা যাচ্ছে না।
বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, এ বছর শেয়ারবাজারে বেশ কয়েকটি প্রাথমিক গণ প্রস্তাব (আইপিও) উচ্চ প্রিমিয়ামে এসেছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা প্রভাবিত হয়। এক পর্যায়ে কয়েকটি কোম্পানি আইপিওতে বাজারে আসার পর শেয়ারের দাম ফেসভ্যালুরও নিচে নেমে যায়। ফলে আইপিও পেয়েও ক্ষতিগ্রস্ত হন বিনিয়োগকারীরা। এতে প্রাইমারি মার্কেটের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অনেকাংশে কমে যায়। এছাড়া মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিধিমালার সংশোধনী চূড়ান্ত করা নিয়ে এসইসি’র দীর্ঘসূত্রতাকে পুঁজি করে এ খাত থেকে একটি শ্রেণী টাকা তুলে নিয়ে যায়। এ বিষয়গুলো এসইসি’র ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
শেয়ারবাজারে আস্থার সঙ্কটের একটি বড় কারণ হলো বাজার নিয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বাজে মন্তব্য। শেয়ারবাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়া সত্ত্বেও বাজার নিয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এ ধরনের মন্তব্য বাজারকে প্রভাবিত করেছে। শেয়ারবাজার নিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সবচেয়ে আলোচিত মন্তব্যটি এসেছে এ বছর। চলতি বছরের ১০ জুন শেয়ারবাজারকে ‘দুষ্টু বাজার’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেছিলেন, এই বাজার নিয়ে চিন্তা না করলেও আমার অর্থনীতির কোনো ক্ষতি হবে না। শেয়ারবাজার নিয়ে অর্থমন্ত্রীর এ ধরনের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মাত্র ৮ দিনের ব্যবধানে ডিএসই সূচক ৪৩০ পয়েন্ট কমে যায়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শিল্প বিনিয়োগের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি তোলার মাধ্যম হিসেবে পরিচিত শেয়ারবাজারে মন্দার কারণে এ খাত থেকে টাকা তোলা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যাংকগুলোতেও পর্যাপ্ত ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় দেশের শিল্পায়নের লক্ষ্যে শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই। অর্থনীতিতে শেয়ারবাজারের গুরুত্ব অবশ্যই স্বীকার করতে হবে।
এ বছর পুঁজিবাজারের ইতিবাচক দুটি পদক্ষেপ সম্পাদন করা হয়েছে। যার জন্য সরকার প্রশংসার দাবিদার। এর মধ্যে অন্যতম হলো এসইসি আইন অনুমোদন। গত ৯ অক্টোবর পুঁজিবাজারসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান রেখে এসইসি (সংশোধন) আইনের খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এ ছাড়া সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধিত) আইন, ২০১২-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। আইনের বিধান অনুযায়ী, শেয়ারবাজারের বিষয়ে তদন্তের প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানিয়ে যে কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। এছাড়া সাংগঠনিক কাঠামোর ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় নিয়োগও এসইসি নিজেই দিতে পারবে। এতে করে বর্তমানে এসইসির তদারকির জন্য লোকবল সঙ্কট নিরসনের সুযোগ পেয়েছে এসইসি। আইনের ফলে এসইসি বেশ কিছু বিষয়ে অধিক কর্তৃত্ব পায়। প্রশংসনীয় দ্বিতীয় পদক্ষেপটি নেয়া হয় চলতি মাসের ১৭ তারিখে। এদিন এসইসিতে বহুল প্রত্যাশিত সার্ভিল্যান্স সফটওয়্যার উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী। এর মাধ্যমে এসইসি সরাসরি তাত্ক্ষণিকভাবে ডিএসই এবং সিএসইতে তদারকি করতে পারবে। এ সফটওয়্যারটি দামের অতিরিক্ত ওঠানামা, শর্টসেল, ইনসাইডার ট্রেডিং, সিরিয়াল ট্রেডিংসহ ৩০ থেকে ৪০ ধরনের অনিয়ম শনাক্ত করতে সক্ষম হবে। বাজারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহীতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য এ সফটওয়্যার স্থাপনের দাবি ছিল সব মহলের।
(আগামীকাল পড়ুন: গার্মেন্টস ও রেমিটেন্স: ক্রান্তিকালে অর্থনীতির প্রাণ)
