রাজউকে খোলা জিপ আতংক

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:১৭
রাজউকে খোলাজিপ বাহিনীর আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। গত সোমবার রাজউক ভবনে প্রকাশ্যে ২৫ কোটি টাকার টেন্ডার ডকুমেন্ট ছিনতাইয়ের ঘটনা তদন্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রাজউক কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে ঘটনা তদন্তে দুই সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। উক্ত কমিটিতে রাজউকের সদস্য উন্নয়ন ও প্রধান প্রকৌশলীকে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। আজ বুধবার থেকে এই কমিটি তদন্ত কাজ শুরু করবে। এ ব্যাপারে রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো.নূরুল হুদা ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে উত্তরা তৃতীয় পর্বের প্রকল্প এলাকায় একটি ব্রিজ নির্মাণের টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে। রাজউকের টেন্ডার প্রক্রিয়া অত্যন্ত স্বচ্ছ। কোন অনিয়মের সুযোগ নেই। টেন্ডার প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করার জন্য পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করা হয় বলেও তিনি জানান। গত সোমবার বিকাল পর্যন্ত তিনি অফিস করেছেন । কিন্তু টেন্ডার ছিনতাই সম্পর্কে তার কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। তবে টেন্ডারে অংশ নিতে আসা একটি প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র ছিনতাইয়ের কথা তিনি শুনেছেন। রাজউকে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন কালে এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করে চেয়ারম্যান বলেন, তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনা সত্য হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। অভিযোগ আছে, পুলিশের উপস্থিতিতেই গত সোমবার দেশের শীর্ষস্থানীয় নির্মাণ প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম লিমিটেডের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে টেন্ডার ডকুমেন্ট ছিনতাই করে এক দল দুর্বৃত্ত। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পদ্মা কনস্ট্রাকশন এ্যান্ড সাপ্লায়িং ফার্ম (পদ্মা ট্রেডার্স) নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান আবদুস সালাম খানের ভাড়া করা দুর্বৃত্তরা টেন্ডার ছিনতাই করে। সালাম খান গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট আবদুল মান্নান খানের আপন ভাগ্নে। উক্ত সালাম খান দীর্ঘদিন যাবত্ মন্ত্রীর নাম ভাঙ্গিয়ে রাজউকে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে জানায় রাজউকের একাধিক সূত্র। সোমবার মোনেম লিমিটেডসহ আরও একাধিক প্রতিষ্ঠান সিডিউল জমা দিতে ব্যর্থ হলেও দুপুর আড়াইটায় টেন্ডার খোলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রাজউকের সংশ্লিষ্ট শাখা। মোনেম লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার এমএ কালাম জানান, ঘটনার পরপরই তারা মৌখিকভাবে রাজউকের উত্তরার প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এ সম্পর্কে অবহিতকরণসহ লিখিত অভিযোগও করেছেন। আবদুল মোনেম লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার এমএ কালাম সোমবারের ঘটনা সম্পর্কে জানান, রাজউকের উত্তরা তৃতীয় পর্ব প্রকল্পে ১৭ নম্বর লেনের উপর একটি ব্রিজ নির্মাণের টেন্ডারে অংশ নেয়ার জন্য তারা ঘটনার দিন সকাল ১১টার দিকে রাজউক ভবনে যান। তাদের কাছে টেন্ডারের সিডিউল জমা দেয়ার জন্য পুরো ডকুমেন্ট ফাইল আকারে ছিল। রাজউক ভবনের লিফট দিয়ে ওঠার সময় দু’জন অপরিচিত লোক লিফটের ভেতরেই ডকুমেন্ট ফাইল নিয়ে টানাটানি শুরু করে। তারা তিনতলায় নামতে চাইলেও তাদের জোর করে চারতলায় নিয়ে যাওয়া হয়। লিফট থেকে নামার পরপরই ওই দু’জনের সঙ্গে আরও কয়েকজন যোগ দিয়ে টেন্ডার ডকুমেন্ট ফাইল ছিনিয়ে নেয়। তাত্ক্ষণিকভাবে তারা বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের মৌখিক এবং লিখিতভাবে অবহিত করেন। প্রকৌশলী কালাম গত সোমবারের টেন্ডার প্রক্রিয়া বাতিল করে নতুনভাবে টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ঠিকাদার এবং রাজউকের কর্মচারীরা জানান, ঘটনার দিন সকাল ১০টার পর থেকেই খোলা জিপে একদল যুবক রাজউক ভবনের গেটের বাইরে অবস্থান করছিল। মোনেম লিমিটেডের কর্মকর্তাদের গাড়ি রাজউক ভবনে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে জিপ থেকে পাঁচ-ছয় যুবক নেমে মোনেম লিমিটেডের কর্মকর্তাদের অনুসরণ করতে থাকে। ২০ মিনিট পর ওই যুবকরা সেই জিপে করেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। রাজউকের একাধিক ঠিকাদার এবং কর্মচারী জানান, রাজউকে গত কয়েক মাস ধরে ‘খোলাজিপ বাহিনী’ আতঙ্কের নামে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে কোন টেন্ডার হলেই খোলা জিপ বাহিনীর সদস্যরা এসে হাজির হয়। খোলাজিপ বাহিনী রাজউকে মানিক বাহিনী নামেও পরিচিত। একাধিক সূত্র জানায়, পদ্মা ট্রেডার্স লিমিটেডের প্রধান আবদুস সালাম খান সমপ্রতি বেশকিছু টেন্ডার একইভাবে দখল করে। ২৫ কোটি টাকার এ টেন্ডার প্রক্রিয়ায় মোনেম লিমিটেড অংশ নিলে অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতায় পদ্মা ট্রেডার্স বাদ পড়বে এমনটি নিশ্চিত হয়েই তারা তাদের ডকুমেন্ট ছিনতাই করে। এ ছিনতাইয়ের ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে এবং দুর্বৃত্তদের হুমকির মুখে মনিকো লিমিটেড নামে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও ডকুমেন্ট জমা না দিয়ে রাজউক ভবন ত্যাগ করেন বলে জানান একাধিক ঠিকাদার।