ভরা মৌসুমেও এখন পিঁয়াজের দাম চড়া। দাম কমারও কোনো লক্ষণ নেই। গত বছর যেখানে মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজি পিঁয়াজ বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ২৫ টাকায়, সেখানে এখন তা মানভেদে ৪৮ থেকে ৫২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ অবস্থায় পিঁয়াজের ঝাঁজে নাকাল ক্রেতারা।
দাম বৃদ্ধির কারণ খুঁজে বের করতে গতকাল মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠকে বসে পিঁয়াজ আমদানিকারক, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের সাথে। বাণিজ্য সচিবের সভাপতিত্বে বৈঠকে ট্যারিফ কমিশন, সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
বৈঠকে ব্যবসায়ীরা জানান, গত মৌসুমে কৃষক পিঁয়াজের দাম না পাওয়ায় এবার আবাদ কম হয়েছে। এছাড়া ঘন কুয়াশার কারণে ভারত থেকে চাহিদামতো পিঁয়াজ আসতে পারছে না। সেইসাথে ভারতেও পিঁয়াজের দাম তুলনামূলক বেশি। এসব কারণেই দেশে পিঁয়াজের দাম কমছে না। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, কারণ যাই থাক, দাম কোনোভাবেই প্রতি কেজি ৩০ থেকে ৩৫ টাকার বেশি হতে পারে না।
এ প্রসঙ্গে পিঁয়াজ আমদানিকারক হাজী মুহম্মদ মাজেদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, পাইকারি বাজার শ্যামবাজারে প্রতি কেজি আমদানিকৃত পিঁয়াজ ২৭ থেকে ২৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া দেশি পিঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩২ টাকা কেজিতে। তাই বেশি দামে পিঁয়াজ বিক্রি করছেন খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা।
পাইকারি ব্যবসায়ীদের এ অভিযোগ অস্বীকার করে নিউমার্কেটের খুচরা ব্যবসায়ী আনছার বলেন, পাইকারি বাজারে গিয়ে চাহিদামতো পিঁয়াজ পাওয়া যায় না। দামও বেশি। এছাড়া পাইকারি বাজার থেকে কেনার পর ঘাটতি ছাড়াও খুচরা পর্যায়ে কয়েকদিন ধরে বিক্রি করা হয় বলে নষ্টও হয়ে যায় অনেক পিঁয়াজ। এজন্য দাম বেশি পড়ে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দেশে প্রতি বছর পিঁয়াজের চাহিদা প্রায় ১৫ লাখ টন। এর অর্ধেকই আমদানি করতে হয়। তাই আমদানিকৃত পিঁয়াজের দাম ও সরবরাহের উপরই দেশের বাজার নির্ভর করে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মানসম্মত বীজের যোগান, কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও পিঁয়াজ সংরক্ষণ করা গেলে এই ঘাটতি অনেকটাই দূর করা যাবে।
সূত্র জানিয়েছে, মানসম্মত বীজের অভাবে উত্পাদন কম হওয়া ও বিভিন্ন কৃষি উপকরণের দাম আকাশ ছোঁয়া হলেও সেই অনুপাতে দাম না পাওয়ায় কৃষক পিঁয়াজ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
পিঁয়াজের ফলন আশানুরূপ না হওয়ার আরেকটি কারণ, প্রকৃত চাষিদের প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হওয়া। জানা গেছে, প্রতি বছর সরকার পিঁয়াজ চাষিদের যে প্রশিক্ষণ দেয়, বিভিন্ন কারণে তা থেকে প্রকৃত চাষিরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
মসলা গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কৃষিবিদ মাসুদুল হক ইত্তেফাককে বলেন, কৃষকদের মানসম্মত বীজের যোগান, যথাযথ প্রশিক্ষণ ও পিঁয়াজ সংরক্ষণ করা গেলে দেশে পিঁয়াজের ঘাটতি অনেকটাই দূর করা যাবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতি হেক্টর জমিতে ৬ টন পিঁয়াজ উত্পাদন হয়। অথচ ভারতে একই পরিমাণ জমিতে বড় আকারের পিঁয়াজ ২৫ টন ও পাকিস্তানে ১৪ টন উত্পাদন হয়। কৃষকদের ভালো বীজ সরবরাহ করে ও তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আমরাও পিঁয়াজের উত্পাদন বাড়াতে পারি। এছাড়া ক্ষেত থেকে পিঁয়াজ তোলার সময়ও যত্নবান হতে হবে। কেননা, উপযুক্ত যত্নের অভাবে এ সময় ১৫ শতাংশ পিঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়।
