বলে গতি আছে, শর্ট বল করে ‘চিন মিউজিক’ শোনাতে পারেন, স্লোয়ারে বিভ্রান্ত করতে পারেন, চেহারায় আগ্রাসন আছে; একজন খাঁটি ফাস্ট বোলার হতে যা যা দরকার, সবই আছে তার। কিন্তু এসব কোনো কারণে নয়; মোহাম্মদ ইরফান আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে নেই তারকা হয়ে গেছেন তার উচ্চতার কারণে! হ্যাঁ, বিশ্বাস করুন আর নাই করুন—সর্বকালের ‘সর্বোচ্চ’ ক্রিকেটার এখন পাকিস্তানের তরুণ এই পেসার ইরফান। পিসিবির সর্বশেষ ভাষ্য সঠিক হলে, ইরফানের উচ্চতা এখন ৭ ফুট ১ ইঞ্চি। সে ক্ষেত্রে ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি লম্বা ক্যারিবিয় কিংবদন্তী জোয়েল গার্নারকে ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সবচেয়ে উঁচু ক্রিকেটার এই পাঞ্জাবের পেসারই।
ইরফানের উচ্চতার মাপ নিয়ে একটু দ্বিধাদ্বন্দ্ব অবশ্য পিসিবিই তৈরি করে রেখেছে। এ পর্যন্ত পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড অন্তত তিনবার ইরফানের ভিন্ন ভিন্ন তিন ধরনের মাপ জানিয়েছে । প্রথমে জানানো হয়েছিল তার উচ্চতা ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি। এরপর বলা হল ইরফানের উচ্চতা ৬ ফুট ১০ ইঞ্চি এবং সর্বশেষ উচ্চতা ৭ ফুট ১ ইঞ্চি। এটাও হতে পারে যে, এই সময়ে ইরফান আরও লম্বাই হয়েছেন।
তবে যাই হোক, গত পরশু ভারতের বিপক্ষে ইরফানের যখন টি-টোয়েন্টি অভিষেক হল, তখন বেসরকারিভাবে সংবাদ মাধ্যম অন্তত তাকে সবচেয়ে লম্বা ক্রিকেটার বলে ঘোষণা দিল।
সবচেয়ে লম্বা হওয়ার পথে ইরফানকে প্রথমেই টপকাতে হয়েছে তার আইডল জোয়েল গার্নারকে। তালিকার তিন নম্বরে আছেন ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতারই সাবেক অস্ট্রেলিয় বোলার ব্রুস রিড। চার নম্বরে আছেন বর্তমান ধারাভাষ্যকার, সাবেক ইংলিশ বোলার টনি গ্রেগ; উচ্চতা ৬ ফুট ৭ ইঞ্চি। একই উচ্চতা ছিল ক্যারিবিয় আরেক তারকা কার্টলি অ্যামব্রোসের। এই হল আসলে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু পাঁচ ক্রিকেটারের ঠিকুজি। তবে এই ঠিকুজিতে আসলে ক্রিস ট্রেমলেট ও স্টিভেন ফিনের কথাও যোগ করতে হবে। কারণ এই দু’জনের উচ্চতাও ৬ ফুট ৭ ইঞ্চি করে।
সে নিচের দিকে একই উচ্চতায় অনেকে থাকলেও ইরফানের আশেপাশেও কেউ নেই। ইরফানের উচ্চতা আরও চার ইঞ্চি কম হলেও তিনি বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা ক্রিকেটার। ফলে ইরফানকে এই পদে বসিয়ে দিলে আসলে আপত্তি করার কেউ নেই।
অবশ্য এই ‘লম্বাত্ব’র কারণে ইরফানের আসল যোগ্যতাটা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। তার অধিনায়ক মোহাম্মদ হাফিজের ভাষায় শোয়েব আখতারের মতোন নতুন এক ‘সারপ্রাইজ প্যাকেজ’ এই ইরফান। একেবারে জেনুইন পেসারের সব বৈশিষ্ট্যই তার মধ্যে আছে। আর ইরফানকে এখানে যিনি তুলে এনেছেন, তার কথা শুনলেও আপনার বিশ্বাস বাড়বে। ইরফানের মেন্টর আকিব জাভেদ। তিনি মনে করেন, অফুরন্ত তরুণ পেসারদের জন্ম দেয়ায় বিখ্যাত পাকিস্তানের ভবিষ্যত্ এই ইরফান।
ইরফান উঠে এসেছেন পাঞ্জাবের এক্কেবারে প্রত্যন্ত এক মফস্বল শহর গাগ্গু মান্ডি থেকে। এই শহর থেকেই পাকিস্তানের আরেক লম্বা ক্রিকেটার মোহাম্মদ জাহিদ এসেছিলেন। কিন্তু ইরফানের উঠে আসার গল্পটাই অসাধারণ। দরিদ্র পরিবারের ছেলে ইরফানের পক্ষে গাগ্গু মান্ডিতে ক্রিকেট খেলা সম্ভব ছিল না। পরিবারের অভাব মেটাতে এক পাইপ নির্মাণকারী কারখানায় চাকরি নিয়েছিলেন। সেখানেই অবসরে পাড়ায় ক্রিকেট খেলতেন। সেই ক্রিকেট খেলতে খেলতে একদিন চোখে পড়ে গেলেন আকিব জাভেদের। সাবেক জাতীয় দল তারকা আকিব এক মুহূর্ত দেরি না করে ইরফানকে ধরে নিয়ে এলেন জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে। আকিবেরই উত্সাহে খান রিচার্স অ্যাকাডেমির হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সুযোগ পেয়ে গেলেন ইরফান। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ম্যাচেই ৯ উইকেটসহ টুর্নামেন্টে ৪৩ উইকেট নিয়ে পাকিস্তান জুড়ে নিজের আগমনবার্তা জানিয়ে দিলেন। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি ইরফানকে।
এখন ইরফানের সামনে তাকানোর পালা। আর বিশ্ববাসীর ইরফানকে দেখতে উপরে তাকানোর পালা!
