“বউ গাছ কাটতি যাব, ঠিলে ধুয়ে দে”—গানটি একসময় অভয়নগরে গ্রাম-গঞ্জে হরহামেশাই শোনা যেত। আজ আর তেমনটা নেই। একই সঙ্গে চোখে পড়ে না পিঠে ঠুঙি বাঁধা গাছিকেও। হারিয়ে যেতে বসেছে ‘যশোরের যশ খেজুরের রস’—প্রবাদটিও।
অভয়নগরের রস-গুড়ের রয়েছে শতবছরের ঐতিহ্য। ঐতিহাসিক সতীশ চন্দ্র মিত্রের ‘যশোর খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থ সূত্রেও জানা যায়, একসময় এ অঞ্চলের প্রধান কৃষিজ পণ্য ছিল খেজুরের গুড়। এই গুড়ের সাথে যুক্ত ছিল নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। ১৯০০-০১ সালে যশোরেই উত্পাদিত হয়েছে ১৭ লাখ ৯ হাজার ৯৬০ মণ। যার দাম ছিল সেই আমলে ১৫ লাখ টাকা। এই গুড় আমেরিকা-ইউরোপেও রপ্তানি হয়েছে। ১৮৬১ সালে প্রথম চৌগাছার তাহিরপুরে কপোতাক্ষ নদের ধারে মি.নিউ হাউস খেজুরের রস দিয়ে চিনি উত্পাদনের কারখানা গড়ে তোলেন। ১৯৪৭ সালের আগ পর্যন্ত কারখানাটি চালু ছিল। পরে আখের চিনির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হেরে থেমে যায় কারখানাটির চাকা। আরো জানা যায়, পুরো বঙ্গের নলেন গুড়ের সন্দেশের ৯০ শতাংশ অভয়নগর থেকেই সরবরাহ করা হত। উপমহাদেশের বিখ্যাত কলকাতার ভিমনাগের সন্দেশ তৈরি হয়েছে অভয়নগরের নলেন গুড় দিয়ে। আজও অভয়নগরে সব মিষ্টির দোকানে তৈরি হচ্ছে নলেন গুড়ের সন্দেশ। কিন্তু নলেন গুড়ের সেই মৌ- মৌ খশবু আর পাওয়া যাচ্ছে না। সরেজমিনে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, খেজুরের গুড়ের সঙ্গে মেশানো হচ্ছে চিনি। বর্তমানে ১ কেজি গুড়ের পাটালি বিক্রি হচ্ছে ১৮০-২০০ টাকা। চিনি মেশানো পাটালি বিক্রি হচ্ছে ১০০-১২০ টাকা। খেজুরের গুড় বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা। এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। তারা ৫০-৫২ টাকা কেজি দরে চিনি কিনে গুড়ের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রয় করছে। লালচে রং দেখতে এ গুড় কয়েকদিন বাড়িতে রেখে দিলে সাদা হয়ে যায়। তবে এর ঘ্রাণ স্বাদ নেই বললেই চলে। গুড় ব্যবসায়ী মজিদ বিশ্বাস ইত্তেফাককে বলেন, আমরা গুড়ে চিনি মেশাই না, গাছিরা বাড়ি থেকে চিনি মিশিয়ে আমাদের কাছে বিক্রয় করতে আসে। ফলে আমাদের কিছু করার থাকে না। যশোরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য খেজুরের রসে চিনি মেশানো বন্ধ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কাজেই এ ব্যাপারে প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন।
