মৃত্যুঞ্জয়ী যোগিন্দর শর্মা

আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৪২
কর্নাটকের হুবলিতে স্টেডিয়ামে চলছিল স্বাগতিকদের সঙ্গে হরিয়ানার রঞ্জি ট্রফির ম্যাচ। এরই মধ্যে দেখা গেল মাঠের এক পাশে বাচ্চারা ঘিরে ধরে অটোগ্রাফ নিচ্ছে যোগিন্দর শর্মার। ক্যারিয়ারে সাকুল্যে চারটি টি-টোয়েন্টি এবং চারটি ওয়ানডে খেলেছেন। পাড় ক্রিকেট সমর্থক ছাড়া কারো পক্ষে তার নাম মনে রাখা কঠিন; কেননা সেগুলোয় তার তেমন কোনো পারফরম্যান্সও নেই। এরপরও কেন চারদিনের ম্যাচটিতে শর্মাকে ঘিরে অটোগ্রাফ শিকারীদের উপচে পড়া ভিড়? কি করেছেন যোগিন্দর শর্মা! মৃত্যুকে জয় করে আবার ক্রিকেট মাঠে ফিরে এসেছেন। এই ভিড় একজন তারকার জন্য নয়; একজন মৃত্যুঞ্জয়ী মানুষের জন্য। যোগিন্দর শর্মা ২০১১ সালের নভেম্বরে দিল্লীর রাস্তায় ভোর রাতে ভয়াবহ এক সড়ক দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন। তাত্ক্ষণিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিত্সকরা মোটেও নিশ্চিত ছিলেন না এই ক্রিকেটারের বেঁচে থাকার ব্যাপারে। মাথা থেকে শুরু করে পা পর্যন্ত ক্ষত-বিক্ষত দেহে কমপক্ষে ৪৫টি সেলাই এবং গোটা দুয়েক জরুরি অপারেশন করে পাঠিয়ে দেয়া হয় তাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে। আস্তে আস্তে সেরে ওঠেন ঠিকই। কিন্তু চিকিত্সকরা বলেছিলেন, আর কখনো মাঠে ফেরা হবে না এই পেস বোলিং অলরাউন্ডারের। যোগিন্দর নিজেই বর্ণনা করছিলেন সেই দুর্ঘটনার কথা, ‘আমার মাথায় খুব বড় ইনজুরি ছিল। সারা দেহ কেটে-ছিঁড়ে গিয়েছিল। কয়েকটা হাড় ভেঙেছিল। শরীরে এমনিতেই ৪৫টা সেলাই ছিল। মাথার ইনজুরিটা খুব বড় ছিল। আইসিসিইউতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল আমাকে। পরিবারের সবাই খুব ভেঙে পড়েছিল। ভেঙে পড়ারই কথা। ডাক্তার নিজে বলছিল—কুচ ভি হো সাকতা হ্যায় (যে কোনো কিছুই হতে পারে)।’ কী আশ্চর্য! যে মানুষটির বেঁচে থাকারই নিশ্চয়তা দিতে পারছিলেন না চিকিত্সকরা; ১৩ মাস পরে তিনি আবার ত্রিকেট মাঠে ফিরলে, দু’ইনিংসে বলও করলেন। কিভাবে সম্ভব হল এই ‘অলৌকিক’ ঘটনা? এ ক্ষেত্রে সবাই অলৌকিকতাকেই কৃতিত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু এখানেও যোগিন্দর শর্মা অনন্য। তিনি সোজা আঙুল তুলে একজন মানুষকে দেখিয়ে দিলেন—তার ফিজিও থেরাপিস্ট অমিত ত্যাগিকে। বলছেন, এই মানুষটিই প্রধান ভূমিকা রেখেছেন আবার মাঠে ফেরায়। অবশ্য মূল ভূমিকাটা অবশ্যই ছিল যোগিন্দরের ইচ্ছাশক্তিরই। নিজেই বলছিলেন, ‘আমার ইচ্ছাশক্তি প্রবল ছিল। নিজে নিজে দৌড়াতাম, বল করতাম। আর আমাকে এই পুরো ব্যাপারটায় সব সময় পাশে থেকেছেন অমিত ত্যাগি। উনিই সেই মানুষ যার জন্য আজ আমি মাঠে। সঙ্গে হরিয়ানার কোচ অশ্বিনি কুমারের সঙ্গেও যোগাযোগ রেখেছি।’ কেমন যোগাযোগ রাখতেন, সেটা থেকেই বুঝতে পারবেন যোগিন্দরের ইচ্ছাশক্তিটা। অশ্বিনি কুমার বলছিলেন, ‘দুর্ঘটনার মাস চারেক পরই ও মাঠে আসা শুরু করল। আমাকে বারবার বলতো, আমার কিছু করতে হবে, আমার কিছু করতে হবে। আমি শুধু বলেছি, অমিত ত্যাগি যা বলে, তাই করো। আসলেই অমিতই যা করার করেছে। আমি সেভাবে কিছু করিনি। আর যা করেছে ওর ইচ্ছাশক্তি।’ সেই ইচ্ছাশক্তি দিয়ে ফিটনেস পরীক্ষায় উেরছেন। নির্বাচকদের দৃষ্টি কেড়ে রঞ্জি দলে ফিরেছেন। এখন যোগিন্দরের স্বপ্ন এই মৃত্যুঞ্জয়ী ইচ্ছাশক্তি দিয়ে আরেকবার জাতীয় দলে ফিরে আসবেন। নিজেকে চেনাবেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, ‘আমি ফিট থাকতে চাই। আমার শরীরে এখনও সমস্যা আছে। সেগুলো কাটিয়ে সেরা পারফরম করতে চাই। আরেকবার নিজেকে প্রমাণ করতে চাই।’ কোন সন্দেহ নেই, যোগিন্দর আরেকবার যদি সেটা করে দেখাতে পারেন, তাহলে জয় হবে ক্রিকেটেরই।