বাসাবাড়িতে দিনে বন্ধ রান্না কারখানায় বন্ধ উত্পাদন

আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৪৮
নারায়ণগঞ্জে কিছুতেই কাটছে না গ্যাসের সঙ্কট। গ্যাসের অভাবে দিনের বেলায় রান্না করতে পারছেন না গৃহিণীরা। গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল কারখানাগুলোতে উত্পাদন বন্ধ রয়েছে। বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী গ্যাস সংকটের প্রতিবাদে শহরে ঝাড়ু মিছিল করেছে। গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবিতে তারা ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ সড়ক অবরোধ, চাষাঢ়া বালুরমাঠে অবস্থিত তিতাস গ্যাস অফিস ঘেরাও, বিক্ষোভ, মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছে এবং করে যাচ্ছে। কিন্তু কোন কাজ হয়নি, গ্যাস সংকট আগের মতোই রয়ে গেছে। শহরের দেওভোগ, কাশিপুর, বাবুরাইল, পাইকপাড়া, শহীদ নগর, নলুয়াপাড়া, ভুঁইয়ারবাগ, চাঁনমারী, ইসদাইর, মাসদাইর, পশ্চিম মাসদাইর, জামতলা, দাতা সড়ক প্রভৃতি এলাকায় গ্যাস সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করেছে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা কাশীপুর, মাসদাইর, বাড়ৈভোগ ও বিসিক শিল্প নগরীর আশপাশের এলাকায়। এসব এলাকায় দিনের বেলায় গ্যাস থাকে না বললেই চলে। শহরের ডনচেম্বার এলাকার গৃহবধূ হাবিবা আক্তার অনন্যা জানান, সকাল নয়টা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত গ্যাস একেবারে নিভু নিভু অবস্থায় থাকে। দেওভোগ এলাকার দুলারী রহমান জানান, দুপুর একটার পর আস্তে আস্তে গ্যাস বাড়তে থাকে। যতটুকু সময় গ্যাস থাকে তাতে রান্না করা বেশ দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। নারায়ণগঞ্জে গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে উত্পাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শীত মওসুম শুরু হওয়ার সাথে সাথে সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। স্পিনিং মিলগুলোতে সুতা উত্পাদনে ধস নেমেছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে টেক্সটাইল মিল, গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান। অর্ডার কমে যাওয়ায় অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। একদিকে গ্যাস, অন্যদিকে বিদ্যুত্ সংকটের কারণে শিল্প মালিকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। ফতুল্ল¬¬া শিল্পাঞ্চলেও দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সঙ্কট বিরাজ করছে। ফতুল্ল¬¬ার বিসিক, কাঠেরপুল, সস্তাপুর, লালপুর, পঞ্চবটি, রসুলপুর, নন্দলালপুর, দাপা, পাগলা প্রভৃতি এলাকায় গ্যাসনির্ভর সহস্রাধিক রফতানিমুখী গার্মেন্টস, ডাইং, প্রিন্টিং, স্টিল রি-রোলিং মিল রয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে এসব শিল্পকারখানায় উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই অবস্থা সিদ্ধিরগঞ্জ, রূপগঞ্জ, আড়াইহাজারসহ বিভিন্ন এলাকায়। গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ সূত্র মতে, গ্যাস সরবরাহ ঠিকমতো না পাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান তৈরি পোশাক যথাসময়ে বিদেশে শিপমেন্ট করতে পারছে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তাদের অর্ডার কমে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠান মালিকরা শিকার হচ্ছেন বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের। এদিকে গ্যাস সরবরাহ ঠিকমতো না থাকলেও গ্যাস বিল গুণতে হচ্ছে আগের মতোই। বিকেএমইএ’র প্রথম সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, গ্যাস সংকটের কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। রাতের বেলায় গ্যাসের প্রেসার পাওয়া গেলেও দিনের বেলায় তেমন একটা প্রেসার পাওয়া যায় না। প্রেসার ওঠানামার কারণে গার্মেন্টসের ফেব্রিকস ডাইং করাতে গিয়ে নষ্ট হচ্ছে। ঠিকমতো কালার হচ্ছে না। এতে করে সময়ের অপচয় হচ্ছে। পাশাপাশি কাটিং, সুইং করতেও দেরি হচ্ছে। এতে করে শিপমেন্ট ব্যাহত হয়ে সরবরাহকৃত মাল স্টকলটে পরিণত হচ্ছে। লোকসান গুণতে হচ্ছে গার্মেন্টস মালিকদের। এ কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। মালিকপক্ষ শ্রমিকদের বেতন দিতে না পারায় শ্রমিক অসন্তোষের সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি আরো জানান, দেশের অধিকাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠানের জেনারেটর গ্যাস নির্ভর। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকার এখনই দৃষ্টি না দিলে দেশের প্রবৃদ্ধি কমে আসতে পারে বলে তিনি আশংকা প্রকাশ করেন। বিটিএমএ এর পরিচালক ও ফতুল্লার হাশেম স্পিনিং মিলের এমডি এম সোলায়মান জানান, গ্যাস ও বিদ্যুত্ সংকটের কারণে দেশের অধিকাংশ স্পিনিং মিলের উত্পাদন ৩০ ভাগ কমে গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে অনেক স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আড়াইহাজারের ব্রাক্ষন্দী ইউনিয়নের ভাই ভাই স্পিনিং মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হক মিয়া জানান, গ্যাস সংকটের কারণে পূূর্বে তাদের যে পরিমাণ উত্পাদন হতো বর্তমানে তার অর্ধেকে নেমে এসেছে। গ্যাস কম থাকায় তাদেরকে বিদ্যুতের উপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। এতে করে উত্পাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সিদ্ধিরগঞ্জের রনি লাইমসের স্বত্বাধিকারী চাঁন মিয়া জানান, ঠিকমতো গ্যাস না পাওয়ায় চুন উত্পাদনকারী কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম রয়েছে। বর্তমানে সিদ্ধিরগঞ্জের প্রতিটি চুন উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানে উত্পাদন শতকরা ৫০ ভাগে নেমে এসেছে। ফতুল্লার মুসলিমনগর রি-রোলিং মিলের স্বত্বাধিকারী মুসলেহ উদ্দিন মুসলিম জানান, নারায়ণগঞ্জে ৬০-৭০টি রি-রোলিং মিল রয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে এগুলোতে উত্পাদন অনেক কমে গেছে। তার উপর স্থানীয় বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় তারা চরম সংকটে রয়েছে। তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন অ্যান্ড ট্রান্সমিউশন কোম্পানী লিমিটেড নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের জিএম শফিকুর রহমান জানান, নারায়ণগঞ্জে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা যেখানে ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট, সেখানে আমরা পাচ্ছি ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ না থাকায় ও প্রচণ্ড শীতের কারণে গ্যাসের এই সংকট দেখা দিয়েছে। তবে শীত কমে গেলে সংকট কিছুটা কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।